blogger widgets
আমাদের ব্লগে এক্সট্রিম নয়েজ -এর লেখা সকল পোস্ট।
Showing posts with label এক্সট্রিম নয়েজ. Show all posts

Sunday, 23 February 2014

অদেখা ভবিষ্যত

অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের সুখ-দুঃখ আর ভবিষ্যতের একরাশ স্বপ্ন ও প্রত্যাশা... 
এই নিয়েই আমাদের জীবন। 
তার মধ্যে ভবিষ্যৎ টাই আমাদের জন্য অনিশ্চিত। 
আমরা এর জন্য শুধু কামনা আর চেষ্টাই করতে পারি। কিন্তু পারিনা পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে। 
যদি পারতাম ! তাহলে আমাদের অতীতটা শুধু সুখময় স্মৃতির, আর বর্তমানে দুঃখের কোন উপস্থিতিই থাকত না। 
তার পরেও মানব মনের অন্তরাল থেকে স্বপ্নের জাল বোনার কাজটাকে তো কেউ থামাতে পারেনি, পারবেও না। কিছু সিদ্ধান্ত আমরা আমাদের বর্তমানে নেই, যা অনেক সময় আমাদের হাজারো স্বপ্নে ঘেরা ভবিষ্যতকে এক জ্বালাময় অতীতের রূপ দেয়। আর তখন হাজার চাইলেও সেই ভুলকে সংশোধন করার ক্ষমতা আমাদের থাকেনা... 

আমি অলক... 
নেদারল্যান্ডের একটা LGBT সংস্থার হয়ে কাজ করছি গত বছর তিনেক যাবত। 
যেহেতু এখানে সমকামীদের অধিকার ও ভালবাসার ক্ষেত্রে তেমন কোন বাধা নিষেধ নেই ।
তাই এখানে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে প্রায় শ’খানেক LGBT সংস্থা। যাদের প্রধান কাজ সমকামী, উভকামী ও ট্রান্সজেন্ডার দের মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক ভাবে সচেতন ও সাহায্য সহযোগিতা করা। আমিও এমনি একটি সংস্থার সাথেই জড়িত। 
গত তিন বছরে বিভিন্ন জাতির কয়েক হাজার সমকামী ছেলে ও মেয়েকে দেখেছি। 
তাদের সাথে কথা বলেছি। 
তাদেরকে নানা ভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। আর এদের মাঝে একটি জুটি... আমার সবচেয়ে প্রিয় ও সবচেয়ে স্পেশাল... নিলয় – স্বপন। 
নাম শুনেই বুঝতে পারছেন যে তারা বাঙালি। 
হ্যাঁ , আর এটাই ছিল আমার তাদের এত ভাল লাগার প্রধান কারন। 
আর তারাই আমাদের সংস্থার সাথে সপৃক্ত একমাত্র বাঙালি জুটি। 

আমি নিজে এখনো নিজের জন্য কাউকে পাইনি। 
তাই ওদের দেখলে আমার মনে হয় যেন ওদের মাঝে আমি নিজেকে খুজে পাই। 
ওদেরকে জানি প্রায় বছর খানেক হয়। 
আর এতদিনে ওদের সাথে সংস্থার বাইরেও খুব ভাল একটা সম্পর্ক হয়ে যায় আমার। 
আসলে ওদেরকে আমার নিজের পরিবারেরই একটা অংশ মনে হত। 
তাই ওদের খুঁটিনাটি কোন বিষয়ই আমার অজানা ছিলনা। 
নিলয় খুবই সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। বছর চারেক আগে স্কলারশিপ নিয়ে এখানে আসে। 
আর এখানে আসার পর ফেসবুকের কল্যাণে স্বপনের সাথে পরিচয় হয় ওর। 
স্বপন মফস্বলের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। 
ছোট বেলায় মা মারা গেলে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে যায়। 
আর স্বপন তার চাচার ঘরে মানুষ হতে থাকে। 
কিন্তু চাচার বড় সংসার আর সল্প আয়ের পরিবারে স্বপন অনেক অবহেলায়ই বড় হয়। 
নিজেকে সব সময় একাই ভাবতে থাকে সে। 
আর খুজে বেড়িয়েছে এমন কাউকে যাকে সে নিজের আপনজন বলে দাবী করতে পারে। 
আর অদৃষ্টের ইশারায় একদিন নিলয়ের সাথে পরিচয় হয় তার। 
আর অল্পদিনেই তাদের মাঝে খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়। 
পরে একসময় তাদের বন্ধুত্ব ভালবাসায় রূপ নেয়... তাদের ভালবাসা ফেসবুকের বেড়ী পেরিয়ে, ফোনালাপ, স্কাইপ ইত্যাদিতে গিয়ে পৌছায়। 

কিন্তু তাদের সম্পর্কের মাঝে যেন কালের বাধা হয়ে দাড়ায় তাদের দূরত্ব। 
আর এই বাধাটি ভাঙার উদ্যোগটা নিলয়ই নেয়। 
নেদারল্যান্ডের কিছু বন্ধুর সহায়তা নিয়ে একসময় সে স্বপনকে তার কাছে নিয়ে আসে। 
আর এখানে আসার পরেই দুজন সামনা সামনি দাড়িয়ে একে অপরকে নয়... তাদের অপার ভালবাসার সার্থকতাকে দেখছিল। 
অবশেষে স্বপন খুজে পেয়েছিল তার আপনজনকে। 
যাকে নিয়ে সারাটি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে সে। 
অপরদিকে নিলয়ও তার বহুকাল জিয়িয়ে রাখা ভালবাসাকে কারো নামে উৎসর্গ করার আনন্দে আত্বহারা। ভালই কাটছিল তাদের ভালবাসার ছোট্ট সংসার। 
কিছুদিনের মধ্যেই স্বপন একটা চাকরির যোগাড় করে ফেলল। 
আর তার পরে তাদের সংসার আরো একটু বেশি সমৃদ্ধ হল। 
সকাল বেলা দু’জোড়া ঠোটের উষ্ণ ছোয়ায় ঘুম থেকে ওঠা। 
আয়নার সামনে দাড়িয়ে দাত ব্রাশ করার সময় থুতনিতে গুঁতো দিয়ে একে অপরকে হাসানো। 
বাথটাবে দুজন দুজকে জড়িয়ে ধরে চুপটি করে মাথা ডুবিয়ে রাখা। 
সকালের নাস্তা একে অপরের হাতে খাওয়া। 
লাঞ্চ টাইম আলাদা আলাদা হওয়ায় একজন না খেয়ে বসে থেকে একসাথে খাওয়া শুরু করা। 
আর খাওয়ার পুরো সময়টুকু ফোনালাপে একে অপরের সাথে মগ্ন থাকা। 
কাজ শেষে বাসায় ফিরে স্বপনের রান্না করে নিলয়ের পথ চেয়ে থাকা। 
দুজনে এক চাদরের নিচে শুয়ে কাল হো না হো , ভীর জারা বার বার দেখা। 
তখন স্বপনের অশ্রুসজল চোখ দুটো মুছে দিয়ে তাতে আলতো করে চুমু খেতে কখনো ভুলেনি নিলয়। বিনিময়ে নিলয়ের বুকের দুর্বা ঘাসবনে নিজের মাথাটি গুজে দিতেও ভুল করেনি স্বপন। 
তার পর দুটি টগবগে যৌবনদীপ্ত মানবের সবটুকু ভালবাসার বিনিময়ের মধ্য দিয়ে একটি নতুন দিনের পথে এগিয়ে যাওয়া... এই ছিল ওদের দৈনন্দিন কার্যলিপি। 

