skip to main |
skip to sidebar

আজ সেই যৌন পল্লী আর যৌন পল্লী নেই সেখানে এই সকল ঘটনার পর গড়ে তোলা হয় অভিনব বহুতল বিপনী বিতান। স্থানান্তরীত করা হয় যৌনকর্মীদের অন্যত্র। কিন্তু এই অভিবাসন কি পারবে যৌনকর্মীদের তাদের পেশা থেকে তাদের ফিরিয়ে আনতে। পারবে কি তাদের জীবনের নিরাপত্তা দিয়ে সরকার সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনতে তাদের? জানি পারবেনা, তবুও মানুষের মিথ্যে অভিনয় দেখতে খুব একটা খারাপ লাগেনা, মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে খুব। সত্যিকারের বিশ্বাস।
মুভিটি পরিচালনা করেছেন- নাগক ডাং ভূ
প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন- মান হাই লং (লেম), ভিন খোয়া হো (খই)
মুক্তির সাল- ২০১১
মুভিটির দৈর্ঘ্য- ১০৩ মিনিট
আই.এম.ডি.বি তে মুভিটির রেটিং-৬.৬/১০
সমকামিতা নিয়ে লেখা সকল গল্প কবিতা উপন্যাস এক সাথে প্রকাশ করার আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াস ।
Monday, 3 March 2014
ময়ূরপঙ্খী নাউঃ চতুর্থ পর্ব
বাসায় ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল, আর মনটাও কেমন যেন করছিল। তাই আর ফোন দেয়া হলো না আউয়ালের দেয়া নাম্বারটায়। তবে মনের উপর খুব যে একটা ভরসা আমার নেই সেটা জানা ছিল, তাই বাসায় এসেই মোবাইলে সেভ করে নিলাম তুষারের নাম্বারটা।
পরদিন বিকেলের দিকে ফোন দিলাম।
- হ্যালো...
- হ্যালো, কে বলছেন?
- এটা কি তুষারের নাম্বার? আউয়াল আমাকে আপনার নাম্বারটা দিয়েছে।
- রং নাম্বার।
মুখের উপর ফোনটা কেটে দিল। অবাক, খুশি দুটাই হলাম। অবাক হলাম এটা ভেবে যে ছেলেটা নিজের নাম্বার আউয়ালকে দিয়েও কেন আমাকে না চেনার ভান করছে? আর খুশি হলাম এটা ভেবে যে ছেলেটা হয়তো আউয়ালকে নাম্বারটা দেয়ার পর থেকে রীতিমত বিভিন্ন মানুষের ফোন পেয়ে পেয়ে অতিষ্ট, তাই সবাইকে এভয়েড করছে।
রাত ১১ টায় তুষারের নাম্বার থেকে মিসড কল এলো। কল ব্যাক করলাম।
- কি? এবার চিনতে পেরেছেন?
- হুম।
- আউয়ালের সাথে কথা হয়েছে?
- জ্বি।
- ভালো আছেন?
- জ্বি।
- এভাবে হু হা আর জ্বি জ্বি করলে কিভাবে হবে?
- তাহলে কি বলবো?
- আপনার কথা বলেন, শুনি
- আমার কোন কথা নাই। দেখা করবেন?
