blogger widgets
আমাদের ব্লগে উইন্ডি স্ট্রম -এর লেখা সকল পোস্ট।
Showing posts with label উইন্ডি স্ট্রম. Show all posts

Monday, 24 February 2014

চরিত্রহীন

আজ সকালে যখন হাঁটছিলাম, একবুড়ো নিজে থেকে এসে পরিচিত হলো। কথা বলতে বলতে যৌনাঙ্গ ছুঁয়ে দিলো, তারপর যখন দেখলো আমি কোন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি না, স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেশ দেয়ার ছলে অনেকক্ষণ ধরে ধন টিপলো। হাহাহাহা। আমি বাধা দিই নি। কেন দিই নি? আমার মুখে শক্ত কথা আসে না বলে? আমি লোককে মুখের উপর অপমান করতে পারি না বলে? না কি আমি বুঝতেই পারি নি যে পিতামহের বয়েসী কোন লোক এই কাজ করতে পারে?উপরের কারণগুলোর প্রত্যেকটাই হতো অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে সত্যি হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস করো, এ ক্ষেত্রে , এর কোনটাই সত্যি না। লোকটা প্রথমে যখন আমার হাত ধরলো, তখনই আমার বিরক্তি লেগেছিলো, এবং সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু কথা হলো, সন্দেহ তো রাস্তা-ঘাটে, আশে-পাশে কতজনকেই করে বসি। তার কতগুলো সত্যি হয়?কিন্তু লোকটা প্রথমবার যখন আলতো করে যৌনাঙ্গে হাত বুলালো, আমার আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিলো না, তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে।



তারপরও আমি বাধা দিই নি। কেন দিই নি? নাহ, আমি নরম-সরম বলে না, আসলে আমার ভালো লাগছিলো। না, কোন যুক্তি দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করবো না। যা নিখাঁদ সত্যি, তাই বলবো। যতবার দাড়িওয়ালা বুড়ো লোকটা, যার দাঁতগুলো ছিলো হলদে, ময়লা; আমার পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করছিলো, ততবারই আমি উত্তেজিত হয়ে উঠছিলাম। লোকটা কি খুব আবেদনময় ছিলো? নাহ, একদমই না।

তাহলে কেন উত্তেজিত হচ্ছিলাম? জানি নাহ। যৌন-অভিজ্ঞতা আমার নিদারুণ অল্প বলেই হয়তো। তার প্রত্যেকটা কথা শুনেই আমি বুঝতে পারছিলাম, হি ইজ আ চিট। তারপরও, আমি বারবার চাইছিলাম, যেন সে বারবার আমার লিঙ্গ ঘষতে থাকে। আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো, আমার শুধুমাত্র তখনই খারাপ লাগছিলো, যখন খেয়াল করেছি আশেপাশে কেউ হেঁটে যাচ্ছে।
কিন্তু এখন আবার খারাপ লাগছে। কেন লাগছে? বুঝতে পেরেও কেন লোকটাকে যৌনাঙ্গ ঘষতে দিলাম, কেন বাধা দিলাম না - সে জন্য?

না কি মুখ ফুটে না করতে পারলাম না, বা বাধা দিতে পারলাম না - সে কারণে? আসলে বাধা দিতে তো আমার ইচ্ছেই হয় নি। ইচ্ছে হয় নি অপমান করতেও। ঐ যে বললাম না, আমি উপভোগ করছিলাম ঐ স্পর্শ; যদিও সেটা কোন এক পাকাদাড়িওয়ালা বুড়োর হাত ছিলো। ছিলো, তো? হাত তো ছিলো? বিষমকামীদের ইংরেজিতে স্ট্রেইট বলে। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় "সোজা"। তাহলে আমার যৌনতা কি বাঁকা? হবে হয়তো বা। হোক না। যাই হোক নাই হোক, আমি তো আমিই, না? সবাই ঘৃণা করলেও তো আমি নিজেকে অত ঘৃণা করতে পারি না। সে যাই হোক, খারাপ লাগছিলো কেন? বাবা-মা জানতে পারলে কষ্ট পাবে বলে? বন্ধুরা-আত্মীয়রা শুনতে পেলে ছি ছি করবে বলে? বাবা-মা কখনোই এটা জানতে পারবে না, একটি নির্জন ভোরবেলায় আমার একান্ত ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমি না বললে বাবা-মা, বন্ধু বা আত্মীয়, কারো সাধ্য নেই জানার, শোনার। আমি খুব ভালোমতোই জানি সেটা। তারপরও, প্রতিটিবার, যখনই আমি কোনরকম যৌন অভিজ্ঞতার কাছাকাছি যাই, আমার মনে একটা কথাই আসে, "বাবা-মা জানতে পারলে খুব কষ্ট পাবে।" 

পর্ণ দেখার সময় কি কখনো এমন হয়? নাহ, একদমই না। কেন?কারণ আমার সমবয়সী অসংখ্য বন্ধু এটা নিয়ে এত কথা বলে, এত অসংখ্যবার এ প্রসঙ্গের উত্থাপন ঘটে যে, এটা আর অস্বাভাবিক বা অন্যায় বলে মনে হয় না। হয়তো বা প্রথম প্রথম পর্ণ দেখা নিয়েও এমনই পাপানুভূতি হতো।ছেলেদের প্রেমে পড়া নিয়েও একই অনুভূতি হয়?না তো, আসলে বুঝতে পারার অনেক আগে থেকেই ছেলেদের প্রেমে পড়ে আসছি, কখনো মাথায় ঐ ভাবনা আসার সুযোগই পায় নি এ ব্যাপারে।তার মানে দাঁড়ালো, ছেলেদের প্রেমে পড়া, তাদের নিয়ে যৌন কল্পনা করাটাও অভ্যস্ততায় পরিণত হইয়ে গেছে বলে ও নিয়ে আর কোন পাপবোধ নেই।তাহলে কি একদিন রাস্তাঘাটে যাকে-তাকে দিয়ে ধন টেপানো, যার-তার সাথে শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় চলে যাওয়াটাও ডাল-ভাত মনে হবে? অভ্যেস হয়ে গেলে হয়তো হবে। কিন্তু আমি তো সেটা চাই না, আমার প্রচন্ড খারাপ লাগে এমন ভাবতে। অথচ তসলিমা নাসরিনের যৌন স্বাধীনতা বিষয়ক লেখাগুলো, হুমায়ুন আজাদের বা সুনীলের অবাধ যৌনতা বিষয়ক গল্পগুলো, কিংবা অবাধ যৌনতার সিনেমাগুলো - কোনটাই আমার কাছে খুব বেশি খারাপ বা অবাস্তব বলে মনে হয় নি। বরং খুব স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছিলাম, এবং এটাও স্বীকার করে নিয়েছিলাম যে সতীত্বের বা সততার নাম করে নিজেকে অতৃপ্ত রাখাটা পুরোপুরি ভন্ডামী।কিন্তু নিজের বেলায় এমন হচ্ছে কেন? কেন অযৌন জীবন-যাপনকেই বেশি সম্মানজনক, বেশি 'শুদ্ধ' বলে মনে হচ্ছে?