আর তার পরেই ঘটনা চক্রে আমি তাদের ছুটির দিনের মেহমান হয়ে গেলাম। 
ভালই লাগত যখন ওরা দুজন তাদের ভালবাসার গল্প আমাকে শোনাত। 
মনে মনে ভাবতাম কতটা ভাগ্যবান হলে কারো জীবনে এমন সুখ থাকতে পারে। 
জীবনে অনেক সমপ্রেমীর জীবনে মিলনের সেতুবন্ধন হয়েছি আমি। 
কিন্তু কখনো কারো ভালবাসাকে এতটা কাছ থেকে দেখিনি। 
ওদের ভালবাসা দেখে নিজেকে ওদের মাঝেই পরিপূর্ণ মনে হত। 
আর এই লোভেই বার বার ছুটে যেতাম ওদের ভালবাসার দ্বারে। 
কখনো কখনো ওদের মাঝে ছোট ছোট কিছু বিষয় নিয়ে ঝগড়া হলে, আমাকেই বিচারক হিসেবে মানত তারা। 
আর সমাধানের পর ওদের মুখ দেখলে আমার নিজেরই সন্দেহ হত, আসলেই কি ওদের মাঝে ঝগড়া হয়েছিল!! 

সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল পানির স্রোতের মত। 
আর নিলয়-স্বপন ও ওদের ভালবাসার পানসি নায়ের দাড় টেনে যাচ্ছিল। 
হঠাৎ তাদের সামনে বিশাল এক ঘূর্ণিঝড় হয়ে দেখা দিল তাদের নিয়তি। 
তাদের স্বপ্নের ভবিষ্যতকে হতাশার কালো মেঘে ঢেকে দিয়ে পথ আগলে দাঁড়াল নিলয়ের শিকড়... তার মা বাবা। 
তারা নিলয়কে বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে লাগল। 
নিলয় তাদের একমাত্র সন্তান। 
তাই নিলয়কে দেশে ফিরে গিয়ে বিয়ে করে সংসারী হবার জন্য নানা ভাবে বল প্রয়োগ করতে লাগল তারা। প্রথমে কিছুদিন তাদের বাহানা বানিয়ে রাখলেও এক সময় তাদের জেদের সামনে নিলয়ের চেষ্টা দুর্বল হতে লাগল। 
আর এদিকে যেন বাগানের সেরা ফুল দুটি মলিন হয়ে যেতে লাগল। 
স্বপনের এতটা আপন বলতে যেহেতু কেউ নেই তাই সে কারো ধার ধারে না। 
নিলয়ের সাথে ইহজীবন কাটাতে সে সর্বাগ্রে প্রস্তুত। 
কিন্তু নিলয় তার মা বাবাকে ছাড়তে পারবে না। 
আর তাই সে পড়ল অনেক বড় এক দোটানায়। 
এক দিকে তার ভালবাসা... অন্য দিকে বাস্তবতা... সে কোনটাই হারাতে চায়না। 
কিন্তু সেকি আর হয় বটে... একটাকে পেতে হলে অন্যটাকে যে বিসর্জন দিতেই হবে। 
ওরা যখন ব্যাপারটা আমাকে জানাল, তখন আমিও বাকশূন্য হয়ে গেলাম। 
জানি এখানে বাকশূন্য হওয়া আমার সাজে না। 
কারন এমন অনেকের সমস্যার সমাধান আমি করেছি।
কিন্তু তাদের ব্যাপার টা অন্য রকম ছিল। 
কারন তাদের সমাজ ও সংস্কৃতি আমাদের চেয়ে অনেক অনেক আলাদা। 
তাই আমি এখানে কি জবাব দেব বুঝিনি। 
আমি হয়ত পারতাম তাদের সব কিছু উপেক্ষা করে ভালবাসার পক্ষে থাকতে। 
কিন্তু আমার বিবেক আমাকে বাধা দিচ্ছিল। 
কারন যতই হোক বাবা মায়ের অবজ্ঞা করার বুদ্ধি আমি কাউকে দিতে পারিনা। আবার এদিকে মা বাবার কথা মানতে বললে একটা নিস্পাপ ভালবাসাকে গলা টিপে হত্যা করা হবে। 
যা করতে আমার মন আমাকে বাধা দিচ্ছিল। 
আর এ নিয়ে আমার মন আর বিবেকের মধ্যেই দ্বন্দের সৃষ্টি হল। 
তাই মন আর বিবেকের মাঝে মধ্যস্ততা করতে আমারে নীরবই থাকতে হল... 

এভাবে কিছুদিন চলতে থাকল। 
এরই মধ্যে আমি দুটি নিস্পাপ ফুলের ঝড়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিলাম। 
আর এদিকে আমার নীরবতা নিলয় স্বপনকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিল আমার অপরাগতা। 
হঠাৎ একদিন ওরা আমাদের সংস্থার চেয়ারম্যান ডঃ ফেন্সিন হ্যানরিকের সাথে দেখা করতে চাইল। 
এ কথা শুনে আমার চোখ গুলো বড় বড় হয়ে গেল। 
মনে হল আমার শরীরে ১১০০ ভোল্টের বিদ্যুতের শক লাগল। 
ফেন্সিনকে আমার চেয়ে ভাল আর কে চেনে। 
সে এ পর্যন্ত অনেকেরই এমন সমস্যার সমাধান করেছে। 
কিন্তু তার দেয়া বুদ্ধিতে এ পর্যন্ত অনেকের সম্পর্ক টিকে গেলেও ধ্বংস হয়েছে অধিকাংশের জীবন। 
তাই আমি নিলয় ও স্বপনকে বার বার নিষেধ করলাম ফেন্সিনের সাথে দেখা করতে। 
কিন্তু তারা মানতে নারাজ। স্বপন নিলয়কে ছাড়া থাকতে পারবে না। 
আর নিলয় স্বপন ও তার পরিবার উভয়কেই চায়। 
যেহেতু তারা আমার কাছ থেকে কোন সহযোগিতা পাচ্ছিল না, তাই তাদের সামনে ফেন্সিন ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা। 
তারপরের আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম। 
কিন্তু হঠাৎ একদিন নিলয় ও স্বপন আমার অগোচরেরই গিয়ে হাজির হল ফেন্সিনের অফিসে। 
আর তারপর... যা হবার তাই হল... সব কিছু শোনার পর ফেন্সিন তাদের ভালবাসা ও পরিবার উভয়কে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য স্বপনকে Reassignment surgery (লিঙ্গান্তর) করার করার পরামর্শ দিল। 
এতে সে স্ত্রী হয়ে সারা জীবন নিলয়ের সাথে থাকতে পারবে। 
ফেন্সিনের রুমের ওই ২০মিনিট ওদের আরো বড় এক ভাবনায় ফেলে দিল। 
ফিরে এসে যখন ওরা আমাকে জানালো তখন আমি ওদের অনেক আকুতি মিনতি করে বুঝালাম। 
নিলয়ও ব্যাপারটাকে ঠিক মেনে নিতে পারছিল না। 
তাই সেও এতে তার অমতের কথা জানালো। 
তাই এখন সব কিছু স্বপনের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করল। 
কিন্তু স্বপন ফেন্সিনের অফিস থেকে আসার পর থেকেই কেমন জানি স্থবির হয়ে গেল। 
তার মুখ থেকে সে একটা শব্দও করছিল না। 
মনে হচ্ছিল সে অন্য কোন জগতে হারিয়ে গেছে। 
জানিনা সে আমাদের কথা শুনছিল কিনা। 

