blogger widgets

Monday, 24 February 2014

অনু গল্প-১: গর্বিত পিতা

মিসেস রহমান দুপুরের রান্না চড়িয়েছেন। চুলায় তরকারীর কড়ই। বলক দিচ্ছে। এমন সময় দরজা খোলার শব্দ হলো। তার স্কুল পড়ুয়া ছেলে বাড়ী ফিরে এসেছে। কিছুটা ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে সে তার রুমের দিকে গেলো। তার ছেলেটা এত চুপচাপ নয়। চেহারাটা তার যেমন নজর কাড়া মনটাও সরল। স্কুলে যা হয় সব বাবা-মা কে খুলে বলে। মিসেস রহমান ছেলের রুমে গেলেন। ছেলে গোসল খানায় ঢুকেছে। বেশ সময় নিয়ে সে গোসল করল। বেরোনোর পর তিনি ছেলেকে ধরলেন। ছেলে কিছুই বলে না। অনেক পীড়াপীড়ির পর ছেলে মুখ খুলল, “আজ আমি আমার স্কুলের ইংলিশ শিক্ষকের সাথে সেক্স করেছি”। কি বলে ছেলে। এই বয়সেই সেক্স করা শুরু করেছে ছেলে। তিনি মুখ ভার করে বেরিয়ে গেলেন।



সন্ধ্যায় মি. রহমান অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন। স্ত্রী তার কাছে একসময় অনুযোগ করে বললেন, দ্যাখো তোমার ছেলের কান্ড, এই বয়সে সে ইংলিশ টিচারের সাথে সেক্স করে বাসায় আসছে। তুমি ছেলেকে আচ্ছা করে শাসন করে দাও। রহমান সাহেব হু বলে ছেলের রুমের দিকে পা বাড়ালেন। মি. রহমান শুভ্র প্রগতিশীল আধুনিক যুগের মানুষ। সেক্সটাকে ইনি সহজভাবেই নেন। নর-নারী যে সেক্স করবে এটাই তো স্বাভাবিক বিষয়। এটা নিয়ে যত আইন-নিয়ম-শাস্ত্র তৈরী করা হবে তত মানুষের মাঝে আইন ভাঙার প্রবনতা তৈরী হবে


বাবাকে দেখে ছেলে কিছুটা লজ্জা পেলো। রহমান সাহেব ছেলের পিঠ চাপড়ে দিলেন। সাব্বাশ! বাপের বেটা। আজ থেকে তুমি আর বালক নও, তুমি একজন পুরুষ হয়ে গেছো। আমি অনেক আনন্দিত। এই খুশীতে আমি আগামীকাল তোমাকে একটা বাই সাইকেল গিফট করব। ছেলে বাবার কথায় সাহস ফিরে পেয়ে বলল, “বাবা, তুমি আমাকে একটা ফুটবল কিনে দাও। পাছার ব্যাথায় আমি তো সাইকেল চালাতে পারবোনা।”  রহমান শুভ্র কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। 

চরিত্রহীন

আজ সকালে যখন হাঁটছিলাম, একবুড়ো নিজে থেকে এসে পরিচিত হলো। কথা বলতে বলতে যৌনাঙ্গ ছুঁয়ে দিলো, তারপর যখন দেখলো আমি কোন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি না, স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেশ দেয়ার ছলে অনেকক্ষণ ধরে ধন টিপলো। হাহাহাহা। আমি বাধা দিই নি। কেন দিই নি? আমার মুখে শক্ত কথা আসে না বলে? আমি লোককে মুখের উপর অপমান করতে পারি না বলে? না কি আমি বুঝতেই পারি নি যে পিতামহের বয়েসী কোন লোক এই কাজ করতে পারে?উপরের কারণগুলোর প্রত্যেকটাই হতো অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে সত্যি হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস করো, এ ক্ষেত্রে , এর কোনটাই সত্যি না। লোকটা প্রথমে যখন আমার হাত ধরলো, তখনই আমার বিরক্তি লেগেছিলো, এবং সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু কথা হলো, সন্দেহ তো রাস্তা-ঘাটে, আশে-পাশে কতজনকেই করে বসি। তার কতগুলো সত্যি হয়?কিন্তু লোকটা প্রথমবার যখন আলতো করে যৌনাঙ্গে হাত বুলালো, আমার আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিলো না, তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে।



তারপরও আমি বাধা দিই নি। কেন দিই নি? নাহ, আমি নরম-সরম বলে না, আসলে আমার ভালো লাগছিলো। না, কোন যুক্তি দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করবো না। যা নিখাঁদ সত্যি, তাই বলবো। যতবার দাড়িওয়ালা বুড়ো লোকটা, যার দাঁতগুলো ছিলো হলদে, ময়লা; আমার পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করছিলো, ততবারই আমি উত্তেজিত হয়ে উঠছিলাম। লোকটা কি খুব আবেদনময় ছিলো? নাহ, একদমই না।

তাহলে কেন উত্তেজিত হচ্ছিলাম? জানি নাহ। যৌন-অভিজ্ঞতা আমার নিদারুণ অল্প বলেই হয়তো। তার প্রত্যেকটা কথা শুনেই আমি বুঝতে পারছিলাম, হি ইজ আ চিট। তারপরও, আমি বারবার চাইছিলাম, যেন সে বারবার আমার লিঙ্গ ঘষতে থাকে। আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো, আমার শুধুমাত্র তখনই খারাপ লাগছিলো, যখন খেয়াল করেছি আশেপাশে কেউ হেঁটে যাচ্ছে।
কিন্তু এখন আবার খারাপ লাগছে। কেন লাগছে? বুঝতে পেরেও কেন লোকটাকে যৌনাঙ্গ ঘষতে দিলাম, কেন বাধা দিলাম না - সে জন্য?

না কি মুখ ফুটে না করতে পারলাম না, বা বাধা দিতে পারলাম না - সে কারণে? আসলে বাধা দিতে তো আমার ইচ্ছেই হয় নি। ইচ্ছে হয় নি অপমান করতেও। ঐ যে বললাম না, আমি উপভোগ করছিলাম ঐ স্পর্শ; যদিও সেটা কোন এক পাকাদাড়িওয়ালা বুড়োর হাত ছিলো। ছিলো, তো? হাত তো ছিলো? বিষমকামীদের ইংরেজিতে স্ট্রেইট বলে। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় "সোজা"। তাহলে আমার যৌনতা কি বাঁকা? হবে হয়তো বা। হোক না। যাই হোক নাই হোক, আমি তো আমিই, না? সবাই ঘৃণা করলেও তো আমি নিজেকে অত ঘৃণা করতে পারি না। সে যাই হোক, খারাপ লাগছিলো কেন? বাবা-মা জানতে পারলে কষ্ট পাবে বলে? বন্ধুরা-আত্মীয়রা শুনতে পেলে ছি ছি করবে বলে? বাবা-মা কখনোই এটা জানতে পারবে না, একটি নির্জন ভোরবেলায় আমার একান্ত ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমি না বললে বাবা-মা, বন্ধু বা আত্মীয়, কারো সাধ্য নেই জানার, শোনার। আমি খুব ভালোমতোই জানি সেটা। তারপরও, প্রতিটিবার, যখনই আমি কোনরকম যৌন অভিজ্ঞতার কাছাকাছি যাই, আমার মনে একটা কথাই আসে, "বাবা-মা জানতে পারলে খুব কষ্ট পাবে।" 

পর্ণ দেখার সময় কি কখনো এমন হয়? নাহ, একদমই না। কেন?কারণ আমার সমবয়সী অসংখ্য বন্ধু এটা নিয়ে এত কথা বলে, এত অসংখ্যবার এ প্রসঙ্গের উত্থাপন ঘটে যে, এটা আর অস্বাভাবিক বা অন্যায় বলে মনে হয় না। হয়তো বা প্রথম প্রথম পর্ণ দেখা নিয়েও এমনই পাপানুভূতি হতো।ছেলেদের প্রেমে পড়া নিয়েও একই অনুভূতি হয়?না তো, আসলে বুঝতে পারার অনেক আগে থেকেই ছেলেদের প্রেমে পড়ে আসছি, কখনো মাথায় ঐ ভাবনা আসার সুযোগই পায় নি এ ব্যাপারে।তার মানে দাঁড়ালো, ছেলেদের প্রেমে পড়া, তাদের নিয়ে যৌন কল্পনা করাটাও অভ্যস্ততায় পরিণত হইয়ে গেছে বলে ও নিয়ে আর কোন পাপবোধ নেই।তাহলে কি একদিন রাস্তাঘাটে যাকে-তাকে দিয়ে ধন টেপানো, যার-তার সাথে শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় চলে যাওয়াটাও ডাল-ভাত মনে হবে? অভ্যেস হয়ে গেলে হয়তো হবে। কিন্তু আমি তো সেটা চাই না, আমার প্রচন্ড খারাপ লাগে এমন ভাবতে। অথচ তসলিমা নাসরিনের যৌন স্বাধীনতা বিষয়ক লেখাগুলো, হুমায়ুন আজাদের বা সুনীলের অবাধ যৌনতা বিষয়ক গল্পগুলো, কিংবা অবাধ যৌনতার সিনেমাগুলো - কোনটাই আমার কাছে খুব বেশি খারাপ বা অবাস্তব বলে মনে হয় নি। বরং খুব স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছিলাম, এবং এটাও স্বীকার করে নিয়েছিলাম যে সতীত্বের বা সততার নাম করে নিজেকে অতৃপ্ত রাখাটা পুরোপুরি ভন্ডামী।কিন্তু নিজের বেলায় এমন হচ্ছে কেন? কেন অযৌন জীবন-যাপনকেই বেশি সম্মানজনক, বেশি 'শুদ্ধ' বলে মনে হচ্ছে?