পীরিতির সাতকাহন

কখনো তো গুছিয়ে হিসেব করে দেখি নি, এ জীবনে কত অসংখ্য সুদর্শন, সুপুরুষকে দেখে মুগ্ধতায়-বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি, কত দিনের পর দিন রাতের পর রাত তাদের নিয়ে স্বপ্নে হারিয়েছি, কল্পনার নকশীকাঁথা বুনেছি সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে। সেই ছোটবেলা থেকেই আমার প্রেমে পড়া শুরু। যতদূর মনে পরে, আমার আট-ন’বছর বয়েসে বলিউড নায়ক ঋত্বিক রোশানকে দেখেই আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছিলাম। “এত সুন্দর মানুষ হয় কি করে!!!”- সারাদিন  শুধু ওকেই ভাবতাম, আর একটু সুযোগ পেলেই ওকে দেখতাম। ওসব অনেককাল আগের কথা। ওসব গল্প বাদ থাকুক। আজকে বরং বড়বেলার গল্প বলি। কৈশোরের-যৌবনের, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্প। 

গল্পের শুরু অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কিছুদিন আগে থেকেই। উচ্চমাধ্যমিকের পর, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যখন কোচিং করা শুরু করি তখনই প্রথম মনে হলো, “কোচিংযের ভাইয়াগুলো কি অসম্ভব সুন্দর! শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে!” খুব বেশি ভাইয়াকে তো চিনতাম না, তবে কয়েকজন ছিলো যাদের দিকে ক্লাসের পুরোটা সময় হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। তবে তখনো তো আর জানতাম না, আমার জন্য সোনার খনি অপেক্ষা করছে। কপালচক্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর হল-এ উঠে প্রথম যাকে রুমমেট হিসেবে পাই, তিনি আমার চেয়ে বছর চারেক-এর বড় ছিলেন। কি অসম্ভব সুন্দর মানুষ বলে মনে হয়েছিলো তখন তাকে! সুঠামদেহী, গৌরবর্ণ, কোঁকড়ানো চুলের চব্বিশ-পঁচিশ বয়েসের যুবক আমাকে মুগ্ধ করেছিলেন তার সবটুকো অস্তিত্ব দিয়ে। কপালদোষে বেশিদিন ঐ রুমমেটকে কাছে পাই নি, অন্য রুমে চলে গেছিলাম র‌্যাগ খাওয়ার ভয়ে। র‌্যাগ অবশ্য তিনি দিতেন না, দিতো ঐরুমের আশেপাশে থাকা বদগুলো। তিনি বরং আমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলেন। তারপরও রাস্তায় দেখা হলেই মিষ্টি হেসে কুশল বিনিময় করতেন, খোঁজ নিতেন পড়াশোনার। আমিও মিষ্টি হেসে “ভাইয়া, ভাইয়া” ডাকের তুফান ছুটাতাম। তিনি তো আর জানতেন না, আমার মনে কি আছে! 



যাই হোক, একজন গেলো তাতে কি, চারপাশে খানিক চোখ বুলিয়ে, মন খেলিয়ে আমি দেখলাম , এ তো পুরোই স্বর্গরাজ্য!!! এমন অসম্ভব সুন্দর চেহারাধারী, ব্যাক্তিত্ববান সব পুরুষকুল আমার ঘরের আশেপাশে বসত গেড়েছে। নতুন রুমের তিন বছরের সিনিয়রটিও ছিলেন একেবারে দেবদুর্লভ কান্তিধারী! ইনিও বেশ লম্বা, খাঁড়া নাক, মিষ্টি হাসি, স্বল্পভাষী। খুব খাতির জমাতে চেষ্টা করেছিলাম সেই পাশের বিছানায় শোওয়া সুদর্শনের সাথে। জমেও গেছিলো। কিন্তু ব্যাটা ডেস্টিনির সদস্য, আমাকে খালি পয়সার গল্প শুনাতো। বুঝতে পেরেছিলাম আমাকেও দলে টানতে চাইছে, কিন্তু মুখ ফুটে কখনো বলে নি। তাছাড়া আমার এত পছন্দের যুবাপুরুষটি একদিন কথায় কথায় আমাকে ‘হাফ-লেডিস” ডেকে বসে। খুব খেপে কথা বলা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলাম। করবো নাই বা কেন? মানলাম আমি মেয়েলি, মানলাম লোকে হাফলেডিস বলে খেপায়। তাই বলে এ ও? প্রেম ছুটে গেলো অল্পতেই। আসলে তো আর অত সহজে ছুটে না। কথা না হয় বেশি বলতাম না, কিন্তু মন তো ঠিকই পোড়াতো। একদিন তার কোন একটা  গল্পের বইয়ে একটা মেয়ের নাম দেখে কেমন যেনো বুক চিনচিন করে উঠেছিলো। যেনো সে শুধুই আমার সম্পত্তি, অন্য কারো নাম তার অস্তিত্বের কোথাও থাকবে না। আমার আবার চিরায়ত বঙ্গরমণীদের মতো বদস্বভাব, বুক ফাঁটে তবু মুখ ফুটে না। তাই আর কখনোই খুব বেশি কথা বলি নি ভাইয়ার সাথে, বরং আশেপাশের অন্য ফুটন্ত যৌবনধারীর দিকে নজ্র বুলাতে ব্যাস্ত ছিলাম। ওহ!! বাথরুমের পাশের রুমগুলো ছিলো HOT ভাইয়াদের আখড়া। একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখেছি, HOT ছেলেরা পরস্পরের বন্ধু হয়। হয়তো আলাদাভাবে দু’টো বা তিনটে ছেলেকে আমি পছন্দ করে রেখেছি, তাদেরকে আমি আলাদা আলাদা জায়গায় দেখে চিনেছি, হয়তো বা অন্য হল-এ, কিংবা ক্যাম্পাসে, বা ক্যান্টিনে। কিন্তু হায় ভগবান! একদিন হঠাৎ দেখি ওগুলো একসাথে হেসে বেড়াচ্ছে বা হেঁটে বেড়াচ্ছে, পরে জানতে পারি ওরা জিগরি দোস্ত। এমন অভিজ্ঞতা অনেক হয়েছে। এই যেমন এখন, বেশ কয়েকটা কিউটি কিউটি, হটি-নটি সুপুরুষ জুনিয়র ছেলেকে আমার পছন্দ। ওমা ! একদিন দেখি কি , ওগুলো সব একই ব্যাচের, এবং যথারীতি ভালো বন্ধু। 

মাঝে মাঝে ভাবি, যদি কখনো কোন ছেলের সাথে আমার প্রেম হয়, তাহলে তার বন্ধুদের দেখেও কি আমি মজে যাবো!! তওবা! তওবা!! কিন্তু হয়ে গেলে আমিই বা কি করতে পারবো? আমিও তো একটা মানুষ, না কি? হাহ, এমন সোনাবাঁধানো কপাল নিয়ে কি আর আমি জন্মেছি? আমার দেখে দেখেই জীবন পার করতে হবে। যাক গে ওসব। আরো কতো ব্যাচমেট, সিনিয়র, জুনিয়রের প্রেমে যে মজেছি, লিখতে গেলে মহাকাব্য না হোক, মহাগপপো হয়ে যাবে। হাসিব ভাইয়া, বিত্ত ভাইয়া, রৌপ্য ভাইয়া, রাকিব স্যার, আরো কত!! সবার নামধামও তো জানি না। ইশশ!! কি সুন্দর সব মানুষগুলো! রাকিব স্যারকে দেখলেই তো আমার ঝাঁপিয়ে পড়ে গালে, কপালে, নাকে ঠোঁটে পাগলের মতো চুমু খেতে ইচ্ছে করে। কি যে কষ্ট হয় স্যার-এর ক্লাসে!! স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বুঝবো কি, স্যারের পাতলা ঠোঁটের আধো হসিমাখা নিরীহ-শান্ত চেহারাটা দেখে উথালি-পাথালি কল্পনায় হারিয়ে গিয়েই পুরো একটা ঘন্টা কেটে যায়। এক ঘন্টায় কি সব শেষ হয়ে যায় না কি? স্যারকে নিয়ে মনে মনে কতো দিন সুখের সংসার পেতেছি, হানিমুনে গেছি এখানে-ওখানে, স্যার খুব আদর করে পড়া বুঝিয়ে দিয়েছে। 