এভাবে সরাসরি যে তুষার নামের ছদ্মনামি মানুষটা দেখা করার কথা বলবে, সেটা ভাবিনি। দেখা করতে চাইলাম। তুষার তার মেসের ঠিকানা দিল। যেয়ে যে মানুষটাকে দেখলাম তাকে দেখে আমার যৌনক্ষুধা নিমিষেই ক্ষুধামন্দায় পরিণত হলো। ছোটখাট, মোটাসোটা একটা ছেলে। যেভাবে আমাকে রুমে ঢুকিয়ে এক ঝটকায় নিজের লুঙ্গির গিঁটটা খুলে ফেলল, আমি রীতিমত ভয়ই পেয়ে গেলাম। এরপর নিজের উলঙ্গ দেহটা নিয়ে আমার পাশে এসে বসল তুষার (যার আসল নামটা আমি আজো জানিনা।) বসেই আমার বিশেষ জায়গায় হাত দিয়ে দিল। আমি রীতিমত অপ্রস্তুত ছিলাম, ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুই বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। হঠাত বুঝতে পারলাম তুষার আমার প্যান্টের বেল্ট আর চেন খুলে ফেলেছে। তুষারের হাত ততক্ষনে আমার আন্ডারওয়্যার খুলতে ব্যস্ত। আমি খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেললাম। কিন্তু তুষার ততক্ষনে তার কার্যসিদ্ধি করে ফেলেছে অনেকখানি। আমি পুরোপুরি উত্তেজিত। অনেক ইচ্ছা সত্ত্বেও নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। ক্ষুধার্ত ছিলাম, সেটাও একটা কারন হতে পারে। যা হবার হলো। তুষারের হয়তো আমাকে ভালো লেগেছে, কিভাবে বুঝলাম? আমার থেকে কোন টাকা নিলো না সে। টাকা চাইলেও অবশ্য আমি না করতাম না। চলে এলাম তুষারের মেস থেকে, কিন্তু প্রচন্ড একটা বিরক্তি কাজ করছিলো আমার মাঝে। এই প্রথম কারো সাথে প্রেমহীন কামে লিপ্ত হলাম। খুব রাগ লাগছিল নিজের উপর, কেন যে আসলাম? কিন্তু শারীরিক একটা প্রশান্তিও পাচ্ছিলাম ভেতরে ভেতরে। এ যেন এক মিশ্র অনুভূতি, তোকে বলে বোঝাতে পারবো না।
এর কিছুদিন পর আবার রমনায় গেলাম, উদ্দেশ্য আউয়ালের সাথে দেখা করা। দেখা পেয়েও গেলাম তার। আমাকে দেখেই যুদ্ধ জয়ের হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো আমার কাছে।
- কি? কেমুন মজা পাইলেন?
- মজা তো মনে হয় আমার চেয়ে তুমিই পেয়েছো বেশি।
- হা হা হা!
- হাসছো যে?
- আফনেরে বোকা বানাইতাম ফারছি, হেল্লাইগা হাসতাছি।
- হুম ভালো।
- আহেন বইসা কতা কই।
- হুম চলো। কথা বলতেই তো এলাম।
- আফনের লগে কতা কইলে খুব ভালা লাগে। আফনে অনেক বালা মানুষ।
আউয়ালের সাথে বসে পড়লাম একটা বেঞ্চে।
- আউয়াল, তোমার খারাপ লাগে না এসব করতে?
- আগে লাগতো, অহন আর লাগে না।
- কেন?
- প্যাটের দায় যে কি জিনিস আফনেরা বড়লোকরা হেইডা বুজবেন না বাইজান।
- তোমার বাবা নেই? কিছু করে না?
- বাপ মরছে অনেক আগেই। মায়ে ঝিয়ের কাম করে। বড় বইন্ডার বিয়া দিছিলাম এক হিরুইঞ্চির লগে, হেই হালার পুত আমার বইনেরে তো দেহেই না, উলটা আমগো বাড়িত আইয়া ট্যাকা লইয়া যায় মার থোন। আর আকাইম্মা বড় ভাই একখান আছে, হেও মস্তানি কইরা অহন জেলের ভাত খাইতাছে। ভালাই অইছে, একজনের পেট তো কমছে!
- তাহলে তোমাকেই পরিবারের দেখাশোনা করতে হয়!
- হ! শইলডা অনেক কাম দিছে অভাবের সময়।
- মানে?