পীরিতির সাতকাহন

কখনো তো গুছিয়ে হিসেব করে দেখি নি, এ জীবনে কত অসংখ্য সুদর্শন, সুপুরুষকে দেখে মুগ্ধতায়-বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি, কত দিনের পর দিন রাতের পর রাত তাদের নিয়ে স্বপ্নে হারিয়েছি, কল্পনার নকশীকাঁথা বুনেছি সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে। সেই ছোটবেলা থেকেই আমার প্রেমে পড়া শুরু। যতদূর মনে পরে, আমার আট-ন’বছর বয়েসে বলিউড নায়ক ঋত্বিক রোশানকে দেখেই আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছিলাম। “এত সুন্দর মানুষ হয় কি করে!!!”- সারাদিন  শুধু ওকেই ভাবতাম, আর একটু সুযোগ পেলেই ওকে দেখতাম। ওসব অনেককাল আগের কথা। ওসব গল্প বাদ থাকুক। আজকে বরং বড়বেলার গল্প বলি। কৈশোরের-যৌবনের, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্প। 

গল্পের শুরু অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কিছুদিন আগে থেকেই। উচ্চমাধ্যমিকের পর, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যখন কোচিং করা শুরু করি তখনই প্রথম মনে হলো, “কোচিংযের ভাইয়াগুলো কি অসম্ভব সুন্দর! শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে!” খুব বেশি ভাইয়াকে তো চিনতাম না, তবে কয়েকজন ছিলো যাদের দিকে ক্লাসের পুরোটা সময় হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। তবে তখনো তো আর জানতাম না, আমার জন্য সোনার খনি অপেক্ষা করছে। কপালচক্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর হল-এ উঠে প্রথম যাকে রুমমেট হিসেবে পাই, তিনি আমার চেয়ে বছর চারেক-এর বড় ছিলেন। কি অসম্ভব সুন্দর মানুষ বলে মনে হয়েছিলো তখন তাকে! সুঠামদেহী, গৌরবর্ণ, কোঁকড়ানো চুলের চব্বিশ-পঁচিশ বয়েসের যুবক আমাকে মুগ্ধ করেছিলেন তার সবটুকো অস্তিত্ব দিয়ে। কপালদোষে বেশিদিন ঐ রুমমেটকে কাছে পাই নি, অন্য রুমে চলে গেছিলাম র‌্যাগ খাওয়ার ভয়ে। র‌্যাগ অবশ্য তিনি দিতেন না, দিতো ঐরুমের আশেপাশে থাকা বদগুলো। তিনি বরং আমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলেন। তারপরও রাস্তায় দেখা হলেই মিষ্টি হেসে কুশল বিনিময় করতেন, খোঁজ নিতেন পড়াশোনার। আমিও মিষ্টি হেসে “ভাইয়া, ভাইয়া” ডাকের তুফান ছুটাতাম। তিনি তো আর জানতেন না, আমার মনে কি আছে! 



যাই হোক, একজন গেলো তাতে কি, চারপাশে খানিক চোখ বুলিয়ে, মন খেলিয়ে আমি দেখলাম , এ তো পুরোই স্বর্গরাজ্য!!! এমন অসম্ভব সুন্দর চেহারাধারী, ব্যাক্তিত্ববান সব পুরুষকুল আমার ঘরের আশেপাশে বসত গেড়েছে। নতুন রুমের তিন বছরের সিনিয়রটিও ছিলেন একেবারে দেবদুর্লভ কান্তিধারী! ইনিও বেশ লম্বা, খাঁড়া নাক, মিষ্টি হাসি, স্বল্পভাষী। খুব খাতির জমাতে চেষ্টা করেছিলাম সেই পাশের বিছানায় শোওয়া সুদর্শনের সাথে। জমেও গেছিলো। কিন্তু ব্যাটা ডেস্টিনির সদস্য, আমাকে খালি পয়সার গল্প শুনাতো। বুঝতে পেরেছিলাম আমাকেও দলে টানতে চাইছে, কিন্তু মুখ ফুটে কখনো বলে নি। তাছাড়া আমার এত পছন্দের যুবাপুরুষটি একদিন কথায় কথায় আমাকে ‘হাফ-লেডিস” ডেকে বসে। খুব খেপে কথা বলা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলাম। করবো নাই বা কেন? মানলাম আমি মেয়েলি, মানলাম লোকে হাফলেডিস বলে খেপায়। তাই বলে এ ও? প্রেম ছুটে গেলো অল্পতেই। আসলে তো আর অত সহজে ছুটে না। কথা না হয় বেশি বলতাম না, কিন্তু মন তো ঠিকই পোড়াতো। একদিন তার কোন একটা  গল্পের বইয়ে একটা মেয়ের নাম দেখে কেমন যেনো বুক চিনচিন করে উঠেছিলো। যেনো সে শুধুই আমার সম্পত্তি, অন্য কারো নাম তার অস্তিত্বের কোথাও থাকবে না। আমার আবার চিরায়ত বঙ্গরমণীদের মতো বদস্বভাব, বুক ফাঁটে তবু মুখ ফুটে না। তাই আর কখনোই খুব বেশি কথা বলি নি ভাইয়ার সাথে, বরং আশেপাশের অন্য ফুটন্ত যৌবনধারীর দিকে নজ্র বুলাতে ব্যাস্ত ছিলাম। ওহ!! বাথরুমের পাশের রুমগুলো ছিলো HOT ভাইয়াদের আখড়া। একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখেছি, HOT ছেলেরা পরস্পরের বন্ধু হয়। হয়তো আলাদাভাবে দু’টো বা তিনটে ছেলেকে আমি পছন্দ করে রেখেছি, তাদেরকে আমি আলাদা আলাদা জায়গায় দেখে চিনেছি, হয়তো বা অন্য হল-এ, কিংবা ক্যাম্পাসে, বা ক্যান্টিনে। কিন্তু হায় ভগবান! একদিন হঠাৎ দেখি ওগুলো একসাথে হেসে বেড়াচ্ছে বা হেঁটে বেড়াচ্ছে, পরে জানতে পারি ওরা জিগরি দোস্ত। এমন অভিজ্ঞতা অনেক হয়েছে। এই যেমন এখন, বেশ কয়েকটা কিউটি কিউটি, হটি-নটি সুপুরুষ জুনিয়র ছেলেকে আমার পছন্দ। ওমা ! একদিন দেখি কি , ওগুলো সব একই ব্যাচের, এবং যথারীতি ভালো বন্ধু। 

মাঝে মাঝে ভাবি, যদি কখনো কোন ছেলের সাথে আমার প্রেম হয়, তাহলে তার বন্ধুদের দেখেও কি আমি মজে যাবো!! তওবা! তওবা!! কিন্তু হয়ে গেলে আমিই বা কি করতে পারবো? আমিও তো একটা মানুষ, না কি? হাহ, এমন সোনাবাঁধানো কপাল নিয়ে কি আর আমি জন্মেছি? আমার দেখে দেখেই জীবন পার করতে হবে। যাক গে ওসব। আরো কতো ব্যাচমেট, সিনিয়র, জুনিয়রের প্রেমে যে মজেছি, লিখতে গেলে মহাকাব্য না হোক, মহাগপপো হয়ে যাবে। হাসিব ভাইয়া, বিত্ত ভাইয়া, রৌপ্য ভাইয়া, রাকিব স্যার, আরো কত!! সবার নামধামও তো জানি না। ইশশ!! কি সুন্দর সব মানুষগুলো! রাকিব স্যারকে দেখলেই তো আমার ঝাঁপিয়ে পড়ে গালে, কপালে, নাকে ঠোঁটে পাগলের মতো চুমু খেতে ইচ্ছে করে। কি যে কষ্ট হয় স্যার-এর ক্লাসে!! স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বুঝবো কি, স্যারের পাতলা ঠোঁটের আধো হসিমাখা নিরীহ-শান্ত চেহারাটা দেখে উথালি-পাথালি কল্পনায় হারিয়ে গিয়েই পুরো একটা ঘন্টা কেটে যায়। এক ঘন্টায় কি সব শেষ হয়ে যায় না কি? স্যারকে নিয়ে মনে মনে কতো দিন সুখের সংসার পেতেছি, হানিমুনে গেছি এখানে-ওখানে, স্যার খুব আদর করে পড়া বুঝিয়ে দিয়েছে। 