আহ! প্রিয় সুখ-কল্পনারা! কখনো কি তোমাদের বাস্তবে আসতে নেই? তাসনীম ভাইয়া বা রৌপ্য ভাইয়া দু’জনের ক্ষেত্রেই প্রেমে মজেছিলাম তাদের প্রেমিকা আছে একথা জানার পড়েও। পড়তে দোষটাই বা কি? প্রেমিকা না থাকলেই কি তারা আমার সাথে উদ্দাম প্রেম শুরু করতেন না কি? তা কি এ জন্মে সম্ভব! কি বিষণ্ণ-মিষ্টি চেহারা ছিলো তাদের! আসলেই কি বিষন্ন ছিলো? কি জানি। আমি ভেবে নিতাম, ওরা এই প্রেমে সুখী নয়, খুব কষ্টে আছে। শুধুমাত্র আমার ভালোবাসাই পারে ওদের সব দুঃখ মুছে দিতে। হাসি পাচ্ছে এসব কথা শুনে? পেলে পাক। কল্পনা!! কি ভীষণ সুখের সব কল্পনা!! গোটা জীবনটাই কাটিয়ে দিলাম কল্পনায় ডুবে থেকে। আরো কতো অসংখ্যা প্রেমকল্পনা ছিলো আমার। অনেকগুলো তো ভুলেও গেছি। আজকে এই পর্যন্তই থাক, আরেকদিন বাকি সব বলবো।

নিঃসঙ্গ পাইন

একা একা দিনের পর দিন কাটাতে আমার ভীষণ কষ্ট হয়, যেনো দম বন্ধ হয়ে আসে। অথচ গোটা জীবন আমাকে একাই কাটাতে হবে। আমি জানি, চল্লিশ তো দূর, তিরিশ পার হবার সাথে সাথে আমাকে ভীষণ একা হয়ে যেতে হবে। সমবয়সী সব মানুষজন, বন্ধু-বান্ধবীরা যখন পুতুলের মতো সুন্দর, মায়াকাড়া বাচ্চা নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত, ক্লান্ত দিন কাটাবে; আমাকে তখন ভয়ানক নিঃসঙ্গতার সাথে বিষন্ন হয়ে লড়ে যেতে হবে। প্রতিটি মূহুর্তেই নিজেকে বেঁচে থাকার প্রেরণা দিয়ে যেতে হবে। হ্যাঁ, শুধুই বেঁচে থাকার। লোকে বাঁচে সন্তানের জন্য, সংসারের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য; আমাকে বাঁচতে হবে অকারণে, শুধুই নিজের জন্য। 



এমন কিছু প্রতিভাবানও আমি নই, যে বেঁচে থেকে সমাজের খুব উপকার করে ফেলবো, এমন কিছু সাহসীও নই যে ভীষণ বিপ্লব ঘটিয়ে দেবো। আমি বেঁচে না থাকলেও কারোই কিছু এসে যাবে না। অথচ, প্রতিটি ক্ষণেই নিজেকে বুঝিয়ে যেতে হবে আমার বেঁচে থাকা কতটা জরুরী। শুধুমাত্র সন্তান জন্ম দিতে পারবো না বলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রেখে যেতে পারবো না বলেই কি আমার জীবন ব্যার্থ? আমার সমস্ত শিক্ষা, সমস্ত যোগ্যতা সবই কি ব্যার্থ জননাঙ্গের কাছে? শুধুমাত্র প্রজননই বুঝি আমার সমস্ত সাফল্যের মাপকাঠি? এসবের কিছুই আমি বিশ্বাস করি না হয়তো, শুধুমাত্র জনক হওয়াই জীবনের স্বার্থকতা নয় তাও আমি খুব ভালোমতোই বুঝি। কিন্তু এও তো সত্যি, যৌনতার বাঁধনে, সন্তানের বাঁধনে কাউকে বাঁধতে না পারলে একলা জীবন কাটানো ছাড়া অন্য কোন উপায়ই নেই। বন্ধু? খুব ঘন ঘন বন্ধু পাল্টানোর স্বভাব আমার। বেশিদিন কারো সাথেই আমার খাতির টেকে না। 


প্রচন্ড স্বার্থপর আমি? হয়তো বা। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় সমস্যা হলো আমার অভিমান। এমন প্রচন্ড অভিমান আমার, যে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটির সামান্য অবহেলাতেও একেবারে বহুদূরের মানুষ হয়ে যাই কিছু দিনের ব্যাবধানে। সেই আমার নিঃসঙ্গ থাকা ছাড়া উপায় কি? মাঝে মাঝে ভাবি, যদি যথেষ্ঠ পুরুষালী হতাম, তবে কি আমার এমন তীব্র অভিমান থাকতো না? মেয়েলী হওয়াটাই কি আবেগের এমন তীব্রতার একটা কারণ? অথচ সবসময়, এমনকি যখন একা একা ভীড়ের পথে হেঁটে বেড়াই, তখনও মনে হতে থাকে, “যদি কেউ পাশে থাকতো!!”  অথচ এই আমার কখনোই খুব বেশি বন্ধু ছিলো না, এই আমি বরাবরই একা। এতদিনেও নিঃসঙ্গতায় অভ্যস্ত হতে পারি না কেন? যদি আমি বিষমকামী হতাম, যদি আমার সঙ্গিনী থাকতো, তবে কি কখনো কোনদিন আমি নিসঃঙ্গতায় ভুগতাম না? অথবা যদি এখনই কখনো আমার কোন সঙ্গী, ধরি জীবনসাথী জুটে যায়, সে পারবে আমার নিঃসঙ্গতা পুরোপুরি দূর করে দিতে? কোন মানুষের পক্ষেই কি তা সম্ভব? বেশিক্ষণ অনেক মানুষের সাথে থাকলে, একা হওয়ার সুযোগ না পেলে আমি হাঁপিয়ে উঠি। অথচ এই আমার প্রচন্ড ভয় হয়, ভবিষ্যতের নিঃসঙ্গ জীবনের কথা ভেবে। না, শুধুমাত্র যৌনতার অভাববোধ আমাকে কক্ষনো কাবু করতে পারে না। কিন্তু শুন্য বাড়িতে একা একা মরে পড়ে থাকার ভয় আমাকে ভীষণ দুর্বল করে দেয়। 