- ছোড বেলা থেইকাই কেমুন জানি মাইয়া মাইয়া আছিলাম। বয়স তহন কতো হইবো? বারো কি তেরো! আফার সুনু, পাউডার আর লিপিস্টিক লাগাইতাম চুরি কইরা। কাজল দিতে খুব ভালা লাগতো। মায় আর আফায় খুব বকতো, কিন্তু আমি তাও চুরি কইরা লাগাইতাম এইগুলান। লুকায়া লুকায়া একদিন শাড়িও পরছিলাম। হাইরে মাইর খাইছি হেই দিন! অহনো মনে আছে। বাড়িত থোন পলায়া গেছিলাম। আমগো বাড়ির পাশেই আছিল আত্রাই নদী। নদীর পারে বইয়া অনেক কানছি। সেই সময় নদীর পাশ দিয়া যাইতেছিল পাশের বাড়ির আক্কাছ ভাই। আমারে কানতে দেইখা পাশে বইয়া খুব আদর করলো। জিগাইলো আমি কান্দি ক্যা। কইলাম মায়ে মারছে আফার লিপিস্টিক দিছি দেইখা। আক্কাছ ভাই কইলো লিপিস্টিক দিলে নাকি আমারে খুব সুন্দার দেখা যায়। কইলো আমারে একখান লিপিস্টিক কিন্যা দিবো। এরপর আমারে কইলো হেগো বাড়িত যাইতে। আমিও গেলাম। হেগো বাড়িত কেউ আছিল না। বাড়িত যাইয়াই আক্কাছ ভাই আমারে খুব আদর করতে লাগলো হের রুমে নিয়া। হের লুঙ্গিডা খুইল্যা ফালাইলো গার থোন। আমার লুঙ্গিও খুইলা দিল। আমি কিছু বুঝতাছিলাম না। আক্কাছ ভাই আমার সারা গায়ে অনেক আদর দিল। আমার খুব ভালা লাগতেছিল। এরপর সরিষার তেলের বোতল নিল টেবিলের উপরের থেইকা। হের ধোনের মধ্যে লাগাইলো আচ্ছা মতোন। হেরপর আমার দুই ঠ্যাং হের দুই কাঁধে তুইলা আমার পাছার ফুটার মধ্যে হের ধোন...
- আউয়াল হয়েছে, থাক আর বলতে হবে না।
- হেইদিন খুব রক্ত বাইর হইছিল। কানতে কানতে বাড়িত আইছিলাম। মা আর আফায় মনে করছে আমি হেগো মাইরের কারনে কান্তাছি, তাই কিছু জিগায় নাই কেন কান্দি, আমিও আর কইতে পারি নাই শরমে। সারা শরিল বিষ করলো। রাইতে জ্বর আয়া পড়লো আমার। মা কবিরাজ ডাকলো। কবিরাজ আয়া জ্বরের অসুদ দিয়া গেলো। এক সপ্তা পর সুস্থ হইলাম।
- তোমার মাকে বলা উচিত ছিল আউয়াল।
- কই নাই আরেক কারনে।
- কি কারন?
- আমার কাছে আক্কাছ ভাইরে ম্নে ধরছিল। হে আমার লগে যা যা করছে আমার খুব ভালা লাগছে। মায়েরে কইয়া আক্কাছ ভাইয়ের আদর থেইকা বঞ্চিত হইতে চাই নাই।
- হুম। বুঝলাম।
- আক্কাছ ভাই আমার মাই দুইডা খুব সুন্দর কইরা চুষত আর টিপত। আমার খুব মজা লাগতো জানেন? পরথম দিন ব্যাথা পাইছি, কিন্তু হের পর থেইকা অনেক সুখ পাইছি
কয়দিন পর দেহি আমার বুক হইতাছে মাইয়াগো লাহান। পরথমে ভাবছিলাম আক্কাছ ভাইয়ের টিপ খাইয়া অইতাছে, কিন্তু পরে দেহি দুধের বোটাও আইতাছে মাইয়াগো বুকের লাহান। আমার গলাও দেহি কেমুন যেন ভাঙ্গা ভাঙ্গা হইয়া গেলো।
- তারপর?
- মায়ে বুঝলো হের ঘরে দুই পোলা আর এক মাইয়া না; এক পোলা, এক মাইয়া আর এক না পোলা না মাইয়া জন্মাইছে।
- মানে?
- মানে মায়ে বুঝলো যে আমি হিজড়া।
- তুমি হিজড়া?
- হ! দেহেন না গলায় গামছা ঝুলায়া রাহি! কিন্তু অন্য হিজড়াগো মতন সাজগোজ করতে অহন আর ভাল্লাগে না। আর হিজড়াগো চাইতে পোলাগো দাম এই পার্কে বেশি। তাই পোলা সাইজা থাকলেই পয়সা বেশি পাওন যায়।
- হুম, বুঝলাম। আউয়াল এই টাকা কয়টা রাখো। আজ উঠতে হবে।
আউয়ালের হাতে দুইশ টাকা দিয়ে পার্ক থেকে বের হয়ে এলাম। মাথাটা ভনভন করছে। কি শুনলাম এসব এতক্ষণ!