আহ! প্রিয় সুখ-কল্পনারা! কখনো কি তোমাদের বাস্তবে আসতে নেই? তাসনীম ভাইয়া বা রৌপ্য ভাইয়া দু’জনের ক্ষেত্রেই প্রেমে মজেছিলাম তাদের প্রেমিকা আছে একথা জানার পড়েও। পড়তে দোষটাই বা কি? প্রেমিকা না থাকলেই কি তারা আমার সাথে উদ্দাম প্রেম শুরু করতেন না কি? তা কি এ জন্মে সম্ভব! কি বিষণ্ণ-মিষ্টি চেহারা ছিলো তাদের! আসলেই কি বিষন্ন ছিলো? কি জানি। আমি ভেবে নিতাম, ওরা এই প্রেমে সুখী নয়, খুব কষ্টে আছে। শুধুমাত্র আমার ভালোবাসাই পারে ওদের সব দুঃখ মুছে দিতে। হাসি পাচ্ছে এসব কথা শুনে? পেলে পাক। কল্পনা!! কি ভীষণ সুখের সব কল্পনা!! গোটা জীবনটাই কাটিয়ে দিলাম কল্পনায় ডুবে থেকে। আরো কতো অসংখ্যা প্রেমকল্পনা ছিলো আমার। অনেকগুলো তো ভুলেও গেছি। আজকে এই পর্যন্তই থাক, আরেকদিন বাকি সব বলবো।

তোমায় ছুঁয়ে দেখবো বলে- প্রথম অধ্যায়

আমি শোভন। থাকি মিরপুরের মধ্য পাইকপাড়া নিজেদের একতলা বাড়ীতে আমার পরিবারের সাথে। পরিবারে আমি, আমার মা, বাবা, বড় ভাইয়া, সুইট ভাবি আর আমার নটি কিউটি ভাইপো। অনেক বড় ফ্ল্যাটে আমাদের সুখী পরিবার। আমাদের ভাড়াটিয়া হিসেবে পাশের ২ টি ফ্ল্যাটে থাকে আরো দুটি পরিবার। মাজহার আঙ্কেলের পরিবার আর একটি আদিবাসী গারো পরিবার সাংমা আঙ্কেলের পরিবার । আমাদের খুব ভালো প্রতিবেশী ওরা। দেখতে মন্দ ছিলাম না বলে জীবনে মেয়েদের কাছ থেকে কম প্রপোজ পাইনি জীবনে। সেই স্কুল লাইফ থেকেই। 

কিন্তু ছেলেবেলা থেকে আমার মেয়েদের তেমন ভালো লাগতো না। তাই মেয়েরা খুব একটা সুবিধে পায় নি। আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ফাইনান্স এ বিবিএ করছি। অনেক স্বপ্ন নিজেকে নিয়ে। নিজের ক্যারিয়ার গুছাবো, বাইরে গিয়ে এমবিএ করবো, কখনো সুযোগ পেলে ডক্টরেট করবো আমার বিষয় নিয়ে। খুব একা লাগতো নিজেকে। আমার যে ছেলেদেরকে ভালো লাগতো এই কথাটা কাউকে কখনো বলার সুযোগ পাইনি। ছিলও না কেউ তেমন। তবে ছেলেবেলায় আমার এক স্কুল বন্ধু ছিল, তার নাম মিশু। আজ তোমাদেরকে মিশুর কথা শুনাবো-ক্লাস এইটে উঠার পর আমার বাবা একটা জেলা শহরে বদলি হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও চলে গেলাম। নতুন স্কুলে ট্রান্সফার হয়ে গেলাম। আর সেখানেই আমার সাথে পরিচয় হয় মিশুর। স্কুলে এতো এতো ছেলের থেকে মিশু ছিল সবার থেকে আলাদা। মেয়েলি আচরনের কারনে তার সাথে কেউ সহজে মিশত না। কিন্তু তাঁকে আমার খুব ভালো লাগত। যখন ক্লাসের ছেলেরা তাঁকে হাফ লেডিস বলে খেপাতো তখন সে খুব ভেঙ্গে পরতো, মাথা নিচু করে কাঁদতো। 


ক্লাসের একদম লাস্ট বেঞ্চে বসতো সে সবসময়। আর সেই লাস্ট বেঞ্চে বসতো খুব দুষ্টু দুষ্টু ছেলেরা। তারা বইয়ের মাঝে লুকিয়ে মেয়েদের নগ্ন নগ্ন ছবি আনত আর ক্লাস চলাকালীন সময়ে বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে এসব ছবি দেখতো ৫-৬ জন করে। শার্টের উপরের বোতাম খুলে বুক দেখাতো আর এমন ভাব করতো যে তারা বড় কোন পুরুষ মানুষ হয়ে গেছে। টিফিন টাইমে স্কুলের দেয়াল টপকে তারা ধরাতো টপ টেন সিগারেট আর শার্টের কলার উঁচু করে রাখত। মিশুকে এই ৫-৬ তা ছেলে খুব জালাতো। কখনো তার বুকে টিপ দিতো, গালে টিপ দিত , কখনো পাছায় টিপ দিত একা পেলে। আর এটা দেখে ক্লাসের বাকি ছেলেরা হেসে দিত। আমি সবসময় মিশুকে প্রটেক্ট করার চেষ্টা করতাম। ক্লাসের ছেলেদের সাথে মারামারিও করেছি কখনো সখনো শুধু ওর জন্য। স্কুল শেষে আমি আর মিশু মাঝে মাঝে আমাদের স্কুলের কাছের এক পরিত্যাক্ত জমিদার বাড়িতে চলে যেতাম । সে আমার বুকে মুখ লুকিয়ে বোবার মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। আমি আদর করে ওর চোখের জল মুছে দিতাম। তারপর ওকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ থাকতাম। ওকে নানা কথা বলে হাসানোর চেষ্টা করতাম আর হাসাতাম। ওর হাসি দেখে আমার বুকটা ধুক ধুক করতো। ইচ্ছে করতো ওকে একটু ছুঁয়ে দেখি। একটু চুমু দেই। কিন্তু কখনো সাহস পাইনি । যদি সে কখনো আমাকে অন্য ছেলেদের মত খারাপ ভাবে? যদি আমাদের এই নিখাদ বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে যায় এ ভয়ে । ওর মুখটা দেখলে অনেক মায়া লাগতো। এতো মায়াভরা চেহারা, কেউ যদি মনোযোগ দিয়ে একবার তাকাতো হয়তো তার মনের কষ্টটা বুঝতে পারতো। তাঁকে কখনো বলার সুজোগ পাইনি যে আমি তাঁকে ভালবাসি। ভালবাসা কি সেটা কখনো ভালো করে বুঝিনি, আর তখন তো ভালবাসা কাকে বলে সেটা বুঝতামই না। শুধু এইটুকু বুঝতাম যে ওকে একদিন ক্লাসে না দেখলে আমার ভালো লাগতো না, ওর সাথে টিফিন টাইমে সিঙ্গারা সমচা না খেলে ভালো লাগত না। ওর মুখ না দেখলে কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগতো ভেতরটা।