৩ দিন পর হঠাৎ সকাল বেলা নিলয়ের ফোন এল। 
সে আমার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের বাসায় যেতে বলল। 
বুঝতেই পারছিলাম বড় কোন দুঃসংবাদ শুনতে যাচ্ছি আমি। 
তড়িঘড়ি করে গিয়ে পৌছালাম ওদের বাসায়। গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার সারা শরীর জমে আসছিল। পাথর হয়ে যাচ্ছিলাম আমি। 
১০তলার উপরে ওদের ছোট্ট ঘরের বিশাল জানালায় দাড়িয়ে আছে স্বপন। 
তার থেকেও প্রায় ১০ গজ দূরে ঘরের মাঝখানে বোবার মত দাড়িয়ে আছে নিলয়। 
আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে অবুঝ শিশুর মত কাদতে লাগল নিলয়। 
ওকে একটু শান্ত করার পর জানতে পারলাম সকালে ঘুম ভাঙার পর স্বপন নিলয়কে জানায় সে লিঙ্গান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 
একথা শোনার পর নিলয় রাজি না হলে স্বপন পাগলের মত আচরন করতে থাকে। 
এক পর্যায়ে সে জানালার উপরে উঠে পড়ে এবং শর্ত দিয়ে দেয় তার লিঙ্গান্তর করায় রাজি না হলে বা তার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে সে এখান থেকে লাফ দিবে। 
অনেক বুঝানোর পরেও সে না মানলে নিলয় তার মা বাবাকে ত্যাগ করার কথা জানায়। 
কিন্তু তাতেও সে রাজি হয়নি। 
নিলয়কে শান্তনা দিয়ে আমি স্বপনকে বললাম, 
- স্বপন তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? তুমি জানো Sex Reassignment surgery কতটা ভয়ংকর?
- আমি আর কিছু জানতে চাইনা অলক ভাইয়া। হ্যাঁ আমি পাগল হয়ে গেছি। কারন আমি নিলয়কে ভালবাসি। আর কতটা ভয়ংকর? কি হবে? বড়জোর মৃত্যু... আর নিলয়কে ছেড়ে আমাকে প্রতিদিন হাজার বার মরতে হবে। তার চেয়ে বরং একবারেই মরা ভাল... আমি অপারেশন করবই...
-স্বপন তুমি বোঝার চেষ্টা কর। নিলয় তোমার জন্য তার পরিবারকে ছাড়তে রাজি হয়েছে। তাহলে আর কি সমস্যা রইল? 
-না ভাইয়া এ হতে পারেনা। মা বাবা ছাড়া বেচে থাকা যে কতটা কষ্টের তা আমার চেয়ে ভাল আর কে জানে। আর আমি চাইনা আমার জন্য আমার নিলয় সেই কষ্ট ভোগ করুক। তাই এটাই বেস্ট আইডিয়া। এতে আমাদের সবারই মঙ্গল। যদি অপারেশন সাকসেসফুল হয় তাহলে আমরা সারা জীবন সুখে বাস করব। আর যদি আমি মারা যাই তাহলে নিলয় তার মা বাবার ইচ্ছায় বিয়ে করে সবাইকে নিয়ে ভাল থাকবে। তাই আমাকে সার্জারী করাতেই হবে... 

আমি আবার নির্বাক হয়ে গেলাম। মুখ থেকে কথা বের হচ্ছিলনা। 
কি বা বলব, স্বপনের ভালবাসার গভীরতা আর আবেগের কাছে আমার সব যুক্তি ছোট হয়ে যাচ্ছিল...
আর এদিকে নিলয় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে অঝোরে কাদছিল... 
অবশেষে স্বপনের জেদ আর ভালবাসার কাছে আমাদের হার মানতেই হল। 
আমরা রাজি হলাম সার্জারীতে। 
তখন দুচোখের অশ্রুকে চিরে স্বপনের মুখের হাসিটা দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী জিনিসটাকে অর্জন করল। 
হ্যাঁ দামি ই তো। 
নিজের ভালবাসার চেয়ে দামী আর কি হতে পারে এ জগতে? 
কিছুদিনের মধ্যেই নেদারল্যান্ডের কিছু বড় বড় LGBT সংস্থার সহায়তায় স্বপনের Reassignment surgery’র প্রস্তুতি শেষ হল। 
অপারেশনের দিনও ঠিক হয়ে গেল। 
অপারেশনের আগের রাতে শেষ বারের মত নিলয় স্বপনকে তার নিজের রুপে কাছে পেল। 
এর পরে সে আর এ স্বপনকে দেখবে না। 
তখন তার ভালবাসার রাজকুমার স্বপন তার সামনে রাজকুমারীর রুপে আসবে। 
জানিনা ওই রাতটা তাদের কেমন কেটেছিল। আর জানতেও চাইনা। 
অপারেশন শুরু হবার আগ মুহূর্তে স্বপন শেষ বারের মত নিজেকে আপন রুপে দেখল। 
ছুয়ে দেখল নিজের প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। 
আর শেষ বারের মত বুকে টেনে নিল নিলয়কে। কান্নায় ভেঙ্গে পরছিল নিলয়। 
কিন্তু সেই তুলনায় স্বপনকে অনেকটা শক্তই মনে হচ্ছিল। 
আসলেই ভালবাসা কখনো কখনো মানুষকে এতটা শক্ত করে তুলে যা ধারনা করা যায়না... 

টানা ১৮ ঘণ্টা যাবত পর্যায়ক্রমে চলছিল অপারেশন। 
অপারেশনটি কয়েকটা ধাপে হচ্ছিল। 
আর প্রতিটা ধাপে তার শরীরের একেকটা অংশের সার্জারী করা হচ্ছিল। 
১৮ ঘণ্টা পরে যখন শুনলাম অপারেশন শেষ হয়েছে এবং স্বপন সুস্থ আছে তখন অনেকটা স্বস্তি পাচ্ছিলাম। কিন্তু ডাক্তারের নির্দেশ মোতাবেক ৭২ ঘণ্টার আগে আমরা কেউ স্বপনের সাথে দেখা করতে পারলাম না। এই ৭২ ঘণ্টা নিলয়কে দেখে আমার খুব আফসোস হচ্ছিল। 
আসলেই কি কেউ কাউকে এতটা ভালবাসতে পারে এ জগতে! 
সত্যি আমার জীবনে অনেক বড় একটা ইতিহাস তৈরি করে দিল এ যুগল... 
৭২ ঘণ্টা পরে যখন আমরা স্বপনকে দেখতে গেলাম তখন আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। 
এ কি দেখছি আমি। 
হাসপাতালের বেডে যেখানে স্বপনের থাকার কথা সেখানে শুয়ে আছে অপরুপ সুন্দরী এক যুবতী। 
যার সাথে স্বপনের কোন মিল খুজে পাচ্ছিলাম না আমি। 
একবার নিলয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাকে খুব স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। 
স্বাভাবিক ভাবেই সে স্বপনের পাশে গিয়ে বসল। 
যেন সে তার আগের স্বপনকেই দেখছে। 
আমি কিছুটা অবাক হলাম নিলয়ের আচরনে। 