কল্পলোকের গল্প

তোমাকে ভালোবাসি, আরিয়ান!!!! বাস্তবে তো কোনদিন বলার সাহস বা সুযোগ কখনোই হয়ে ওঠে নি, ওঠবে না তাও জানি। কিন্তু মনে মনে, কল্পনায়, কত অসংখ্যবার যে চেঁচিয়ে বলেছি, ফিসফিসিয়ে বলেছি, তার হিসেব বোধ হয় স্বয়ং বিধাতাপুরুষের কাছেও নেই। কত অগণিত রাত বা দুপুরের ঘুমে ঢলে পড়ার আগে তোমায় ভেবে ভেবে কল্পনার আখ্যান রচেছি, কতভাবে তোমার সাথে খুনসুটি করেছি, তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়েছি, কিংবা হাউমাউ কেঁদেছি! মনেই হতো না যে আজ পর্যন্ত কখনো তোমার সাথে কোন কথাই বলা হয়ে ওঠেনি। কথা তো দূর, পরিচয়ই হয় নি এখনো! হবে এমন কোন সম্ভাবনাও বোধ হয় নেই।  অথচ পাঁচ বছর ধরে তোমায় চিনি, ক্যাম্পাসের এখানে-ওখানে তোমার চলা-ফেরা, হাসি-কথোপকথন দেখি মুগ্ধ হয়ে, মাথা নিচু করে ফেলি কিংবা মুখ ঘুরিয়ে নিই আমার চোখে তোমার চোখ পড়লেই! প্রথম তোমাকে  দেখি সেই ফার্স্ট ইয়ার-এ। তোমার ডিপার্টমেন্টের ফয়েজের বন্ধু মাহিন তোমায় দেখিয়ে  আমায় বলেছিলো, “ঐ যে দেখো, ক্যামিকেলের ফার্স্ট বয়। দেখতেও অনেক সুন্দর, তাই না? বডি বিল্ডার। বাবা-মা খুব রক্ষণশীল। এই ছেলে ওর কাজিনের সাথে প্রেম করতো বলে বাবা-মা মেনে নেয় নি, এখন এই এত ভালো ছেলেটা সিগারেট খায়, কত স্টাইল করে, কি ছেলে কি হয়ে গেলো!” মাহিনের কণ্ঠে ছিলো স্পষ্টই আক্ষেপের সুর, তুমি ফার্স্ট বয় হয়েও সিগারেট খাও, ধর্মভীরু মুসলিম পরিবারের ছেলে হয়েও নানানরকম স্টাইল করে ঘুরে বেড়াও – এতে বেচারা খুব হতাশ হয়েছিলো! ওর সব কথাই মোটামুটি এমন, এক্কেবারে বিশুদ্ধবাদী ছেলে ও। হাসিতে ফেটে পড়েছিলাম ওর কথা শুনে। কিন্তু মনের কোণে, হাসির আড়ালে, একটু আক্ষেপ, অল্প একটু চিনচিনে ব্যাথা হামাগুঁড়ি দিয়েছিলো সে-ই প্রথম দিনই। অল্প একটু ভালো লাগাকে কেন্দ্র করে স্বপ্নের বীজ পুঁতলাম কখন, নিজেও টের পাই নি।  তারপর তো অনেকগুলো দিন গড়ালো, সপ্তাহ, মাস গড়িয়ে বছর বদলালো। কল্পনার ডালপালাও মেলতে লাগলো একটু একটু করে।কল্পনার বাইরে বাস্তবে,  তোমার অনেক বন্ধুই আমার বন্ধু হলো, তুমি ছাড়া। আমার অনেক বন্ধুও তোমার বন্ধু হতে লাগলো, আমি ছাড়া। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনে তোমার ছবি দেখি, তোমার বন্ধুদের মুখে জানতে পারি মডেলিং-এ দাপিয়ে বেড়াচ্ছো তুমি। পাঁচতারা হোটেল এ তোমার শো হয় বলেও শুনি। তোমার গুণের কথা এর-ওর মুখে আরো শোনা হয়। কিন্তু তোমার-আমার কথা বলা হয়ে ওঠে না কখনোই। দিন গড়াতেই থাকে স্বাভাবিক নিয়মে। আমিও আমার নিয়মে কল্পনার সাম্রাজ্য গড়তে থাকি, সংসার পাতি তোমায় নিয়ে। মনে মনে ভাবতে থাকি, ভীষণ বিষন্নতায় ভুগি যখন আমি, তখন তুমি কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলো, “কি হলো! এত মন খারাপ করলে চলে? বোকা ছেলে!” আমি কল্পনায় তোমার বুকে মাথা রেখে মুখ লুকিয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ কাঁদি, “আমার কিচ্ছু ভাল্লাগে না!” আমার মাথার চুলে তোমার বলিষ্ঠ হাতের আদরমাখা আঙ্গুলগুলো ডুবিয়ে দিয়ে কানের কাছে ঠোঁট নামিয়ে ফিসফিসিয়ে তুমি বলো, “সোনামণি! তুমি মন খারাপ করো না! তাহলে যে আমারও খুব কষ্ট হয়!” আমার মন ভালো হয়ে যায়, বিষন্নতা এক ফুঁয়ে যেনো বহু বহু দূরে উড়ে সরে যায়, তোমার দরদমাখা স্বরে! দ্বিবাস্বপ্ন বাঁধ মানে না আমার। ভাবতে থাকি, আমায় নিয়ে তুমি অনেক দূর ঘুরতে যাও, কোন সবুজ গ্রামে। সারাপথ শক্ত করে ধরে রাখো আমার হাত, যেনো ছোট্ট ছেলে আমি। হারিয়ে যাবো তুমি আঁকড়ে ধরে না রাখলে। 