 খুব শরীর খারাপ না থাকলে ও সহজে ক্লাস মিস দিত না। পিছনের বেঞ্চে বসলেও স্যারদের পড়া খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম আর ওকে বুঝাতাম। ওকে শুধু একটা কথাই বলতাম “সব কিছু ভুলে ভালো করে পড়াশোনা কর। আমি তো আছিই তোর পাশে”। ও আমার কথা শুনে মিটমিট করে হাসতো।আর আমি ওকে অপলক দৃষ্টিতে ওর ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ইচ্ছে করত ওকে জাপটে ধরে ওর ঠোঁটে চুমু দেই। ও ক্লাসে আসতো শুধু আমার জন্য। লাস্ট বেঞ্চে আমি ওকে কিনারায় বসিয়ে পাশে আমি বসতাম । কাউকে ওর পাশে ঘেষতে দিতাম না। সবার আগে আমি ক্লাসে চলে যেতাম আর বসতাম সেই লাস্ট বেঞ্চে আর কিনারের সিটটা ওর জন্যে রেখে দিতাম। এভাবেই চলছিল মিশু আর আমার কামহীন প্রেম। আর কিছুদিন পরেই আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা। আমরা তার পরেই ক্লাস নাইনে উঠে যাব। তাই খুব মনোযোগ দিয়ে আমি আর মিশু পড়াশোনা করতে লাগলাম। আমার প্রথম আর দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় ফলাফল খুব একটা খারাপ হয়নি। প্রথম সাময়িকে নবম স্থান অধিকার করেছিলাম আর দ্বিতীয় সাময়িকে একাদশ। যেভাবেই হোক আমাকে এক থেকে দশের মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু চিন্তা ছিল শুধু মিশুকে নিয়ে। জেলা শহরের সেরা স্কুল ছিল বলে এই স্কুলে চান্স পাওয়া অনেক কঠিন ব্যাপার ছিল অনেকে ছেলের কাছে। তাই স্কুলের নিয়ম কানুন খুবই কড়া। প্রিন্সিপাল স্যার আমাদের আগেই বলে দিয়েছিল যে যারা গড়ে ৭০% এর কম নাম্বার পাবে তারা কেউ সাইন্স পরতে পারবে না। যেতে হবে বানিজ্য কিংবা মানবিক শাখায়। মিশুর রেজাল্ট তেমন ভালো হয়নি। প্রথম সাময়িকে ওর গড় নাম্বার ৫৮% আর দ্বিতীয় সাময়িকে ৬৯%।


ও যদি বার্ষিক পরীক্ষায় গড়ে ৮৩% নাম্বার না পায় তবে ও সাইন্স পড়তে পারবে না। ওকে নিয়ে আমার অনেক ভয়। আমি ওকে হারাতে পারবো না। যেভাবেই হোক আমাকে ওর পাশেই বসতে হবে। নাহলে আমি সাইন্সই পড়ব না। ওকে সাধারন বিজ্ঞান, অংক, ইংরেজি খুব ভালোভাবে পড়াতাম নিজেও পড়তাম। নিজের হাতে নোট তৈরি করে ফটোকপি করে ওকে দিতাম। আমার বাসায় ও মাঝে মাঝে আসত। এক্ সাথেই পড়তাম। ওর বাসাতেও মাঝে মধ্যে যেতাম। ওর মা খুব অসুস্থ বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। ওর বড় বোন ছিল সংসারে ওর মাকে দেখাশোনার জন্য। আর ওর বাবাটা ছিল মাতাল। অনেক রাতে বাসায় ফিরতো। ওদের সাথে তেমন ভালো করে কথা বলত না। একটা পুরাতন টিনের ২ তালা বাসায় ওরা থাকতো । আর আমার বাবা ছিল থানার ওসি সে জেলা শহরের থানার। তাই আমরা সরকারি বড় বাসায় থাকতাম। মিশু আমাদের বাসায় আসলে আমার বড় ভাই মুচকি হাসত। কিন্তু মিশু তেমন কারো সাথে কথা বলত না। মাথা নিচু করে আমার ঘরে ঢুকত আর মাথা নিচু করেই বের হয়ে যেত। আমার মা ওকে খুব আদর করত। বাসায় এলেই এটা সেটা রেঁধে খাওয়াত। ওর কোন স্যার ছিল না বাসায় পড়ানোর জন্য। তাই আমিই ওকে পড়াতাম যা ক্লাসে পড়তাম আর বাসার হোম টিউটরের কাছে যা পড়তাম। নিজের হাতে রাত ২ টা পর্যন্ত কখনো কখনো জেগে নোট তৈরি করতাম। আর খুব ভোরে অল্প ৩-৪ ঘণ্টা ঘুমিয়ে ক্লাসে চলে যেতাম। সব শুধু মিশুর জন্য। নিজেকেও পড়তে হবে আর যে করেই হোক মিশুকে থাকতে হবে আমার পাশে। ক্লাসের বাকি ছেলেরা খুব হিংসা করতো আমাকে কারন আমি মিশুকেই আমার সব নোটস দেই আর একসাথে পড়ি বলে। অনেকে দুই এক কথা শুনিয়েও দিত। কিন্তু গায়ে মাখতাম না সেগুলো। আমি জানি ক্লাসে আমার একটাও বন্ধু না। সব শুধু আমার নোটস এর জন্যেই কাছে ঘেষতে চায় । 

দেখতে দেখতে বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেলো। একের পর এক পরীক্ষা দিতে লাগলাম। বেশ ভালই লাগলো নিজের কাছে। আমি পরীক্ষা দিয়ে বুঝতে পারতাম যে আমি কত নাম্বার পেতে পারি। আমার অনুমানের নাম্বারের সাথে স্যারদের দেয়া নাম্বারে খুব একটা হেরফের হত না। মিশুকে নিয়ে ভয় ছিল খুব। ওর অংক পরীক্ষা, সাধারন বিজ্ঞান আর ইংরেজি পরীক্ষা কেমন হয় এই ভেবে। ও অংক পরীক্ষা ভালই দিয়েছে। আমরা দুইজনে একসাথে অংকের রেজাল্ট মিলাতাম। যেটা মনে হচ্ছে ও অংকে ৯৫-৯৬% নাম্বার পাবে। সাধারণ বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি বাকি পরীক্ষা গুলাও ভালো হল ওর। আস্তে আস্তে আমাদের ছুটি হয়ে গেলো বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধের। আমরা ঢাকায় চলে এলাম নানু বাড়ীতে বেড়াতে। ঢাকায় অনেক জায়গায় ঘুরলাম আমি, বড় ভাইয়া, আব্বু, আম্মু। আর কদিন পরেই আমাদের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল দিবে। কিন্তু আমি এতটা টেনশন করতাম না । কারন আমি জানি আমার রেজাল্ট কেমন হবে। মিশুকে নিয়েও টেনশন নেই কারন মিশুর পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। ও হয়তো ৮৭-৮৮% নাম্বার পাবে গড়ে। আমরা দুজনেই সাইন্সে পড়তে পারবো। ঢাকায় এসে এতো জায়গায় ঘুরছি, বেরাচ্ছি, এটা ওটা খাচ্ছি কিন্তু আমার কিছুতেই যেন মন নেই। কি যেন একটা নেই। ঐ মায়াবি মুখটি নেই, ঐ মিটিমিটি হাসিটি নেই। আসতে আসতে দিন গড়াতে লাগলো। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল আগামীকাল। আবার আমি আমার মিশুর মুখটি দেখবো। ওকে ছুঁয়ে দেখবো। আর ওকে খুব করে গালটা টেনে বলবো “ তোকে আমি অনেক ভালবাসি রে, মিশু” ।
আমাদের যেতে যেতে অনেক দেরী হয়ে গেলো। বড় মামা আমাদের নিয়ে যাবে। আমি মিশুর জন্যে একটা গিফট কিনেছিলাম । দুইটা মাথা নাড়ানো টিউনিং ছেলে পুতুল। একটা পুতুল আমি আর একটা পুতুল আমার মিশু। ব্যাগে খুব একটা মোটা কাগজের বক্সে পুতুলটা যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম। ঝিক ঝিক করে রেলগাড়ী ছুটে চলেছে আর আমি ছুটে চলেছি আমার মিশুর কাছে। জানালার ধারে বসেছি। বাইরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছি আর মিশুকে ভাবছি। ওর সাথে কাটানো সুন্দর মুহূর্ত গুলো একে একে চোখে ভেসে বেরাচ্ছে। কখন যে আমরা সেই ছোট্ট শহরটার স্টেশনে পৌঁছে গেলাম বুঝতেই পারলাম না। 