সে স্বপনের পাশে বসে বলল, 
-এখন কেমন লাগছে স্বপন?
-আমি স্বপন না! স্বপন তো সেই কবেই মরে গেছে। আমি স্বপ্না। নিলয়ের হবু স্ত্রী। 
কথাটি শুনে আমি যেন বোকা বনে গেলাম। 
আমি কি এই দুনিয়ায় আছি? এ কি দেখছি আমি। 
স্বপন নামের সেই তরতাজা যুবকটির মুহূর্তের মধ্যে স্বপ্না হয়ে যাওয়া। 
যেন স্বপন নামের কেউ ছিলই না কখনো। 
আসলেই নিত্য নতুন প্রযুক্তির কত খেলাই না দেখা বাকি আছে আমাদের... 
স্বপন ওরফে স্বপ্নার পুরোপুরি সুস্থ হতে মাস দুয়েক সময় লাগল। 
আর এ সময়টা হাসপাতালে তার সেবায় নিজেকে পুরোপুরি ব্যস্ত করে রেখেছিল নিলয়। 

পরে যখন স্বপ্নাকে নিয়ে সে ঘরে ফিরল তখন তাকে দেখে আরো একবার অবাক হতে হল আমাকে। কোমর অব্দি লম্বা চুল। 
আর শারীরিক গঠনে এক পরিপুর্ন নারী। 
দেখে বোঝার উপায় নেই এই স্বপ্নাই কদিন আগে স্বপন ছিল... 
এদিকে নিলয় তার মা বাবাকে জানিয়ে দিল সে এখানে এক অনাথ বাঙালি মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করে ফেলেছে। 
তার মা বাবা এতে কোণ বিরোধিতা করলনা। 
তারা নিলয়কে বউ নিয়ে দেশে যেতে বলল। 
অতঃপর আমরা নিলয়-স্বপ্নাকে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শুভকামনার সাথে বিদায় জানালাম। 
ওরা চলে গেলেও আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হত। 
শুনলাম নিলয়ের মা বাবা স্বপ্নাকে অনেক ধুমধামের সাথেই বরন করে নিয়েছে। 
এবং দেশীয় নিয়মে তাদের বিয়ে করানো হয়েছে। 
খুব সুখে শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছে তারা। 
এসব শুনে নিজেকে অনেকটা হালকা মনে হচ্ছিল। 
মনে মনে ভাবালাম যাক শেষ পর্যন্ত আমার প্রিয় জুটির মধুর মিলন হয়েছে... 
ভেবে নিজে অনেক শান্তি পাচ্ছিলাম। 

নিলয় স্বপ্নার গল্পটা এখানেই শেষ হলে পারত। 
কিন্তু আমরা মানুষেরা নিজেদের গল্প যতই নিজেরা লেখার চেষ্টা করিনা কেন, বিধাতা তার লিখন অনেক অগেই লিখে রেখেছেন... 
নিলয় স্বপ্নার বিয়ের ১ বছর হয়ে গেছে... 
ইদানিং আমিও খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে গেছি তার কারনে অনেকদিন হল নিলয় আর স্বপ্নার খোজ নেওয়া হয়না। 
তাছাড়া কয়েক বছর হল দেশে যাইনা। 
তাই কিছু দিনের ছুটি নিয়ে দেশে গেলাম। 
নিলয়দের ঠিকানাটা জানা ছিল। 
তাই ওদের সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য না জানিয়েই ওদের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। 
আমাকে দেখে ওরা দুজনেই খুব খুশি হল। 
পরে ওদের পরিবারের সবার সাথে পরিচিত হলাম। 
তবে আমি বার বার স্বপ্নাকে দেখে খুব অবাক হচ্ছিলাম। 
যে মেয়েটি আজ এই পরিবারের সকল আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করে রেখেছে সারা পরিবারকে, এই কদিন আগেও তার পরিচয় একটি ছেলে হিসেবেই ছিল। 
আর এ সত্য আমরা ৩ টি মানুষ ছাড়া আর কেউ জানেনা। 
২দিন ওদের সাথে থাকার পরেই আমি কিছু জিনিস লক্ষ করলাম। 
নিলয় আর স্বপ্নার মাঝে একটা অভুতপূর্ন মানসিক পরিবর্তন আমার চোখে পড়ল। 
বুঝতে পারছিলাম এমন একটা কিছু আছে যা ওরা দুজনেই আমার কাছে ও পুরো দুনিয়ার কাছে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। 
কিন্তু কি সে ব্যাপার যা ওরা আমার কাছে গোপন রেখেছে! 
ভাল করে লক্ষ করার পর আমার সন্দেহ চরমে গিয়ে পৌছাল... 
তাই তাদের দুজনকে গোপনে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম। কি সেই গোপনীয়তা। 
শুরুতে এড়িয়ে যেতে চাইলেও পরে তারা মুখ খুলতে বাধ্য হল। 
আর যা শুনলাম তা বলার মত ভাষা আমার জানা নেই। 
তবে ওদের মুখের কিছু কথা যা না বলে পারছিনা। 
নিলয় বলল, -আমি সমকামী। 
কখনো কোন মেয়ের মাঝে সেই সৌন্দর্য আমি খুজে পাইনি যা আমি একটা ছেলের মাঝে পেয়েছি। 
আর আমার সারাজীবনের সবটুকু ভালবাসা দিয়েই ভালবেসেছি স্বপনকে। যে ছিল আমার সবকিছু। 
কিন্তু ঘটনাক্রমে যখন স্বপন স্বপ্না হয়ে গেল তখন সব মেনে নিয়েছি নিজের ভালবাসার টানে। 
ভেবেছি নিজের ভালবাসাকে বাচানোর আর কোন রাস্তা নেই। তাই করলাম। ভালই যাচ্ছিল। 
কিন্তু দিন দিন যখন আমার কাছে মানসিক ভাবে অনুভব হতে লাগল যে এ স্বপন নয়। 
এ স্বপ্না। 
সে একজন মেয়ে... 
এতে আমি ধীরে ধীরে ওর প্রতি আগ্রহ হারাতে থাকি। 
আর এখন আমি ওকে আর স্বপন ভাবতে পারিনা। 
আমার ভালবাসার মানুষ ভাবতে পারিনা। 
কি করব আমি এখন? অ
পরদিকে স্বপ্না বলল, -আমি বুঝতে শেখার পর থেকে এমন কাউকে কাছে পাইনি যাকে নিজের আপনজন বলে দাবী করতে পারি। 
জীবনের ২১ বছর একাকিত্বের বোঝা তানার পর আমি নিলয়কে পেলাম। 
ও আমাকে বুঝতে শিখিয়েছে ভালবাসা কি। 
আপনজনের ভালবাসা কি। 
মায়া মমতা কি। 
তাই আমার কাছে নিলয়ই আমার পৃথিবী। 
নিলয়ই আমার সব। 
তাই আমি আমার ভালবাসার পৃথিবীকে হারিয়ে আবার একা হয়ে চাইনি, আর চাইনি ওকেও ওর আপনজনের থেকে আলাদা করতে। 
তাই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি। 
কিন্তু আজ আমি আমার নিজের সিদ্ধান্তের কাছেই পরাজিত। 
নিজের ভুল সংশোধন করার কোন রাস্তা আমার নেই। 
আমি এখন কি করব??? 
ওদের এই প্রশ্ন দুটো আমাকে আবারো নির্বাক করা দিল। 
আমার মনে আবারো প্রশ্ন জেগে উঠল, আমি এখন কি জবাব দেব? 