আরো ভাবতে থাকি, সোনালী ভোরগুলোতে তোমার গলা জড়িয়ে ধরে আদিখ্যেতায় ভীষণ মেতে উঠি আমি। তুমি শান্ত হেসে আমায় প্রশ্রয় দাও, তারপর একসময় গালে-কপালে সজোর চুম্বনের ঝড় তুলে বিড়বিড় করতে থাকো, “আমার পাগলা বাবুটা! আমার সোনাজাদুমণিটা!”  তোমার আদরে-প্রশ্রয়ে আমি ঘর কাঁপিয় খিকখিক হাসি, তারপর আরো শক্ত করে জাপটে ধরে বলি, “তোমাকে ছাড়া কোত্থাও যেতে আমার ভাল্লাগে না। ক্লাসেও না। কোত্থাও না”। তুমি আবারো আদুরে অভিভাবকের সুরে বলো, “জানপাখি! এটাই যে জীবন। সব তো মেনে নিতে হবে। আর তাছাড়া আমি তো সব-সময়ই তোমারই আছি। ভয় কিসের?” এভাবেই আদরে-আহ্লাদে, খুনসুটিতে দিন কাটতে থাকে আমাদের। সবই অবশ্য আমার কল্পনাতে।   আর বাস্তবজীবনে তুমি-আমি অপরিচিতই থেকে যাই, দেখেও মুখ ঘুরিয়ে নেয়া, কথা না বলে চলে যাওয়া, একই ব্যাচের ছেলে! তাতে আমার খুব একটা আফসোসও হয় না অবশ্য! বরং পরিচয়েই যতো ভয় আমার! যদি তুমি আমার কল্পনার মতো না হও! যদি বাস্তবতার সামনে আমার সুখ কল্পনা নিদারুণ অসহায়, নিরেট মিথ্যে বলে ধরা পড়ে যায়! যদি তুমিও আর সবার মতো ভীষণ ভাবে Homophobic হও, আমার ভালোবাসাকে ‘বিকৃত রুচি” বলে ঘৃণায় মুখ কুঁচকে চলে যাও! এর চেয়ে বরং আমার কল্পনারা-ই ঢের ভালো! তোমাকে মনের মতো কল্পনা করে নিয়েই আমার সুখের দিন কাটতে থাকে। আর সেজন্যই, পরিচিত হওয়ার কোন ইচ্ছে, বা তাড়ন – কিছুই জাগে না আমার মনে।      “একটুকু ছোঁয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি -        তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী………”  একবার আমরা সবাই, মানে ব্যাচের সবাই ঘুরতে গেলাম। তুমি ছিলে না সেখানে। ছিলো তোমার রুমমেট, যে ছিলো আমার রুমমেটের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার মুখেই একদিন শুনলাম, “ আরিয়ান বলেছে, তুমি যেনো ওর কিছু ছবি তুলে দাও”। আকাশ থেকে পড়েছিলাম আমি! আমাকে চেনে? এই ছেলে আমায় চেনে? আমার নামও জানে? আরিয়ান চেনে আমায়?!! ওর মুখেই জানতে পেরেছিলাম, কিভাবে চিনলে আমায়, নাম জানলে কি করে। সুখের তীব্র একটি স্রোত আমার বুক তীব্রভাবে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। সারাটি ক্ষণ সেই স্রোতে ভাসতে থাকি আমি, সাঁতার কাটি সুখের গাঙ্-এ। গাঙ্গের জলে রংধনুর ছায়া দেখি। কিন্তু তারপরও, কোনদিন আর কথা বলা হয়ে ওঠে না, ছবি তো বহুত দূর!! তবে রাস্তাঘাটে দেখা হলে চোরা চাহনি বিনিময় হয় এখন। আমি লক্ষ্য করি, আমায় হনহনিয়ে যেতে দেখলে ভীড়ের পথে তুমি কিছুটা পথ ছেড়ে দাঁড়াও, আমার জন্য! হয়তোবা এটুকুও আমার কল্পনা। হয়তোবা এটুকুও আমার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনার ফসল, তুমি হয়তো ওমনি ওভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলে। কিন্তু আমার ভীষণ ভালো লাগে, অমন ভাবতে। আসলে আমার যে জীবন, তাতে কল্পনাদের মূল্য বাস্তবের চেয়ে কিছুমাত্র কম তো নয়। এমনকি, কল্পনা নিয়েই আমার বেঁচে থাকা। বাস্তব দুনিয়ায় খুব বেশি অধিকার বা দখল 

– কোনটাই তেমন নেই আমার। বাস্তবতা আমার প্রতি খুব বেশি সদয় ছিলো না, কখনোই। তাই অতটা কল্পনাবিলাস নিয়ে আমার কখনোই আক্ষেপ হয় না। সুযোগ পেলেই কল্পনার অতলে ডুব দিই আমি। বাস্তবের চেয়ে ঢের আপন কল্পনার সে জগৎ। ভীষণ সুখি হয়ে এভাবেই কাটতে থাকে আমার দিন-রাত। এর মাঝেও আমি একবার ভুল করি। ভীষণ ভুল! প্রেমে পড়ি, আবারো। অন্য একজনের। এবং সেই প্রেম শুধুমাত্র কল্পনাতেই আবদ্ধ থাকে না। এবার কল্পনা আর বাস্তবে ভীষণ গুলিয়ে ফেলে বিষম গোল বাঁধাই আমি। তার সাথে মিশতে থাকি, হেঁটে বেড়াই, রিক্সায় চাপি, কথা বলি। তার ডাক শুনে পাগলপারা হয়ে ছুটে যাই, তাকে নিজের ভাবতে থাকি। ভাবি, এতদিনে বুঝি স্বপ্ন বাস্তবে রুপ নিলো। এতদিনে বুঝি প্রেম স্বর্গ ছেড়ে মর্ত্যে নেমে এলো! এতদিন বাদে বুঝি শুধুই কল্পনায় ডুবে থাকার হাত থেকে নিস্তার মিললো। এতদিনে বোধ হয় আমার বাস্তবে ফেরার দিন হলো। কল্পনায় আরো ভীষণ বেপোরোয়া হই এবার। এবার শুধু কল্পনা নয়, রীতিমতো পরিকল্পনা করতে থাকি, জীবনকে নিয়ে। ভুলে যাই, অবাস্তব বলে যে একটা শব্দ আমার জীবনের সাথে সেঁটে আছে, আমার অভিধানে স্থায়ী আসন পেতে আছে। তাকে এতটাই নিজের ভাবতে থাকি যে, সে যে আমার মতোন নয়, সে যে একজন স্বাভাবিক মানুষ, সে যে একজন বিষমকামী মানুষ, সে যে কখনোই আমায় ভালোবাসতে পারে না – এসব কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে বসে থাকি আমি। তার প্রেমে নিত্য হাবুডুবু খেয়ে, কল্পনা-বাস্তবের ভীষণ দ্বন্দ্বের নিতান্ত অসহায় শিকার হয়ে বুক ভেঙ্গে কাঁদতে থাকি। বাস্তবে ফিরে এসে দেখি, ভীষণ বোকামীটাই করে ফেলেছি আমি! ভাবতে থাকি, এটা কি করলাম আমি? এটা কি হলো? এমন কেন হলো? কেউ আসে না, আমার কান্না মুছতে, আমার মাথা সবল বুকে চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলতে, “ভালোবাসি! ভালোবাসি!” এই প্রথম টের পাই, বাস্তবতা কতোটা আলাদা! কতটা শক্ত! ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঘুমোতে যাই, কাঁদতে কাঁদতে ঘুম ভাঙ্গে আমার। এই প্রথম বুঝতে পারি, কি ভীষণ ভুলই না করে ফেলেছি, কল্পনাকে বাস্তবে নামাতে চেয়ে! করার কিছুই থাকে না, ফুঁপানো, আর ক্রমাগত নিজেকে ঘৃণা করা ছাড়া। তাকে ভোলার আপ্রাণ চেষ্টাও চলতে থাকে সমানতালে। তাকে ভুলতে পারবো, এই আশায় আশেপাশের অন্য সুদর্শন-সুপুরুষদের নিয়ে কল্পনায় ডুবে থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু বারবার তার চেহারাই কেবল ভেসে ওঠে, মনের চোখে। তোমার কথা ভুলে ছিলাম তখন, সেই ঘোরের মাঝে। দেখা হলেও দেখতাম না তোমায়। এবার আর ভান নয়, এবার সত্যিই খেয়াল করতাম না, তোমার উপস্থিতি। খুব কঠিন দুঃখও একসময় সয়ে যায়। দিন কাটতে থাকে। ক্ষতে প্রলেপ পড়তে থাকে, স্মৃতিতে পলি।  তোমার সাথে দেখা হতে থাকে চায়ের দোকানে, ছোলা-মুড়ির ভ্যানের পাশে, হল-এর সামনের রাস্তায়, তড়িঘড়ি ছোট্ট গেইট পেরোতে গিয়ে হঠাৎ তোমায় দেখে হোঁচট খাই 