অনেক রাত হয়ে গেছে। ঘুম আসছে না একদম। বার বার মনে হচ্ছে আমি কখন আমার মিশুকে দেখতে পাব। কালকেই তো রেজাল্ট। অনেক মজা করবো একসাথে। নদীর ধারে একসাথে হাতে হাত রেখে হেটে বেড়াবো সেই আগের মত। বিপিন পার্কে বসে আড্ডা দেবো আর সস্তা আইসক্রিম আর ঝালমুরি খাব। সেই পুরানো জমিদার বাড়িটাতে যাব। ওকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকের হৃদপিণ্ডের প্রতিটা ধুক ধুক আওয়াজের শব্দ গুনে নেবো, ওর শ্বাস প্রশ্বাসের ভাষা বুঝে নেবো। এভাবে ভাবতে ভাবতে রাত গড়িয়ে ফজরের আজান দিয়ে দিল। চারদিক ফর্সা হয়ে হয়ে যাবে আর কিছুক্ষণ বাদে। আমি কোরআন শরীফ পড়তে জানি, নামাজ ও পড়তে জানি। কিন্তু কখনো নিয়মিত পড়ি না। ফজরের নামাজ তো নয়ই। আজ আমি আল্লাহর কাছে হাত পাতবো। শুধু এইটুকু চাইবো যে আমি আর মিশু যেন একসাথে পাশাপাশি বসতে পারি। একসাথে পড়াশোনা করতে পারি। ওকে যেন বানিজ্য বা মানবিক শাখায় যেতে না হয়। ওকে সাইন্সই পড়তে হবে এবং তা একমাত্র আমার সাথেই আমার পাশে বসে। ফজরের নামাজ পড়ে তবজি গুনছি আর আল্লাহকে ডাকছি। আস্তে আস্তে দিন হয়ে গেলো। স্কুলে আমি আর আম্মু রেজাল্ট কার্ড আনতে গেলাম। স্কুলের অংক স্যারের হাত থেকে রেজাল্ট কার্ড নিলাম। ওয়াও, নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছি না আমি তৃতীয় হয়েছি। এ যে আমার কল্পনার চেয়েও বেশী। যতটা ভেবেছিলাম তার চাইতে অনেক অনেক বেশী। রেজাল্ট দেখে আম্মু আমার গালে আলতো করে চুমু খেল। আমার যে কি ভালো লাগছে তা বলে বুঝাতে পারবও না। কিন্তু... মিশুর কি হল? স্যার কে জিগ্যেস করলাম “ স্যার মিশু আসেনি? ওর রেজাল্ট কার্ড আনতে?”। স্যার বলল” ও তো অনেকক্ষণ আগেই রেজাল্ট কার্ড নিয়ে গেছে“ ।
আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে মিশুকে খুঁজছি। মিশু কই গেলো? রেজাল্ট পেয়ে তো ওর আমাকেই জানানোর কথা আগে। কিন্তু কি হল?? অনেক খুঁজেও মিশুকে পেলাম না। 

আম্মুকে বাসায় রেখে মিশুদের বাসায় গেলাম। ওদের বাসার সামনে এতো লোক কেন? কি হয়েছে ওদের বাসায়? ওদের বাসায় কি কোন অনুষ্ঠান? যতই অনুষ্ঠান থাকুক ওর তো আমার কাছে আসার কথা আগে। মিশু কি তাহলে আমার উপর কোন কারনে রাগ করেছে?? এমন তো হবার কথা না। ওদের বাসার সামনে গিয়ে দেখি একটা লাশ কাফনের কাপড় দিয়ে মোড়ানো । চারিদিকে আগরবাতির গন্ধ। ওর মার কিছু হল না তো? ওর মার তো অনেক অসুখ। কিন্তু ওর মা কে দেখলাম উনার খাটে শুয়ে কাঁদছে। ওর বোন ও কাঁদছে। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। তাহলে কি মিশু? মিশু বোকামি করে কিছু করে ফেলল না তো ? ও কেন এমন করবে? আমার পিঠে সোহাগের হাত। সোহাগ বলল” মিশু আর নেই রে দোস্ত। সে উঁচু পানির টাঙ্কির উপর উঠে নীচে লাফ দিয়েছে। ওর মাথার মগজ পুরো থেতলে গেছে। ওকে চেনাই যাচ্ছিল না” ।আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করবো? আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। পুরো চোখ অন্ধকার হয়ে এলো। তারপর ... আমি জানি না কি করে আমি বাসায় এলাম। খাটে শুয়ে আছি। পাশে মা বসে আমার মাথায় হাত বুলাচ্ছে। আমি উঠে মা কে বললাম “ মা আমি এখানে কেমন করে এলাম? মিশু কই? আমি এখানে আসলাম কিভাবে? “।


মা বলল আমার এক বন্ধু আর তার বাবা আমাকে বাসায় দিয়ে গেছে। আমি মাকে ধরে অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম। মা বলল “ মিশুকে কবর দেয়া হয়ে গেছে রে শোনা। ওর মুখটাও তুই দেখতে পেলি না“ । মাও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মা ওকে নিজের ছেলের মতই ভালবাসত। আমাদের বাসায় এলে মিশু শুধু মার সাথেই কথা বলত। বাবা পুলিশ দেখে বাবাকে খুব ভয় পেত। আর ভাইয়ার কাছ থেকে মুখ লুকাতে আমার ঘরের জানালার পর্দায় মুখ লুকাত। ভাইয়া ঢাকায় বুয়েটে পড়তো। ছুটি পেলেই চলে যেত আমাদের সেই জেলা শহরের সরকারি বাসাতে।

 আজ আর সেই মিশু নেই। কিন্তু ও কেন মরলো? কেন তাঁকে মরতে হল?রাসেলের মুখ থেকে শুনেছি সে বার্ষিক পরীক্ষায় গড়ে ৭৯% নাম্বার পেয়েছিল। ওর ধর্ম পরীক্ষায় নাম্বার কম ছিল বলেই ওর গড় নাম্বার কমে গিয়েছিল। এই জন্যে ওকে মরে যেতে হবে? বার্ষিক পরীক্ষায় ধর্ম পরীক্ষার খাতা দেখেছিল আমাদের স্কুলে আসা এক নতুন স্যার। আমি নাহয় সাইন্স নাই পড়তাম। ওর সাথে বানিজ্য কিংবা মানবিক শাখায় পড়তাম। সবাইকে কি ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে নাকি? ও মরার আগে কি একবারও আমার মুখটি ভেবেছিল? ভাবলে হয়তো এভাবে আমাকে একা ফেলে মরতে পারতো না। মিশুর কবরের কাছে যেতে আমার ভীষণ ভয় করে। আমার স্কুলের সেই দুষ্টু ছেলেরাও খুব কেদেছে মিশুর জন্যে। 


সবাই ওর কবরের কাছে গেছে। শুধু আমিই যেতে সাহস পাই নি। কোনদিন যেতেও পারবও না ওর সামনে। ওকে তো আমি এভাবে দেখতে চাই নি। ও ছায়া হয়ে যেন আমার পাশেই ঘুরঘুর করছে। আমার বুকেই যেন মুখ লুকাচ্ছে আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমার জানালার পর্দায় মুখ লুকাচ্ছে আমার থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য। সেই পুতুল দুইটি আমি এখনো নিজের কাছে রেখে দিয়েছি। একটা পুতুল আমি আর একটা পুতুল আমার মিশু। ওকে আর দেয়া হল না। ওকে আর ছুঁয়ে দেখা হল না। 

নিঃসঙ্গ পাইন

একা একা দিনের পর দিন কাটাতে আমার ভীষণ কষ্ট হয়, যেনো দম বন্ধ হয়ে আসে। অথচ গোটা জীবন আমাকে একাই কাটাতে হবে। আমি জানি, চল্লিশ তো দূর, তিরিশ পার হবার সাথে সাথে আমাকে ভীষণ একা হয়ে যেতে হবে। সমবয়সী সব মানুষজন, বন্ধু-বান্ধবীরা যখন পুতুলের মতো সুন্দর, মায়াকাড়া বাচ্চা নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত, ক্লান্ত দিন কাটাবে; আমাকে তখন ভয়ানক নিঃসঙ্গতার সাথে বিষন্ন হয়ে লড়ে যেতে হবে। প্রতিটি মূহুর্তেই নিজেকে বেঁচে থাকার প্রেরণা দিয়ে যেতে হবে। হ্যাঁ, শুধুই বেঁচে থাকার। লোকে বাঁচে সন্তানের জন্য, সংসারের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য; আমাকে বাঁচতে হবে অকারণে, শুধুই নিজের জন্য। 



এমন কিছু প্রতিভাবানও আমি নই, যে বেঁচে থেকে সমাজের খুব উপকার করে ফেলবো, এমন কিছু সাহসীও নই যে ভীষণ বিপ্লব ঘটিয়ে দেবো। আমি বেঁচে না থাকলেও কারোই কিছু এসে যাবে না। অথচ, প্রতিটি ক্ষণেই নিজেকে বুঝিয়ে যেতে হবে আমার বেঁচে থাকা কতটা জরুরী। শুধুমাত্র সন্তান জন্ম দিতে পারবো না বলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রেখে যেতে পারবো না বলেই কি আমার জীবন ব্যার্থ? আমার সমস্ত শিক্ষা, সমস্ত যোগ্যতা সবই কি ব্যার্থ জননাঙ্গের কাছে? শুধুমাত্র প্রজননই বুঝি আমার সমস্ত সাফল্যের মাপকাঠি? এসবের কিছুই আমি বিশ্বাস করি না হয়তো, শুধুমাত্র জনক হওয়াই জীবনের স্বার্থকতা নয় তাও আমি খুব ভালোমতোই বুঝি। কিন্তু এও তো সত্যি, যৌনতার বাঁধনে, সন্তানের বাঁধনে কাউকে বাঁধতে না পারলে একলা জীবন কাটানো ছাড়া অন্য কোন উপায়ই নেই। বন্ধু? খুব ঘন ঘন বন্ধু পাল্টানোর স্বভাব আমার। বেশিদিন কারো সাথেই আমার খাতির টেকে না। 