জানি এই প্রশ্নেরও কোন জবাব আমার কাছে নেই। 
বাকহীন ভাবে সেখান থেকে চলে এলাম। 
আর নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলাম। 
যে আমি হাজারো মানুষের জীবনকে তাদের ভালবাসায় ভরিয়ে দিয়েছি। 
সেই আমি আজ আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ দুটির জন্য কিছু করতে পারলাম না। 
নিজের উপরে ঘৃনা জন্মে গেল। 
কাল আমার ফ্লাইট নেদারল্যান্ডে। 
কিন্তু আমি আর ফিরে যাবনা। 
ফিরে যাবনা আর ওই জীবনে যে জীবনে ভালবাসার মানে শুধু বর্তমান। 
নেই কোন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। 
একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেখানে কেড়ে নেয় সবকিছু। 
আমি চলে যাব অনেক দূরে। 
নিলয় আর স্বপ্নার থেকে অনেক দূরে। 
যেখানে গেলে ওদের শেষ পরিনতি আর দেখতে হবেনা আমাকে। 
আর দেখতে চাইও না। আমি সইতে পারব না। 
থাকুক ওরা আমার জন্যে আমার Unseen Future হয়ে...

শঙ্খ প্রেমের গল্প

সামনে বিস্তীর্ণ চারণভূমি। বর্ষার শেষে যা তিন গ্রামের আমিষের চাহিদা মেটায়। আবার ঋতুর বদলে কখনো ঈরির বলক, কখনো হলদেছেটা সরষে ক্ষেত, আবার কখনো উদোম বালকদের খেলার মাঠে রূপ নেয় এ ভূমি। আর এর সাথেই বিশাল এক টিলার মত হয়ে আছে শত বর্ষের পুরনো একটি গ্রাম। ছয় ঋতুর ছয়টি স্বাদ উপভোগের জন্য এর চেয়ে যোগ্য কোন স্থান খুজে পাওয়া মুশকিল। সময়টি নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে হলেও এখানে যেন ক্যালেন্ডার এখনো সেই সত্তরের দশকেই আটকে আছে। এখনো ট্যান্ডেস্টার টাইপের যন্ত্রের বিশেষ ব্যবহার দেখা যায় এখানে। এখনো বিয়ের দেন দরবারের তালিকায় সুউচ্চ স্থান করে নেয় একটি সোনালি রঙের সিকো ফাইভ ঘড়ি নয়ত একটি বাংলা সাইকেল। আর বেশি ধনবান হলে একটি ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশন...

এমনি এক থমকে থাকা গ্রামের দুরন্ত কিশোর আসাদ ও নুর। বয়েস আর কত ১১/১২ হবে। আর বুঝে উঠার পর থেকে এই পর্যন্ত দুজন আলাদা আলাদা ভাবে একটা রাতও কাটিয়েছে বলে মনে হয়না। সম্পর্কে দুজন মামাতো ফুপাত ভাই। নুরের মা ভালবেসে বিয়ে করে পাশের বাড়ির সেলিম মিয়াকে। আর তাই নানা বাড়ি আর দাদা বাড়ি বলতে কিছু নেই নুরের কাছে। সবই নিজের। আর আসাদের বাবারও বিয়েটা বোনের বিয়ের সমসময়েই হয়ছিল। আর দুই বাড়ির দুই প্রথম প্রদীপ হয়ে ছ’মাসের ব্যাবধানে জন্ম নেয় আসাদ ও নুর। তাই ছোট বেলা থেকেই দুই পরিবারের নয়নের মনি এই দুই মানিক জোড়। একসাথে বড় হওয়া, একসাথে কথা বলা, এক পাতে খাবার খাওয়া, একসাথে সাতার কাটা, এমনকি একসাথে সুন্নতে খৎনাও হয়েছিল দুজনের।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে দুজনের মাঝে বন্ধুত্বও জমে উঠেছিল সমান তালে। আর সাথে ছিল একে অন্যের জন্য অসম্ভব রকমের টান ও মায়া। নুর একটু বোকা টাইপের। খুব সরল। তেমন গুছিয়ে কথা বলতে পারে না। অপরদিকে আসাদ খুবই বুদ্ধিমান ও চতুর। কিন্তু সে কখনোই নুরকে কোথাও ছোট হতে দিত না। তাই বাড়ির সবাই বলত, “আমাগো নুর যদি মাইয়া অইত, তইলে ওরে আসাদের লগেই বিয়া দিতাম।” তখন মুখ ফুলিয়ে নুর বলত, “এহ আমার আর খাইয়া দাইয়া কাম নাই। ওরে বিয়া করি আর ও আমারে দিন রাইত খালি মারুক।” আসাদ তখন বিজ্ঞের ভঙ্গিতে বলত, “আরে গাঁদা তর দোষের লিগা তর গায় অন্য কেউ জানি হাত না দেয়, হেল্লেইগা আমিই তোর বিচার করি। ক্যান পরে আবার তরে বাওড়ের তোন মোরকফুল আইন্না দেই না!” আর বাড়ির সবাই তখন সার্কাস দেখার মত হাসতে থাকে।

মোরকফুল নুরের খুব প্রিয়। ও কারো উপরে যতই রেগে থাকুক না কেন। একটা তরতাজা মোরকফুলই ওর রাগ ভাঙ্গানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আসাদ ছাড়া আর কেউ যে ওর জন্য ফুল আনতে আধা মাইল হেটে হাঁটু কাদার বাঁওড় থেকে মোরকফুল আনবে না তা সে ভাল করেই জানে। আর তাই সে মাঝে মাঝে আসাদকে খাটানোর জন্য শুধু শুধু রাগের ভান করে থাকত। আর প্রিয় বন্ধুটির রাগ ভাঙ্গাতে আসাদ যখন আধা গায়ে কাদা মেখে ফুল নিয়ে আসত তখন নুর হো হো করে হাসত আর বলত, “তোরে ঢালী বাড়ির মাডি কাডা কেসসান গো মতন লাগতাছে।” আসাদের খুব রাগ হত তখন। মুখটা বাকা করে পুকুর ঘাটে যেতে যেতে বলত, “হ হ দেখমানে আমি যহন না থাকুম তহন কেডা তরে বাঁওড়ের তোন ফুল আইন্না দেয়।” কথাটা শুনে নুরের খুব খারাপ লাগত। কে জানে, হয়ত সে ভয় পেত। আসাদকে হারানোর ভয়। তাই পুকুর ঘাটে গিয়ে আসাদের হাঁটুতে পানি ঢালতে ঢালতে বলত, “কই যাবি তুই? তরে যাইতে দিলে তো। মাজায় দরি দিয়া বাইন্দা রাখুম তরে আমি।”

ছোট বেলা থেকেই আসাদ আর নুরের চলাফেরা দেখে গ্রামের সবাই অবাক হয়ে ভাবত এরা কি ভাই নাকি বন্ধু। নাকি দুটি দেহের মাঝেই একটি সত্তা। হিসেবটা মেলাতে পারতনা কেউ। হয়ত বর্তমান যুগ হলে অনেকেই এদের মধ্যকার সম্পর্কের নানা ব্যাখ্যা দিত। কিন্তু তখন কেউ এ নিয়ে ভাবত না। মানিক জোড় বলেই হেসে উড়িয়ে দিত। আর এভাবেই কেটে যাচ্ছিল আসাদ নুরের কিশোর কাল। 