– তোমার আমার মিলন ঐ পর্যন্তই। আবারও আমার চোখ পড়ে, মন পড়ে, তোমার উপর। অতদিনে আবারো আমার পূর্বপ্রেম চাগিয়ে ওঠে। আবার ভাবতে থাকি তোমায়, অবাক হয়ে দেখি, তোমায় ভাবলে আর তার চেহারা ভেসে ওঠে না মনের কোণে। বলতে পারো একরকম মুক্তি পেয়ে যাই আমি, তার স্মৃতি থেকে। তুমি হয়ে ওঠো আমার কল্পনার প্রেমলোকের আশ্রয়। তাকে ছেড়ে এবার তোমায় নিয়েই আবারো স্বপ্ন বুনতে থাকি। বোধ হয় আমি ভীষণ দুশ্চরিত্র বলেই।  কি করবো বলো? যে জানে যে তার পক্ষে কখনোই প্রেম করা সম্ভব না, তার জীবনে কখনোই কোন সংসার আসবে না, কোন সন্তানের বাঁধন, কোন ভালোবাসার মালা তার গলায় জড়াবে না, সে বেচারা না হয় শুধু কল্পনা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকুক। সুখে থাকুক শুধু সুখস্বপ্ন দেখে দেখে। তোমরা, স্বাভাবিক মানুষেরা বাস্তবতা নিয়ে সুখী থাকো। বাস্তবতায় তোমাদের পুরো দখল থাকুক। আমার থাকুক কল্পনা।

বিকল্প যৌনতা , অধিকার ও স্বীকৃতি, প্রেক্ষাপট : বাংলাদেশ

ভারতে যখন সেকশন-৩৭৭ কার্যকর করার বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছিলো, তখন অসংখ্য ভারতীয় লেখক-অধ্যাপক-সামাজকর্মী থেকে শুরু করে অনেক সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীকেও দেখেছি অনলাইনে, লেখায় প্রতিবাদের ঝড় তুলতে। এমনকি সে দেশের প্রথম সারির পত্রিকা ‘টাইমস অভ ইন্ডিয়া’ প্রকাশ্যেই সমকামীদের সমর্থন দিয়েছে এ আন্দোলনটিকে। মুম্বাই মিরর নামে মুম্বাইভিত্তিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় দেখেছি সমকামী সন্তানের অভিভাবক নিয়ে উৎসাহব্যাঞ্জক সাক্ষাৎকার। এমনকি ওদেশের প্রখ্যাত এক গহনা প্রস্তুত ও বিপননকারী প্রতিষ্ঠানও সাহস দেখিয়েছে সমকামীদের অধিকার রক্ষায় সমর্থন দেবার। এর বাইরেও আরো অনেক ব্যাক্তি, প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া সমকামীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই সব লেখক, ছাত্র, মিডিয়াকর্মী – প্রতিবাদীদের দলে যে কেবল সমকামী এবং তাদের স্বজনেরা ছিলো তা-ই নয়, বরং অসংখ্য বিষমকামী মানুষেরাও ছিলো। কি লাভে? উদ্দেশ্য একটাই, মানবাধিকার রক্ষা। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সব নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই ছিলো তাদের লক্ষ্য। এবার নজর দিই আমাদের নিজেদের দেশে। ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সাথে আমাদের বহু বছরের সম্পর্ক-সংসর্গ থাকলেও তাদের সাথে আমাদের কিছু মৌলিক পার্থক্যও আছে। এদেশে জ্ঞানীলোকের অভাব নেই, মানবতার রক্ষক দাবীদারেরও কোন কমতি নেই। অথচ আজ পর্যন্ত কতদিন এদেশের কতজনকে সমকামীদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছেন? 


হ্যাঁ, সাম্প্রতিককালে হিজড়া সম্প্রদায়ের “স্বীকৃতি” নিয়ে এদেশবাসীকে বেশ “উদার” হতে দেখা গেছে। এই স্বীকৃতির মানে হলো, একজন হিজড়া যে নারীও নন, পুরুষও নন, সেটা কাগজে কলমে লিখতে পারার স্বীকৃতি এবং তাদের ভোটাধিকার। ব্যাস! যৌন সংখ্যালঘু, অর্থাৎ LGBT Community’র সদস্যের অধিকার রক্ষায় এটুকুই বাংলাদেশের অগ্রগতি। আপাতদৃষ্টিতে এটুকুকেই “যথেষ্ঠ অর্জন” বলে মনে হলেও, এর পেছনে রাজনীতির সুক্ষ্ণ একটি প্যাঁচ আছে। Transsexual, অর্থাৎ হিজড়াদের প্রতি সমাজ যতটা দয়া দেখাতে প্রস্তুত, সমকামী বা রুপান্তরকামীদের ক্ষেত্রে কিন্তু তার কিছুমাত্রও না। প্রথম কারণ, ধর্মীয়। মুসলিমপ্রধান এই দেশে সমকামীদের অধিকার তো দূর, স্বীকৃতি প্রদানও রীতিমতো অসম্ভব। কারণ ইসলাম কোনরকম রাখঢাক ছাড়াই সরাসরি সমকামের বিরোধীতা, এমনকি সমকামীদের কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। এবং রুপান্তরকামীদের “অভিশপ্ত”, “স্রষ্টার বিরোধীতাকারী” বলে উল্লেখ করেছে। সে তুলনায় জন্মগতভাবে উভলৈঙ্গিকদের ব্যাপারে কিছুটা নিশ্চুপ থেকে দায় সেরেছে। কারণটি হলো উভলৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যগুলো শারীরিকভাবে দৃশ্যমান, তাই একে “মানুষের কোন হাত নেই” এবং “স্রষ্টার বিচিত্র খেয়াল” বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু সমকামিতা বা উভকামীতার ব্যাপারগুলো প্রধানত মনস্তাত্বিক এবং দৃশ্যমান শারীরিক কোন বৈশিষ্ট্য নয় বলে সেটিকে “ব্যাক্তির ইচ্ছাকৃত বিকৃতি” নাম দেগে কঠোরভাবে দমনের বিধান দেয়া হয়েছে। যেহেতু ধর্মের ক্ষেত্রে “বিশ্বাসে মিলায় বস্ত, তর্কে বহুদূর” মতাবাদই প্রধান, অর্থাৎ যুক্তি-তর্কের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসই প্রাধান্য পায়, তাই হাজার বছরের পুরনো মতবাদ, বিজ্ঞানের যুগে সেটা যতোই ভুল প্রমাণিত হোক না কেন, ধর্মভীরুরা তার কোনরকম পরিবর্তন মানতে প্রস্তুত নন। সেকারণেই এদেশবাসী সমকাম নিয়ে কোনরকম আলোচনা করতেও আগ্রহী না। কারণ তাদের মতে “বিধান” তো হাজার বছর আগেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, মোটামুটিভাবে ধর্মীয় কারণটি এই, যদি সমকামীদের স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়া হয় এবং তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়, তাহলে ধর্মের “আদি, অকৃত্রিম, নির্ভুল এবং অপরিবর্তনীয়” ইমেজটি পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়বে, ফলে অবধারিতভাবেই ধর্মের অন্যান্য দিকগুলোর যৌক্তিকতা নিয়েও মানুষ প্রশ্ন তুলতে থাকবে এবং চূড়ান্ত পরিনামে অন্ধবিশ্বাসের ভিতটি একেবারে নড়ে গিয়ে ধর্মব্যাবসার অস্তিত্বটিকেই হুমকিতে ফেলে দেবে। সেটি বুঝতে পারে বলেই ধর্মের সেবকেরা এ সম্পর্কিত যে কোন কথা-বার্তা বা যুক্তি-তর্কের সুযোগ দিতেও প্রস্তুত না। এবং এই ধর্মীয় কারণেই অনেক সমকামীও, যারা যৌনসম্ভোগে সিদ্ধহস্ত (এদেশে মক্তব-মাদ্রাসার সমকামী মোল্লা এবং ভ্যাটিকানভিত্তিক ক্যাথলিক চার্চগুলোর পরিস্থিতি বিবেচনা করুন), তারাও সমকামের শারীরিক তৃপ্তি উপভোগে যত বেশি সচেষ্ট, ধর্মীয় বিধানগুলোর যৌক্তিকতা আলোচনার বেলায় ঠিক ততটাই বিপরীতমুখী। তাই সমকামীতাকে পাপ বলে জেনে নিয়েই তারা শিশুনিপীড়নের মতো জঘন্য অপরাধগুলোতে লিপ্ত হয়। অথচ যুক্তির আলোয় দেখে বিকল্প যৌনতাকে যদি স্বাভাবিকভাবে নেয়া হতো তাহলে শিশুকামের মতো বিকৃত মানসিকতাকেও রোধ করা যেতো ।