প্রচন্ড স্বার্থপর আমি? হয়তো বা। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় সমস্যা হলো আমার অভিমান। এমন প্রচন্ড অভিমান আমার, যে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটির সামান্য অবহেলাতেও একেবারে বহুদূরের মানুষ হয়ে যাই কিছু দিনের ব্যাবধানে। সেই আমার নিঃসঙ্গ থাকা ছাড়া উপায় কি? মাঝে মাঝে ভাবি, যদি যথেষ্ঠ পুরুষালী হতাম, তবে কি আমার এমন তীব্র অভিমান থাকতো না? মেয়েলী হওয়াটাই কি আবেগের এমন তীব্রতার একটা কারণ? অথচ সবসময়, এমনকি যখন একা একা ভীড়ের পথে হেঁটে বেড়াই, তখনও মনে হতে থাকে, “যদি কেউ পাশে থাকতো!!”  অথচ এই আমার কখনোই খুব বেশি বন্ধু ছিলো না, এই আমি বরাবরই একা। এতদিনেও নিঃসঙ্গতায় অভ্যস্ত হতে পারি না কেন? যদি আমি বিষমকামী হতাম, যদি আমার সঙ্গিনী থাকতো, তবে কি কখনো কোনদিন আমি নিসঃঙ্গতায় ভুগতাম না? অথবা যদি এখনই কখনো আমার কোন সঙ্গী, ধরি জীবনসাথী জুটে যায়, সে পারবে আমার নিঃসঙ্গতা পুরোপুরি দূর করে দিতে? কোন মানুষের পক্ষেই কি তা সম্ভব? বেশিক্ষণ অনেক মানুষের সাথে থাকলে, একা হওয়ার সুযোগ না পেলে আমি হাঁপিয়ে উঠি। অথচ এই আমার প্রচন্ড ভয় হয়, ভবিষ্যতের নিঃসঙ্গ জীবনের কথা ভেবে। না, শুধুমাত্র যৌনতার অভাববোধ আমাকে কক্ষনো কাবু করতে পারে না। কিন্তু শুন্য বাড়িতে একা একা মরে পড়ে থাকার ভয় আমাকে ভীষণ দুর্বল করে দেয়। 

নতুন পথের সূচনা

১.

ইনবক্সে বিশাল এক মেসেজ পেলো রুদ্র। জারিফ লিখেছেঃ

আজ কিছু না বলা কথা বলতে চাই। তোমার সাথে পরিচয় কতদিনের! মাস তিনেক হবে। মনে পড়ে? পহেলা বৈশাখে প্রথম তোমাকে ফ্রেন্ড রিকুএস্ট পাঠাই! তুমি অনলাইনেই ছিলে। সাথে সাথে এক্সেপ্ট করলে। চ্যাট শুরু করলাম। পরিচয় পর্ব সেদিন আর বেশিদুর গড়ায়নি। আমিও জোর করিনি, কারণ জানতাম তোমার মনটা সেদিন ভীষণ রকমের খারাপ ছিল। কিভাবে জানতাম? সে কথাই আজ বলবো।

পরদিন আবার ফেইসবুকে আসলাম শুধু দেখার জন্য তুমি অনলাইনে আছো কিনা, দেখলাম নেই। তৃতীয় দিন তোমাকে পেলাম, তাও অল্প সময়। অনেকটা বেহায়ার মতোই তোমার কুশলাদি জিজ্ঞেস করলাম। কোনমতে হ্যাঁ/না বলে জবাব দিলে। একটু পরই সাইন আউট। এদিকে আমার ভিতরে যে তখন কী চলছিল, তা বলে বুঝাতে পারব না। এরপর আবার দুইদিন পরে তোমাকে অনলাইনে পেয়ে আমার কলিজায় পানি আসলো। একপ্রকার জোর করেই তোমার বন্ধুত্ব ভিক্ষা চাইলাম। ঠিক কলাভবনের পিচ্চিগুলার মত, “ভাইয়া একটা চকলেট নেন না। নেন না ভাইয়া... না নিলে পা ছাড়ুম না।” ওদের থেকে চকলেট না কিনে যেমন উপায় থাকে না, আমার বন্ধুত্ব স্বীকার না করেও তোমার তেমনি উপায় থাকল না। বন্ধুত্ব করা ছাড়া সত্যি আমার আর কোন উপায় ছিলো না তোমার পাশে থাকার।

অবাক হচ্ছো, তাই না? এবার আসছি আসল কথায়। প্লিজ রাগ কোরো না, প্লিজ! আমি হচ্ছি সোহানের বন্ধু। তার বেস্টফ্রেন্ড। আমিও তাকে বেস্টফ্রেন্ডই ভাবতাম, কিন্তু তোমার সাথে ও যা করলো তারপর থেকে ওকে আর বেস্টফ্রেন্ড ভাবি না। আসলে সোহান সব সময়ই প্লেবয় টাইপের ছেলে ছিল। যাইহোক, আমার কথায় ফিরে আসি। সোহানের জীবনে যখন তুমি এলে, সোহান আমাকে তার ফোনে তোলা তোমাদের এক যুগলবন্দী ছবি দেখিয়ে বললো, “দেখ্‌ দোস্ত, নতুন মাল!” প্রথমে দেখে আমিও ওর কথায় সায় দিয়েছিলাম, “সত্যি তো! কোথায় পেলি? কী অপুর্ব চোখ রে বাবা!” সোহান সাবধান করে দিয়ে বলেছিল, “খবরদার! এইটা আমার মাল। তুই নজর দিবি তো খবর আছে।” খবর আমার সত্যিই হয়ে গিয়েছিল রুদ্র। সেদিন বাসায় ফিরে কেবলই তোমার কথা ভেবেছি। আর আফসোস করেছি, ইশ! আমি যদি সোহানের মত সেক্সি আর ফরসা হতাম, তোমার ছবিটা হয়তো সোহানের মোবাইলে না থেকে আমার মোবাইলেই থাকতো। যাইহোক, এরপর প্রায়ই সোহানের থেকে তোমার খবর নিতাম। তোমার ওই চোখ দুটোতে কী যেন একটা ছিল, আমি ঠিক বলে বুঝাতে পারব না। একদিন কী করেছি জানো? সোহানের মোবাইল থেকে চুরি করে তোমার সব কয়টা ছবি ব্লুটুথ দিয়ে নিজের মোবাইলে নিয়ে নিয়েছিলাম। ও টেরও পায়নি। একেই কী তবে প্রথম দেখায় প্রেম বলে? হবে হয়তো! বন্ধুর জীবনে কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে চাইনি। তাই তোমার সাথে কোনরকম যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি তখন। কিন্তু তোমার জন্য খুব দুশ্চিন্তা হতো। কারণ আমি জানতাম সোহান তোমার জীবনে এসেছিল কেবল ভোগের প্রত্যাশা নিয়ে। আমি সোহানকে অনেকবার বলেছি, “দেখ, ছেলেটার জীবনে তুইই প্রথম প্রেম। ওকে কষ্ট দিস না।” ও কিন্তু বলেছিলো আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যাবে। সান্ত্বনা ছিল এতটুকুই যে, তুমি তো অন্তত সুখে থাকবে তোমার ভালবাসার মানুষটিকে নিয়ে। কিন্তু কথায় আছে না? কয়লা যায় না ধুলে, আর স্বভাব যায় না ম’লে। সোহান তার স্বভাব পাল্টাতে পারলো না। ও যে ভিতরে ভিতরে ওর ফ্ল্যাটে আগের মত ছেলেদের বাগিয়ে নিয়ে আসতো, আমাকে তার কিছুই বলতো না। যখন বললো, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তোমাকে সাবধান করার কোন সুযোগই তখন আমার নেই। কারণ, তুমি সেটা আমার আগেই জেনে গেলে।

পহেলা বৈশাখের দিন সকাল বেলা তুমি হাজির হলে ওর ফ্ল্যাটে বাটি ভর্তি পান্তা-ইলিশ নিয়ে। দরজা লক না করা থাকায় সোজা ঢুকে গেলে সোহানের রুমে। যা দেখলে, তা আর নাই বা বললাম। দুপুরে সোহান আমাকে ফোন দিয়ে জানালো সব কিছু। শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম কিছুক্ষনের জন্য। ভাগ্যিস আমাদের দেশে এখনো ভিডিও কল চালু হয়নি। হলে সোহান ঠিকই দেখতে পেতো কিভাবে আমার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছিল সেদিন। সোহানের বেস্টফ্রেন্ড হওয়ায় তোমার ফেইসবুক আইডি জানাই ছিল। এই আইডিটা খুলে ফ্রেন্ড রিকুএস্ট পাঠালাম। আর বন্ধুত্বের জন্য নিজের ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে দিলাম তোমার দিকে। একটা অপরাধ বোধ কাজ করছিল নিজের ভিতর। আমি তো জানতাম সোহান কেমন, তাহলে কেন তোমাকে সাবধান করলাম না?