নুর লেখাপড়ায় দুর্বল ছিল। দিনরাত ভ্যা ভ্যা করে পড়লেও স্কুলে স্যারেরা কিছু জিজ্ঞেস করলে হা করে তাকিয়ে থাকত। একদিন ক্লাসে স্যারের একটা প্রশ্নের উত্তর ভালভাবে না দিতে পারায় তাকে উত্তম মধ্যম পেতে হল। চোখের সামনে নুরকে শাস্তি পেতে দেখে আসাদের খুব কান্না পাচ্ছিল। নিউজপ্রিন্ট খাতা দিয়ে চোখ আড়াল করতে গেলে খাতাটার প্রথম পাতাটা ভিজে গেল। আর সহপাঠিরা তখন উচ্চস্বরে হেসে বলল, “দ্যাখ দ্যাখ বউ মাইর খায় আর জামাই বইয়া বইয়া কান্দে।” আত্বসম্মান বাচাতে চেপে গেল আসাদ। বাড়িতে এসে নুরের কি কান্না। আসাদ ওকে বুঝাতে গেলে আসাদকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল, “ছারে তোরে ভাল কয়। তরে মারে না। আর কিছু অইলেই খালি আমারে মারে। আর তুই চাইয়া চাইয়া খালি দেহছ। দেখবি না ক্যা আমারে মারলে তো তোর বালই লাগে। আবার অহনে আইছে কলা করতে।” এই বলে আবারো তার কলের গান চালু। আসাদ তাকে শান্ত করার চেস্টা করলেও সে মানতে নারাজ। পরে আসাদ লুঙ্গি পড়ে বাড়ি থেকে বের হতে গেলে নুর তার হাতটা টেনে ধরে বলে, “অইছে এই কালি হাঝের সময় আর ফুল আনতে বাঁওড়ে যাওন লাগব না। আমার রাগ ভাইঙ্গা গেছে।” বলেই দাত বের করে হেসে ফেলে। আসাদ তখন মুচকি হেসে বলে, “আল্লায় যে তরে কোন মাডি দিয়া বানাইছে কে জানে।”
-আমি জানি। আমারে বানাইছে বাইল্লা মাডি দিয়া, আর তরে বানাইছে আডাইল্লা মাডি দিয়া। হেল্লাইগা আমি খালি ছুইড্ডা ছুইড্ডা যাই আর তুই আবার আমারে একখানে কইরা জোড়া দেস...
ওর কথা শুনে আসাদ হো হো করে হেসে উঠে। স্যার পরের দিনের জন্য একটা বাড়ির কাজ করতে দিয়েছিল। বলেছিল যে বাড়ির কাজ করে না আনবে তাকে জোড়া বেত দিয়ে পেটানো হবে। কিন্তু নুরের মাথায় এই গুলা ঢুকেই না। পরীক্ষাও দেয় আসাদের খাতা দেখে দেখে। সে কয়েক বার চেস্টা করেও বাড়ির কজের অংক গুলা মেলাতে পারছিল না। পড়ে আসাদ ওর কাছ থেকে খাতাটা টেনে নিয়ে বাড়ির কাজ করে দিল। বলল, “গাধা ছারেরে আবার কইছ না অংক আমি কইরা দিছি তইলে তরেও খাওব ছারে আমারেও খাইব।” 
-অইল কমু না। তুই করছোত বাড়ির কাজ?
-হ আমি তোর আগেই কইরা বইয়া রইছি। আমি কি তোর মতন গাধা নাকি!
-তুই যতদিন আছোত ততদিন আমার গাধা অইতে সমেস্যা নাই।
-আর যেইদিন আমি থাকমু না?
-ধুর বলদ আসাদ যদি না থাকে তাইলে নুর আবার থাকে ক্যামনে। তুই আছোত আমি আছি। তুই নাই আমিও নাই। 
-হ দ্যাখমানে, বড় অইয়া বিয়া কইরা মাইজ্জা কাকার মতন খালি বউর পাছে পাছে ঘুরবা। তহন কি আর আসাদের কতা মনে থাকব!
-এহ! আমি তরে ছারা থাকতে পারুম না। বউরে কমু মার লগে বিতরের ঘরে ঘুমাইতে। আর আমি তর লগে ঘুমামু বারিন্দায়।
-তইলে তর বউ যদি গোসা কইরা বাপের বাড়ি যায়গা?
-গ্যালে যাউকগা। তাতে আমার কি! আমার তুই থাকলেই অইব। আর ভাল কতা, তুই তো আমার বড়, তর বিয়া আগে অইব। তাই তুই নিজের চিন্তা কর। তুই পারবি আমারে ছারা থাকতে?
-ক্যান তুই কি রুপবান আর আমি কি তোর রহিম নি যে তরে ছারা থাকতে পারুম না!
-হ হেইয়া দেহা যাইব সময়কালে। অহন ঘুমা কুপী নিভাইয়া।

আর সাধারন দিন গুলোর মতই দুজনে জড়িয়ে ধরে ঘুমাল। এ যেন তাদের এক অভ্যাসের মতই হয়ে গেছে। একে অন্যের গলা না ধরলে ঘুমাতেই পারে না। পরদিন ক্লাসে স্যার যখন সবাইকে বাড়ির কাজ বের করতে বলল, তখন সবাই তাদের খাতা সামনে এগিয়ে দিল। স্যার একে একে দেখতে দেখতে যখন নুরের খাতা দেখল তখন সে বলল, “কি রে নুরা, আইজকা ভাবছিলাম বেত দুইডা তর পিডে ভাঙ্গমু। আর হেই ডরে তুই দেহি সব অংকই কইরা আনছোছ।”
-হ ছার। কাইলকা মাইর খাইয়া শিক্ষা অইয়া গ্যাছে আমার।
-ঠিক কইরা ক, অংক তুই করছোত নাকি কেউ কইরা দিছে?
-না না ছার আমিই করছি। আর কে কইরা দিব।
মুচকি হেসে স্যার খাতা দেখা চালিয়ে গেলে। কিছুক্ষন পরে স্যার দেখলেন একটা খাতায় অংকের শুধু ২টি লাইন লেখা। আর কিছুই নেই। স্যারের চোখ দুটো হ্যাজাক লাইটের মত জ্বলে উঠল। খাতার উপরে লেখা নাম দেখেই হাক ছাড়লেন,
-আসাদ...
মাথা নিচু করে দাঁড়াল আসাদ। এদিকে নুরের চোখও ছানাবড়া হয়ে গেল। মন মনে ভাবল, আসাদ না কইল ও আমার আগে করছে অংক... মাথা নিচু করে স্যারের দিকে এগিয়ে গেল আসাদ। স্যার রাগান্বিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
-বাড়ির কাজ করস নাই ক্যান?
-ইয়ে... মানে... ছার... কাইল রাইতে মাথা ব্যাথা করতাছিল তাই ঘুমাই গেছিলাম। বাড়ির কাজ করতে পারি নাই।
-ও বুঝছি মাথা ব্যাথা ট্যাথা কিছু না। সব অইছে ফাকিবাজি।
এই বলেই স্যার আসাদকে বেত্রাঘাত করতে থাকলেন। ছোট্ট একটি শরীরের উপর আসাদ ডজন দুয়েক জোড়া বেতের আঘাত যে কতটা কস্টে সহ্য করছিল তা দেখে উপস্থিত প্রত্যেকেরই অন্তর কেপে উঠছিল। আর এদিকে নুরের কলিজা ছিড়ে যাচ্ছিল। আর কেউ না জানলেও সে জানে আজ আসাদের সব কষ্টের কারন সে। গতকাল সে মার খেয়েছিল, কিন্তু আসাদ খায়নি। তাই আসাদ আজ ওকে বাচিয়ে দিয়ে নিজে মুখ বুজে মার খাচ্ছে। শুধু নুরের সাথে সমান সমান করার জন্যে। আসাদ ওকে কতটা ভালবাসে তা আর বুঝতে একটুও বাকি ছিলনা নুরের। ডুকরে কেদে উঠল নুর। এদিকে হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল আসাদ। “আসাদ...” বলে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে গিয়ে আসাদকে ধরল নুর। স্যার বললেন “অইছে অহন আর ঢং করন লাগবনা। এর পরে যদি কেউ ঠিকমত বাড়ির কাজ করে তারে আরো দশ বেত বেশি মারা অইব।”