দ্বিতীয় কারণটিকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি শিক্ষার অভাব বলে। প্রত্যেক বছর হাজার হাজার “এ-প্লাস”-এর সংখ্যা দেখে এবং স্বাক্ষরতার হার দেখে আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। ভাবি, দেশ শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার মানে যে কেবল বছর বছর পাশ দিয়ে দিয়ে বড় নোকরী করাই না, শিক্ষিত হওয়ার মানে যে আরো অনেকটুকু উদার মন গড়ার এবং পৃথিবীর বৈচিত্র সম্পর্কে জানার-বোঝার সক্ষমতা; এই অশিক্ষিত, দারিদ্র্য জর্জর দেশটির মানুষ হিসেবে আমরা প্রায়ই সেকথা বেমালুম ভুলে বসে থাকি। সেকারণেই আমরা অর্থনৈতিকভাবে ধীরে ধীরে হলেও যতোটা উন্নতি করতে পারছি, নৈতিক দিকটি আমাদের ততটা বিকশিত হচ্ছে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি, জাতিগত ভাবে আমরা খুব একটা পড়ুয়া নই। স্কুল-কলেজের দু’চারটে পাঠ্যবই, কিছু দৈনিক পত্রিকা আর দু’একটা জনপ্রিয় প্রেমের উপন্যাস ছাড়া আমাদের দেশের নাগরিকদের সিংহভাগই অন্য কোন বইয়ে হাত ছোঁয়ান না। অথচ মনের ওদার্য্য এবং জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর জন্য পড়ার কোনই বিকল্প নেই। সুশিক্ষিত মানব হবার প্রধান শর্তই হলো, প্রচুর পড়াশোনা থাকা। ভারতের যে আন্দোলনটির কথা শুরুতে বলা হলো, রুঢ় বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র শিক্ষিত মধ্যবিত্ত/উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজেই সেটি সাড়া জাগাতে পেরছে। আন্দোলনকারী এবং সমর্থনকারীদের সিংহভাগই উচ্চশিক্ষিত। গোটা ভারতবর্ষের বিশাল অল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠির কাছে মানবা্ধিকার রক্ষার এই আন্দোলন তার বার্তা পৌঁছে দিতে খুব বেশি সফল হয় নি। তাই আন্দোলনটির গায়ে না চাইলেও “Elitist” তকমা লেগে গেছে। এমন নয় যে আমাদের দেশে সুশিক্ষিত নাগরিক একেবারেই নেই। তবে  বিশাল বড় দেশ ভারতের বড় বড় শহরগুলোর শিক্ষিত সজ্জনেরা সমকামীদের সম-অধিকারের প্রশ্ন যেভাবে জাতীয়পর্যায়ে একজোট হতে পেরেছিলেন, আমাদের দেশে সেটা কখনোই সম্ভব হয় নি।


তৃতীয়ত, ধর্ম এবং শিক্ষার অভাব বাদ দিলে, যদি সামাজিকভাবেও আমরা চিন্তা করি, তাহলেও দেখতে পাবো, মোটামুটি উদারপন্থী নাগরিকেরা, যারা ততটা ধর্মভীরু নন, ব্যাক্তিজীবনে যারা ধর্মকে খুব বেশি না জড়িয়ে একটি আধাআধি সুবিধাজনক সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং নিদেনপক্ষে উচ্চমাধ্যমিক বা স্নাতক পর্যায় ডিঙ্গিয়ে সমাজের সচেতন নাগরিকের পদটি দখল করে আছেন, তারাও সমকামের বিরুদ্ধে প্রচন্ড সোচ্চার। যদিও হিজড়াদের ব্যাপারে কিছুটা নরম বলেই মনে হয় তাদের। কেন এই দ্বিমুখী অবস্থান বিকল্প যৌনতার ব্যাপারে? অপ্রিয় হলেও সত্যি, হিজড়ারা এই সমাজ থেকে বিতাড়িত, পৃথককৃত। তাই সমাজের অধিবাসীদের সাথে স্বার্থগত প্রতিযোগীতা বা দ্বন্দ্ব তাদের কম। আর্থিক বা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোন হিজড়ার কথা এদেশের নিকট ইতিহাসে সহজলভ্য না।  তার কোনরকম সুযোগ সমাজ রাখে নি। চাকুরী, ব্যাবসা -  কোনক্ষেত্রেই কোন হিজড়াকে আপনি প্রতিদ্বন্দী হিসেবে পাবেন না। সুবিধাবাদী সমাজটি বহু আগেই ঠান্ডা মাথায় সে সম্ভাবনাটি নষ্ট করে দিয়েছে। নাচা-গাওয়া ছাড়াও যে হিজড়াদের অন্য কোন মেধা থাকতে পারে এবং সামান্য সুযোগ পেলেই অন্য যে কোন মানুষের মতোই মেধার স্ফুরণ ঘটতে পারে, সেটা সমাজ মানতে নারাজ। শারীরিক গঠনগতভাবে আলাদা হওয়ায় এবং বাহ্যদৃষ্টিতেই আলাদা করতে পারায় সমাজ অঙ্কুরেই তার সমস্ত সম্ভাবনা বিনষ্ট করে দেয়।  তাই মুখে মুখে যতোই তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি এবং ভোটাধিকার দিয়ে করুণা দেখাক না কেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কখনোই হিজড়াদের নিজের সমতুল্য মানুষ ভাবতে প্রস্তুত না। কিন্তু সমকামীরা যেহেতু সমাজের মূলধারারই মানুষ, তাদের যেহেতু বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আলাদা করতে সমাজ অসমর্থ, তাই একজন সমকামী শিক্ষা-দীক্ষায় একজন বিষমকামী্র সমান সুযোগ-সুবিধা পান এবং ফলশ্রুতিতে ক্যারিয়ার বা অন্যান্য সব ক্ষেত্রেই বিষমকামীদের সাথে প্রতিযোগীতা করতে সক্ষম, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তার বিষমকামী প্রতিদ্বন্দীর চেয়ে অধিক সফল হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামাজিক, মেধাগত সকল দিকেই একজন সমকামী অন্য একজন বিষমকামীকে টেক্কা দিতে পুরোপুরি সমর্থ। হয়তোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটি, শিল্পজগতের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল শিল্পীটি,  মেধাবী খেলোয়াড়, অভিনেতা কিংবা ডাক্তারটি, অথবা সফল ব্যাবসায়ী/উদ্যোক্তাটি -  আপনার চারপাশেই হয়তো এমন অনেক সম্ভাবনাময় মানুষগুলো আছেন যারা সমকামী।   আমাদের দেশে কেউ প্রকাশ্যে আসেন না বলে আমরা জানতে পারি না। কিন্তু যেসব দেশে মানুষ নির্ভয়ে তার Sexual Orientation-এর দিকটি প্রকাশে সক্ষম, সেখানকার ইতিহাস কিন্তু বলে যে সমকামীরা প্রকৃতিগতভাবেই বেশি অনুভূতিপ্রবণ এবং সৃষ্টিশীল। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি, যার প্রতিভা দেখে এখনো মানুষের বিস্ময়ের ঘোর কাটে না, সেই ষোড়শ শতকেই যিনি বিমানের নিখুঁত ডিজাইন করেছিলেন, যাকে বলা হয় একই সাথে চিত্রকলা, বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, গণিত এবং দর্শনের অপার বিস্ময়, তিনি একজন সমকামী ছিন। পশ্চিমা সঙ্গীতজগতের প্রবাদপুরুষ স্যার এলটন জন একজন সমকামী। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন অকৃত্রিম বন্ধু বিখ্যাত আমেরিকান কবি এলেন গিনেসবার্গ একজন সমকামী। ওপার বাংলার মেধাবী চিত্রনির্মাতা প্রয়াত ঋতুপূর্ণ ঘোষের কথা আমরা সবাই জানি। এমন আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে। অর্থাৎ, বিষয়টি দাঁড়ালো যে, সমকামীরা বিষমকামীদের করুণা ছাড়াই তাদের সাথে টেক্কা দিতে প্রস্তুত বলেই বিষমকামীরা সমকামীদের উপর খড়্গহস্ত। তাদের মতো নন, অথচ তাদের সমান সমান কাজ করতে, সাফল্য পেতে সক্ষম, এমন কাউকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা সহজে ছাড় দিতে প্রস্তুত না। নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বটি এত সহজে নারী বা সমকামীদের হাতে নত হতে দিতে পুরুষতন্ত্র কিছুতেই চাইবে না, এটাই সত্য। হিজড়াদের ক্ষেত্রে যেহেতু সাফল্যের সব পথ শুরুতেই রুদ্ধ করে দেয়া হয়, সমান সমান হয়ে ওঠার সবটুকু সম্ভাবনার গোঁড়াতেই নুন ঢেলে দেয়া হয়, তাই তাদের নিয়ে দু’চারটে টুকটাক করুণামিশ্রিত মিষ্টি কথা বলতে তেমন কোন ক্ষতি নেই। এটাই হলো সামাজিক কূটচালের দিকটি।