সঙ্গতকারণেই আমার কোন ছবি তোমাকে দেখাইনি। কাল তুমি সামনাসামনি দেখা করতে চেয়েছ। ভেবে দেখলাম আমিও তো সোহানের মত তোমাকে ধোঁকা দিচ্ছি বন্ধুত্বের নাম করে। ধোঁকা দিয়ে ভালোবাসার মত পবিত্র সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আর এইসব সত্য জানার পর তুমি আমাকে ভালোবাসা তো দূরের কথা আমার সাথে বন্ধুত্বও রাখবে না। তাই এই একাউণ্টটা আজ ডিএক্টিভেট করে দিচ্ছি। পারলে আমায় ক্ষমা করো।

২.

রাতের বাসে কক্সবাজার যাচ্ছে রুদ্র। একাই। নিজের চাপা কষ্টটা অন্যকে দেখিয়ে করুণা আদায় করার ইচ্ছে তার নেই। পরপর দুটো ঝড় সামলাতে গিয়ে অনেক ধকল গেছে তার উপর দিয়ে। তাই অশান্ত সমুদ্রের কাছে তার অতৃপ্ত মনের না বলা কথাগুলো বলে নিজেকে একটু হালকা করবে সে। অন্যান্য যাত্রীদের সাথে সোহাগের বাস কাউন্টারে বসে মুখ ঢেকে পেপার পড়ছিল রুদ্র। ২৬/২৭ বছরের একটা লোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বললো,

-     এক্সকিউজ মি, আমার ব্যাগটা একটু দেখবেন? আমি একটু ওয়াশরুম থেকে ফ্রেস হয়ে আসতাম।
-     (পেপারের আচ্ছাদন থেকে মুখ বের করে) সিওর, আপনি যান।
-     না থাক। (ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললো আসিফ)
-     আচ্ছা, বিশ্বাস করতে না পারলে থাক। আপনি ব্যাগ নিয়েই টয়লেটে যান।
আবার পেপার দিয়ে মুখটা ঢেকে দিল রুদ্র। আসিফ দাঁড়িয়েই আছে। বুঝতে পারছে না, এ কি করে সম্ভব! রুদ্র? সেও কক্সবাজার যাচ্ছে? একই বাসে? 
-     কী হলো? এনি প্রব্লেম?
-     না, না। ঠিক আছে। সরি। আপনি একটু ব্যাগটা যদি...
-     (মুচকি হেসে)আরে ভাই যান, ব্যাগ নিয়ে পালাবো না।
-     না না, তা কেন হবে? আচ্ছা আমি আসছি।

বাস ছেড়ে দিল ঠিক রাত ১১ টায়। ৪ টায় হোটেল নুরজাহানে চা পানের বিরতি। রুদ্র এক ঘুম দিয়ে উঠলো। একটু ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার। বেসিনের সামনে আসতেই আবার ওই লোকটার সাথে দেখা। লোকটা মুখ ধুচ্ছিলো। পাশে দাঁড়িয়ে বেসিনের কলটা ছাড়তেই লোকটা মুখ ধোয়া বাদ দিয়ে হা করে তাকিয়ে রইলো রুদ্রর দিকে। মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে পানির ফোঁটা। রুদ্র রীতিমত বিরক্ত।
-     আচ্ছা, আপনি কী আমাকে চেনেন?
-     ইয়ে, না। মানে...
-     মানে মানে করছেন কেন? বাস কাউন্টার থেকেই লক্ষ্য করছি আপনি এমন ভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছেন, মনে হয় আপনি আমাকে চেনেন।
-     ইয়ে, আসলে আপনাকে দেখতে আমার পরিচিত এক বন্ধুর মত লাগলো তো, তাই।
-     ও আচ্ছা।

দুজনে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে।

-     আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আপনার সাথে এক কাপ চা খেতে পারি? আমি আবার একা কিছু খেতে পারি না।
-     ওকে, নো প্রব্লেম।

আসিফ ভাবতেই পারছে না, এটা কী স্বপ্ন! নাকি সত্যি? রুদ্র বসে আছে তার সামনে? মনে মনে ভাবছে আর কিভাবে তার সাথে আরো বেশি সময় কাটানো যায়।

-      চায়ের সাথে আর কিছু?
-      না, শুধু চা। ও ভালো কথা, আপনার নামটা?
-      আসিফ, আসিফ ইকবাল
-      হুম, আমি রুদ্র। রুদ্র মাহমুদ। বিবিএ করছি। আপনি?
-      আমি ব্র্যাকে আছি। অফিসের একটা সার্ভে করতে কক্সবাজার যাচ্ছি। ভালো কথা, কোন হোটেলে উঠছেন?
-      প্রাসাদে। আপনি?
-      তাই নাকি? আমিও তো। যাক এক সাথে সময় কাটানো যাবে।
-      যদি কারো সাথে সময় কাটাতেই চাইতাম, তাহলে কী আর একা আসতাম?
-      ওহ্‌ সরি। মাফ করবেন। আমি বুঝতে পারিনি।
-      ইটস্‌ ওকে। আচ্ছা, চলেন ওঠা যাক। বাস ছেড়ে দিচ্ছে।
৩.

কক্সবাজারে এসে আসিফ অনেক চেষ্টা করেছে রুদ্রর কাছাকাছি যাওয়ার জন্য, একটু কথা বলার জন্য। কখনো একসাথে খাওয়ার বায়না ধরে, কখনোবা শপিং-এ সাথে যাওয়ার অনুরোধ করে। রুদ্র কেবলই ভদ্রতা রক্ষার্থে আসিফকে যা একটু সময় দেয়। পুরোটা সময় হয় হোটেলে, না হয় বীচে কাটায় সে। একা একাই ঘুরে বেড়ায় সমুদ্রের বালুকাবেলায়। আসিফ বুঝতে পারে এভাবে রুদ্রকে বিরক্ত করাটা তার ঠিক হচ্ছে না। তাই এক সময় আস্তে আস্তে দূরে সরে আসে। রুদ্রকে তার নিজের মত করে থাকতে দেয়।

কাল আসিফ ঢাকা ফিরে যাবে। প্রথমে চট্টগ্রাম, অফিসে রিপোর্ট সাবমিট করে রাতের ট্রেনে ঢাকা। সন্ধ্যায় লাবণী পয়েন্টে বালির উপরে বসে একমনে সমুদ্রের গর্জন শুনছিল রুদ্র । শেষবার রুদ্রকে দেখার জন্য, একটু কথা বলার জন্য, ভদ্রতার অযুহাত দেখিয়ে বিদায় নিতে এগিয়ে যায় আসিফ।

-      ভালো আছেন?
-      ও, আসিফ সাহেব? এইতো। কেমন আছেন?
-      কাল রাতের ট্রেনে ঢাকা চলে যাচ্ছি। তাই আপনার থেকে বিদায় নিতে এলাম। অনেক বিরক্ত করেছি আপনাকে। সম্ভব হলে মাফ করে দেবেন।
-      আরে নাহ্‌, কিসের বিরক্ত? কাল তো আমিও যাচ্ছি। রাতের ট্রেনেই। দেখেন, কী অদ্ভুত মিল! একই বাসে আসলাম, আবার একই ট্রেনে যাচ্ছি। হা হা হা
-      আসলেই তো! আপনার হাসিটা খুব সুন্দর। সবসময় হাসতে পারেন না? এত মন খারাপ করে থাকেন কেন সব সময়?
-      (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আচ্ছা, উঠি। ভালো থাকবেন।
রুদ্র উঠে চলে যায়। আসিফ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে রুদ্রর চলার পথে, যতক্ষণ না তার অবয়বটা ঝাপসা হয়ে আসে। কিন্তু লক্ষ্য করে না রুদ্র যেখানে বসে ছিল সেখানে বালির উপর অনেকগুলো Z আঁকা, আঙ্গুল দিয়ে।

 ৪.