সেদিন আর ক্লাস করতে পারলনা আসাদ। খুব অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। তাই নুর ওকে নিয়ে স্কুল থেকে চলে এল। আসাদের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল তাই নুরের কাধে ভর দিয়ে হাঁটছিল। আর নুর এক হাতে চোখ মুছে আর অন্য হাতে আসাদকে ধরে বাড়িতে নিয়ে এল। পথে নুর বলল,
-তুই আমার লগে মিছা কতা কইছিল কেন?
ভাঙ্গা গলায় আসাদ বলল, -কই আমি মিছা কতা কইলাম!
-তুই না কইলি তুই বাড়ির কাজ করছোত।
-হ করছি তো। তর খাতায় করলাম না!
-তাই বইল্লা আমারে বাচাইতে তুই নিজে মাইর খাইলি কেন?
-কাইল ছারে তরে আমার সামনে মারছে দেইখা আমার খুব খারাপ লাগছে রে। অনেক কষ্ট অইছে। তাই আইজ ইচ্ছা কইরাই আমি বাড়ির কাজ করি নাই। এহন আমি মাইর খাইছি, তুইও খাইছোত, সমান সমান...

আসাদের শেষ কথাটির মর্ম তখন হয়ত দুজনের কেউই বুঝেনি। তখন সেখানে কোন বুদ্ধিজীবী উপস্থিত থাকলে হয়ত সেও একে নিছক বাচ্চাদের কথা বলে হেসে উঠত। কিন্তু কেউ কখন কল্পনাও করত না যে এদের এই বন্ধুত্ব, এই ত্যাগ শেষমেশ কথায় গিয়ে থামবে। আসলে থামবে বললে ভুল হবে। কোন সম্পর্কই কখনো থেমে যায় না। শুধু কাল আর ক্ষনভেদে সম্পর্কের রূপ ও নাম পরিবর্তন হয়। আর আসাদ নুর ও সেদিন বুঝেনি তাদের মধ্যকার সম্পর্কটা আসলে কি? শুধু জানত তারা এক জন অন্য জনকে ছাড়া একটা মুহুর্তও থাকতে পারে না। শুধু জানতে তারা এক অন্যকে খুশি করার জন্য যেকোন কিছু করতে প্রস্তুত। শুধু জানত নুরকে একমাত্র আসাদই পারে পুরোপুরি আগলে রাখতে। আর নুরের এক চিলতে আনন্দের হাসিই যথেস্ট আসাদের সব ব্যাথা ভুলিয়ে দিতে। কিন্তু এমন টা কেন হত, জানেনা তারা কেউই... কিন্তু এক সময় তারা জেনেছিল। হয়ত অনেকটা পরে... আবার হয়তবা এ সম্পর্কের মানে জানার সেটাই ছিল সঠিক সময়...

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মাধ্যমিক পরিক্ষায় পাশ করে দুজনেই। আর তাদেরকে ঢাকায় একটি সরকারি কলেজে ভর্তি করে দেয় আসাদের বাবা। কলেজের পাশেই একটি বাড়িতে ছোট্ট একটি রুম ভাড়া করে থাকে তারা। দুজনেই এখন টগবগে যৌবনদীপ্ত যুবক। এখনো তারা সেই আগের মতই এক সাথে ঘুমায়। একই খাটে। কিন্তু এখন আর আগের মত গলা ধরে ঘুমায় না। হয়ত এখন দুজনেই বুঝতে শিখেছে, তাই একটু ইতস্তত লাগে। কিন্তু এখনো দুজন দুজনকে আগের মতই দেখাশোনা করে। যেন দুজনের চাকরিই এটা, এক জন আরেক জনের দেখাশোনা করা আর পড়ালেখা করা। কিন্তু কখনো ভাবেনি যে আসলে তাদের মাঝে এত টান কেন? এত মায়া কেন? এর কারণটাও কখনো তারা জানত না যদি তাদের জীবনে শান্তা না আসত।

আসাদ দেখতে খুব সুন্দর ও স্মার্ট। আর সেই সুবাদেই এক সময় তার সাথে সম্পর্ক হয়ে যায় একই কলেজের ছাত্রী শান্তার সাথে। শান্তা বড়লোক ঘরের মেয়ে। তার সাথে প্রেম করার জন্য কলেজের হাজার ছেলে রাজি। কিন্তু এত জনের মাঝে শান্তা আসাদকেই কেন বেছে নিল? অন্য কাউকে কেন না... কে জানে এটাও হয়ত নিয়তির বিধান ছিল, তাকে তার গন্তব্যে পোছানোর রাস্তা দেখাতে...

শান্তার সাথে সম্পর্ক হবার পর থেকে আসাদ সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু শান্তাকে নিয়েই ভাবতে লাগল। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে লাগল। আর এদিকে আসাদ যখন নুরকে জানাল শান্তার কথা, নুরের বুকের মধ্যে কেমন যেন বিদ্যুৎ চমকে উঠল... আতকে উঠল সে... কেন জানি সে ততটা খুশি হতে পারলনা যতটা তার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কেন? তার ভাই ও সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটি তার ভালবাসার মানুষকে খুজে পেল, এতে তো তারই সবচেয়ে বেশী আনন্দিত হবার কথা। কিন্তু সে কেন চাইলেও খুশি হতে পারছেনা? কেন তার বুকের বামপাশটা অতি মাত্রায় কাপছে...? –এসব ভাবতে ভাবতে সেদিন আর ঘুমাতে পারলনা নুর। কিন্তু তার পরেও সে তার এই কেনর উত্তর খুজে পায়নি... 

দিন কয়েক পরে শান্তার সাথে যখন আসাদের প্রেম আরো জমে উঠল তখন আসাদ সব কিছু বাদ দিয়ে শান্তাকে নিয়েই সময় কাটাতে লাগল। ঠিক মত ঘরে থাকত না। ঠিক মত নুরের সাথে সময় কাটাত না। ঠিকমত ক্লাস করত না। প্রায়ই নুর ক্লাসের জানালা দিয়ে দেখত মাঠের কোনায় বসে আসাদ আর শান্তা চুটিয়ে গল্প করছে। আর এই দৃশ্য দেখে নুরের গাঁ জ্বালা করত। মুখ ঘুরিয়ে নিত অন্য দিকে। কিন্তু পরক্ষনেই আবার তাকিয়ে থাকত ওদের দিকে। কিন্তু বুঝতনা কেন তার এই দৃশ্য দেখতে অসহ্য লাগত। রাতে শুয়ে শুয়ে আসাদ যখন শান্তার গল্প বলত নুরের কাছে তখন নুরের মনে হত কেউ তার শত্রুর সুনাম করছে তার কাছে। কিন্তু কেন তার এমন মনে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে প্রতিদিনই ঘুম হারাম হয় নুরের।