হিজড়াদের চোখের সামনে “স্বীকৃতি” নামক মুলাটি ঝুলিয়ে দিলেও সমকামীদের ব্যাপারে কট্টর অবস্থানে থাকার রাজনৈতিক ব্যাখাটিও বেশ মজার। আমাদের দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি হলো আপাতঃপ্রগতিশীল আওয়ামি লীগ এবং প্রগতিবিরোধী জামায়াত সমর্থিত দল বিএনপি। জামায়াত-বিএনপি যেহেতু প্রগতির ধার ধারে না, মধ্যযুগীয় রাষ্ট্র গঠন করাই যেহেতু তাদের মূলনীতি, তাই তারা হিজড়া বা সমকামী কোনকিছু নিয়েই আপাতত মাথা ঘামায় না। আওয়ামিলীগ যেহেতু প্রগতিশীলতার দাবিদার, অথচ আধুনিক বিশ্বে কোন হোমোফোবিককে প্রগতিশীল বলা অসম্ভব, আবার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সমকামী বা উভকামীদের নিয়ে কোনরকম কথা বলাই জনপ্রিয়তা হারানোর জন্য যথেষ্ঠ, তাই এই রাজনৈতিক দলটি এমন একটি বিষয়ের অবতারণা করলো যাতে বহিঃবিশ্বে নিজেদের উদার-মানবতাবাদী ভাবটিও বেশ বজায় থাকে, আবার দেশের রক্ষণশীলদের তোপের মুখেও পড়তে না হয়। অর্থাৎ সাপও মরলো, আবার লাঠিও ভাঙলো না।

চতুর্থত, বলতে দ্বিধা নেই, বৈচিত্র্য এবং বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করার মানসিকতার অভাব এদেশে প্রচণ্ড। আমাদের এই ছোট্ট দেশটি দুভার্গ্যজনকভাবে জাতিগত-ভাষাগত-সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্য থেকে বহুলাংশে বঞ্চিত। যে অল্প খানিক বৈচিত্র্য আছে আমাদের, সেটুকুর অস্তিত্বও মৌলবাদীদের হুমকির সামনে ক্ষয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। বৈচিত্র্যকে, ভিন্নতাকে মেনে নেয়ার মানসিকতা আমাদের অনেক কম বলেই সহনশীলতাও আমাদের অনেক কম। পৃথিবীর যে কোন শহর বন্দরের তুলনায় আমাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম অনেক কম কসমোপলিটন, বাকি দেশের কথা নাই বললাম। এদেশে এক গ্রামে ভিন গাঁয়ের লোককে বলা হয় বিদেশী, এক জেলায় অন্য জেলার লোককে খানিকটা হলেও বাঁকা চোখে দেখা মানুষের অভাব পড়ে না কখনোই। এখনো আদিম সমাজের অনেক ত্রুটিই আমাদের মাঝে বিদ্যমান। আধুনিক, বৈচিত্র্যময় সমাজ হতে এখনো অনেক দেরী। মৌলবাদ শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই না, আমাদের সাংস্কৃতিক-সামাজিক ক্ষেত্রেও প্রকট। শুদ্ধবাদিতা কখনোই কোন সমাজের জন্য মঙ্গল আনতে সক্ষম নয়। শুদ্ধবাদীতা কেবল গোঁড়ামী এবং অন্যদের প্রতি ঘৃণাই উস্কে নেয়। যে সমাজ বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা করতে যত বেশি সক্ষম, সে সমাজ তত বেশি আধুনিক, তত বেশি মানবিক। যে সমাজ ভাষাগত-জাতিগত-ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা করতে অসমর্থ, সে সমাজের কাছে বিকল্প যৌনতার গ্রহণযোগ্যতা  আশা করা পুরোপুরি বাতুলতা। তবে কি এদেশের সমকামী বা বিষমকামী সমাজের সামনে কোনই আশা নেই, “স্বাভাবিক মানুষ” স্বীকৃতি পাবার? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য হয়তো আরো কয়েক দশক অপেক্ষা করতে আমাদের। দেশটি যদি একটি ধর্মসর্বস্ব, তথাকথিত শুদ্ধবাদী সমাজ হয়েই বেড়ে ওঠে, জনবহুল দেশটির বেশ বড় সংখ্যার সমকামী সদস্যরা যদি নামমাত্র শিক্ষিত এবং নিজের যৌনতাকে, আগ্রহ-ভালোবাসাকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করতে অসমর্থ হয় তবে আমাদের ভাগ্যে মধ্যএশিয়ার মধ্যযুগীয় পরিণতিই অপেক্ষা করবে, যেখানে ভালোবাসা মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ বলেই গণ্য হবে।
 
^ মাথায় ওঠ