বার্থে ঢুকতেই আসিফের চোখা ছানাবড়া হয়ে যায়। একি! রুদ্র? তার বার্থেই? পুরো এক মিনিট দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকে সে।

-      হা হা হা (রুদ্রর প্রাণবন্ত হাসি ট্রেনের আওয়াজ ছাপিয়ে আসিফের কানে রিনরিন করে বাজতে থাকে।) আরে মুখটা তো বন্ধ করেন, মাছি ঢুকে গেল তো। হা হা হা! দেখলেন! আবার দেখা হয়ে গেল।
-      তাই তো! আপনি জানতেন যে আমি এই বার্থে উঠছি?
-      আরে নাহ্‌। জানলে কী আর আপনাকে আরো সুযোগ দেই আমাকে বিরক্ত করার!
-      (লজ্জা পেয়ে যায় আসিফ) আসলেই তো।
-      আসেন, আসেন। ভিতরে আসেন। বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি?
-      ও হ্যাঁ। (ভিতরে ঢুকে বার্থের দরজা লাগিয়ে দেয় আসিফ)

ব্যাগ গুছিয়ে রেখে আসিফ জিজ্ঞেস করলো,
-      আপনি কোন বেডটা নিবেন? উপরেরটা, নাকি নিচেরটা?
-      আমার টিকেটে যেহেতু উপরেরটার কথা লেখা আছে, সেহেতু আমি উপরেই থাকবো।
-      না না। উপরে ঝাঁকুনিতে আপনার যদি ঘুম ভেঙ্গে যায়?
-      আমার ঘুম নিয়ে আপনার তো দেখি ব্যাপক টেনশন! (মুচকি হেসে) ব্যাপার না। আপনি নিচে শোন, আমি উপরেই শুচ্ছি।
-      আচ্ছা, আপনার যেমন ইচ্ছে। আমি একটু ফ্রেস হয়ে আসছি।

এই বলে আসিফ বেরিয়ে যায় বার্থ থেকে। রুদ্রর খুব ঘুম পেয়েছে। সে উপরে উঠতে যাবে, এমন সময় দেখে ফোন বেজে উঠল নিচের বেডে। ফোনটা ভুলে বেডের উপরেই রেখে গেছে আসিফ। কয়েকবার বাজলো। আওয়াজটা এত কর্কশ, যে কানে লাগে। রুদ্র সাইলেন্ট করে রাখতে ফোনটা হাতে নিতেই কলটা কেটে গেল। আর মোবাইলের স্ক্রীনে ভেসে উঠলো রুদ্রর ছবি। অনেক আগে তোলা। কিন্তু এই ছবি আসিফ সাহেবের মোবাইলের স্ক্রীনে কেন? এটা তো সোহান তুলেছিল তার মোবাইল দিয়ে, সেই এপ্রিল মাসের ৩ তারিখে। রুদ্রর জন্মদিনে। কল্পনায় ভেসে উঠলো জারিফের সেই মেসেজটা।

তাহলে? তাহলে আসিফ সাহেবই জারিফ? খুশিতে মোবাইলটা বুকে জড়িয়ে ধরল রুদ্র। তার চোখে পানি। রোদ আর বৃষ্টি একসাথে হলে নাকি শিয়াল মামার বিয়ে হয়। কিন্তু হাসি আর কান্না একসাথে হলে? রুদ্রর জানা নেই।

এমন সময় বার্থের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো আসিফ। রীতিমত অপ্রস্তুত। তার  মোবাইলটা রুদ্রর হাতে, রুদ্রর চোখে পানি। তাহলে কী রুদ্র সব জেনে গেল? চোখ নিচের দিকে নামিয়ে নিল সে। ঠিক সেই সময় রুদ্র ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো আসিফের বুকে। কাঁদতে কাঁদতে ভিজিয়ে দিলো আসিফের শার্টের বুকের দিকটা।



-      এই কয়টা মাস কিভাবে কেটেছে আমার জানো? কতভাবেই না তোমাকে খুঁজেছি। কেন এই শাস্তি দিলে, বল? কেন সামনে আসোনি? কেন দেখা করলে না সেদিন? তোমার সাথে যোগাযোগের কোন সুযোগই রাখলে না। কেন? বল? কেন?  (রুদ্র আর কথা বলতে পারে না। ফোঁপাতে থাকে।)
-      ভয়ে, যদি তুমি আমার ভালবাসা গ্রহণ না করতে? (আসিফ আলতো করে জড়িয়ে ধরলো তার বহুল আরাধ্য ভালোবাসার মানুষটিকে )
-      তোমার মাথা! কেন গ্রহণ করতাম না? তোমার এত গভীর ভালোবাসা অবজ্ঞা করার শক্তি কী আমার আছে? তুমি সামনে এসে একবার মুখ ফুটে বলে তো দেখতে!
-      হয়েছে, আর কোন কথা নয়। চুপ, একদম চুপ।

এই বলে রুদ্রর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল আসিফ। ট্রেন যদিও চলছিল ঢাকার পথে, আসিফ আর রুদ্র চলতে শুরু করলো এক নতুন পথের সূচনায়। 

পৃথিবীর প্রান্তরেঃ দক্ষিণ আফ্রিকার এক তরুনের করুন কাহিনী।

ছেলেটির বয়স ২০ বছর। নাম কি ছেলেটার? নাম না হয় অজানাই থাক। গাঁয়ের রঙ বলে দিচ্ছে সে নিগ্রো। দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। দক্ষিণ আফ্রিকা হচ্ছে নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ। পৃথিবীর হীরার খনি। পৃথিবীর সব থেকে বেশী বর্জপাত হয় আবার এই দক্ষিণ আফ্রিকায়। ছেলেটি পড়ার জন্য চলে এসেছে রাশিয়া। রাশিয়ার একটি শহরের নাম বেলগ্রেড। সে পড়ত বেলগ্রেডের শুখভ স্টেট টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে।



কালো ছেলেটি সমকামী ছিলো। তোমরা অনেকেই জানো রাশিয়ায় সমকামী বিদ্বেষ কতটা মারাত্মক। পুতিনের দেশ রাশিয়া ঘৃণা করতেই ওস্তাদ। তারা কালোদের ঘৃণা করে, তারা মুসলমানদের ঘৃণা করে, তারা সমকামীদের ঘৃণা করে। তাদের ঘৃণার অন্ত নাই। এই রাশিয়ায় এসে  নিগ্রো ছেলেটি ভূক করে এক ফাঁদে পা দিয়ে বসেছে।  সে ১৫ বছর বয়সের একটি ছেলের সাথে সাথে তার আলাপ হয় ইন্টারনেটে। দেখা করার জন্য একদিন সরল বিশ্বাসে ছেলেটি তার ফ্লাটে যায়।  আসলে সেখানে ১৫ বছর বয়সের কোন ছেলে ছিলো না। ছিলো রাশিয়ার একটি এন্টি গে গ্রুপ। তারা কৌশলে ছেলেটিকে ঐ ফ্লাটে নিয়ে আসে। সেখানে ছেলেটিকে তারা হেনস্তা করে একটি ভিডিও তৈরী করে। পরে ভিডিওটি তারা রাশিয়ার সামাজিন মিডিয়া ওয়েবসাইট ভিকে তে ছেড়ে দেয়। ভিডিওটিতে দেখা যায় তারা ছেলেটিকে তার যৌন পরিচয় নিয়ে জেরা করছে। তাকে দিয়ে স্ট্রিপ নাচ নাচাচ্ছে। জোর করে তাকে ন্যাঁড়া করে দিলো। এরপর একটা তরমুজ নিয়ে তাকে নাচতে  হচ্ছে। একপর্যায়ে তরমুজটি তার মুখের উপর ভেঙে ফেলল। ছেলেটির হাত দিয়ে তার মুখে এক নাগাড়ে চড় থাপ্পড় মারা হলো। তার গাঁইয়ের রঙ নিয়ে বারবার বিদ্রুপ করা হচ্ছে। দলের এক মহিলা সদস্য ছেলেটাকে বিড়ালের সাথে যৌনমিলন করার পরামর্শ দিলো।

অনলাইনে ভিডিওটি প্রকাশ হুয়ার পরে শুখভ স্টেট টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি ছেলেটি তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছে। এখন খুব সম্ভবত ছেলেটিকে কোন ডিগ্রি ছাড়াই তার নিজের দেশে ফিরে যেতে হবে।


বাংলাদেশে  সমকামী বিদ্বেষ চোখে পড়ার মত। যদিও এখানে এখনো সেভাবে কোন এন্টি গে গ্রুপ গড়ে ওঠেনি। গড়ে না উঠুক এই আমাদের প্রত্যাশা। তবে যারা অনলাইনে পরিচয়ের পর সাক্ষাৎ করতে যাও তাদেরকে বিশেষ সতর্ক থাকার আহবান জানাচ্ছি। 
 
^ মাথায় ওঠ