এক শুক্রবার সকালে নুর বসে বসে পত্রিকা পড়ছিল। আসাদ তখনো ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ নুরের চোখ পড়ল একটা আর্টিকেলে। সেখানে পশ্চিমা কোন এক দেশের সমকামিতার বৈধতা দেয়ার প্রসঙ্গে অনেক কিছু ছিল। সাথে ছিল দুটি ছেলের ভালবাসার কথা। ছিল তাদের একে অন্যের প্রতি টান, মমতা ও ভালবাসার কথা। লেখাটি যেন কিছুটা নাড়া দিল নুরকে। সে চিন্তায় পড়ে গেল। ভাবল, “তাহলে আমি কি আসাদকে ভালবাসি? এই কারনেই কি আমি শান্তাকে মানতে পারিনা?” ভাবতে ভাবতে সে একবার আসাদের দিকে তাকাল। বিভোরে ঘুমোচ্ছে সে। আসাদের চেহারার দিকে তাকাতেই আজ কেমন যেন অন্যরকম লাগতে লাগল নুরের। মনে হচ্ছিল সে যেন তার নিজের প্রতিচ্ছবিকে দেখছে আসাদের মাঝে। কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ তার মুখ থেকে অস্পস্ট ভাবে বেরিয়ে এল, “আসাদ আমি তোকে ভালবাসি...”
ঘুমথেকে উঠে আসাদও পত্রিকায় লেখাটি পড়ল। আর হাসতে হাসতে বলল, “নুরা দেখছোছ পাগলগো কারবার? পোলায় পোলায় বলে ভালোবাসা হয়... হা হা হা।”
-এত অবাক হওয়ার কি হইছে? আমরাও তো একে অপরকে ভালবাসি তাইনা...? (তাচ্ছিল্যের সুরে বলল নুর)
-ধুরো! আমাগো ভালবাসা আলাদা...
-হ... আসলেই আলাদা... (এড়িয়ে গেল নুর)

এদিকে নুর যতই আসাদ কে নিয়ে ভেবে ভেবে নিজেকে দুর্বল করছিল, অন্যদিকে আসাদও শান্তার সাথে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর ওদের সম্পর্ক এত দূর গিয়ে গড়াল যে তারা একসাথে রাত্রি যাপন করা শুরু করল। একদিকে আসাদ শান্তার সাথে রাত কাটায়, আর একদিকে নুর সারা রাত আসাদের অপেক্ষায় থেকে চোখের জলে বুক ভাসায়... কিন্তু কয়েকটা রাত শান্তার সাথে কাটানোর পড়ে আসাদ একটা জিনিস লক্ষ করল। সে শান্তাকে যতই কাছে টেনে নিক না কেন, তার পরেও তার কাছে কেন জানি কিসের অভাব বোধ হয়। কেন জানি মনে হতে থাকে নুরের কথা। শান্তার পাশে শুয়ে বার বার মনে হয় নুর কি করছে? ও কি ঘুমিয়েছে? কেন জানি শান্তাকে জড়িয়ে ধরার পরেও, নুরকে জড়িয়ে ধরার মত তৃপ্তি পায় না। এভাবে কিছুদিন নিজের মাঝে কথাটি নিয়ে গবেষনা করার পর আসাদ দেখল নিজের অজান্তেই সে দিন দিন শান্তার থেকে দূরে চলে আসছে... আর এক সময় মনে হতে লাগল শান্তাকে সে মনে হয় পরিপুর্নভাবে ভালবাসেনি কখনো। হঠাৎ তার মনে পড়ল সেদিনের পত্রিকা আর নুরের কথা। -তাহলে কি আমি নুরকে ভালবাসি? আমি কি সমকামী?... -না না এ কিভাবে হয়। -তাহলে আমি কেন শান্তাকে কাছে পেয়েও নুরকে বেশি মিস করি? কেন আমি শান্তার চেয়েও নুরকে বেশি অনুভব করি? কেন আমি শান্তার পাশে শুয়েও নুরের অভাববোধ করি?

এভাবে নিজের মাঝে যুদ্ধ করতে করতে কলেজের মাঠে গিয়ে পৌছল আসাদ। আর সেখানে গিয়েই সে যে দৃশ্য দেখল তা দেখার জন্য সে আসলেই প্রস্তুত ছিলনা। শান্তা আরেকটি ছেলের পাশে বসে তার হাত ধরে বকুল তলায় বসে মহানন্দে গল্প করছে। ঘটনাটি দেখে আসাদ কিছুটা বিস্মিত হলেও রেগে উঠতে পারল না। যেন সে মেনে নিয়েছে সবকিছু। কিন্তু কেন? সাথে সাথে সেখান থেকে সরে গেল আসাদ। আর নিজের মনের কাছেই প্রশ্ন করতে লাগল, “শান্তা আমার সামনে অন্য একজনের সাথে প্রেম করছে। আর আমি তা এভাবেই মেনে নিয়ে চলে এলাম? কেন?” আর সে নিজের অজান্তেই তার মনের উত্তর শুনতে পেল, “কারন আমি নুরকে ভালবাসি, শান্তাকে নয়।”

এরপর আর কাল বিলম্ব করলনা আসাদ। ছুটে গেল নুরের কাছে। নুরের সামনে গিয়ে অপলক দৃস্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। যেন সে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর মুখটিকে দেখছে... যেন এই মুখের মাঝেই তার সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে... নুর জিজ্ঞেস করল, “কিরে এমনে চাইয়া আছোস ক্যান?” ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই আসাদ ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-আমারে মাফ কইরা দে নুর। আমি তোরে ভালবাসি। অনেক অনেক ভালবাসি।
আসাদের কথা শুনে নুর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলনা। ডুকরে কেদে উঠল। আসাদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
-আমি তো হেই কবের তে তোর পথ চাইয়া আছি। কবে তুই আমার হইয়া আইবি। 
নুরের কপালে চুমু খেয়ে আসাদ বলল, -অহন তো আইছি... আর যামু না তরে থুইয়া। অহন থেইকা তরে আরো অনেক অনেক বেশি ভালবাসুম। কিন্তু একটা কতা, অহন কিন্তু তরে আর মোরকফুল আইন্না দিতে পারুম না...
নুর হেসে বলল, -আমার মোরকফুল লাগব না। আমার তুই থাকলেই হইব। আর কিছুর দরকার নাই আমার... 





আর এভাবেই দুজনের মধ্যকার সম্পর্কের নাম খুজে পেল আসাদ নুর। এ কোন সমকামীর জুটির সম্পর্ক নয়। এ সম্পর্ক ভালবাসার সম্পর্ক। যতটা ভালবাসলে আপনজনকে আরো আপন করে পাওয়া যায়, সেই ভালবাসার গল্প। এ কোন সাধারন প্রেম নয়... এ প্রেম আর দশটি অসাধারন প্রেমের মতই পবিত্র... ভালবাসা কখনই অপবিত্র হয়না। কারন অপবিত্র হলে তা ভালবাসাই হয়না। আর যে ভালবাসা হয়ে থাকে পবিত্রতার প্রতিটি অংশের প্রমান, সেই ভালবাসাই হয়ে যায় গল্প, কাব্য, আর সাহিত্যের শঙ্খ প্রেমের গল্প... 

♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
অতি সল্প সময়ের মধ্যে লেখা এই গল্পটি... তাই লক্ষনীয় ভুল ত্রুটির জন্য সকলের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী...
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥

 
^ মাথায় ওঠ