আউয়ালের প্রতি একটা মায়া আগে থেকেই ছিল, কিন্তু মায়াটা সেদিনের পর থেকে আরো বেড়ে গেলো। সপ্তাহে একদিন হলেও যেতাম রমনায়, আর কিছু টাকা দিয়ে আসতাম ওর হাতে। এর মাঝে ইয়াহু মেসেঞ্জারে চ্যাট করতাম অনেকের সাথে। দেখা করতে চাইতো অনেকে। আমিও যে চাইতাম না, তা নয়। কিন্তু এবার আর ভুল করলাম না। অন্যদের বাসায় গেলাম না আগেরবারের মতো। বাসায় কেউ না থাকলে নিজের বাসায় দেখা করতে চাইতাম। কেউ রাজি হলো না। একদিন চ্যাট করছি একসাথে পাঁচ জনের সাথে। সবাইকেই বললাম যে আমার বাসা খালি। জানতাম না করবে, কিন্তু প্রথমে একজন রাজি হলো। আমি তো অবাক! এরপর দেখি আরো একজন, তারপর আরো একজন রাজি হলো বাসায় আসতে। আমি বুঝতে পারলাম না কি বলবো। তিনজনকেই বললাম বাসার কাছাকাছি এসে ফোন দিতে। ধরে নিয়েছিলাম যে কেউই হয়তো আসবে না, আর আসলেও হয়তো একজনই না হয় আসবে! কিন্তু তিনজনই আসলো। আমি পড়লাম বিপদে। কুল রাখি না শাম রাখি অবস্থা। যাইহোক তিনজনকেই একে একে বাসায় নিয়ে আসলাম। শরীফ, ফাহাদ আর চয়ন। আমাকে যে নাম বলেছিল তাই বললাম। তিনজনকে বাসায় নিয়ে এসে একসাথে বসলাম। বললাম, “আমাদের চারজনের উদ্দেশ্যই যেহেতু এক, আমরা কি একসাথে কাজটা করতে পারি?” আমার মাথা তখন পুরাই নতুন এক নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। একসাথে চারজন কিভাবে কি করে দেখতে হবে। এই সুযোগ তো আর সব সময় পাব
ও না! ফাহাদ আর চয়ন একটু ভেবে রাজি হলো। কিন্তু শরীফ বলল, সে কিছুতেই রাজি নয়। সে চলে যাবে। আমি শরীফকে বাসার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে গেলাম। দরজার সামনে এসে হঠাত কি মনে করে শরীফ রাজি হয়ে গেলো। আমি তখন প্রচন্ড উত্তেজিত মনে মনে। চারজন মানুষের কামলীলা হবে আজ আমার বাসায়।
শরীফকে নিয়ে রুমে ঢুকে দেখি চয়ন আর ফাহাদের চার হাত এক করা, সেই সাথে দুজনের দুই ঠোঁট। ওরা কাল বিলম্ব করতেও রাজি নয় দেখছি! আমি শরীফের চোখের দিকে তাকালাম, শরীফ আমার দিকে। বাসায় কেউ ছিল না, তাই দরজা লাগানোর দরকার হলো না। জড়িয়ে ধরলাম শরীফকে। শরীফও সাড়া দিল। ওদিকে চয়ন আর ফাহাদ ততোক্ষনে একে অপরের কাপড় খোলায় ব্যস্ত। আমি আর শরীফও দেরি করলাম না। খুলে ফেললাম একে অপরের প্যান্ট আর টি শার্ট। আমার রুমের খাটটা নেহায়েত ছোট ছিল না। চারজন মানুষ অনায়াসেই শোয়া যায়। শরীফকে নিয়ে বিছানায় চলে গেলাম। চারটি উলঙ্গ দেহ ধীরে ধীরে মেতে উঠলো আদিম উন্মত্ততায়। শরীফকে শান্ত করলাম তাড়াতাড়িই। সে তখন নিথর হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। ওদিকে ফাহাদ আর চয়ন যে খুব পারদর্শী সেটা বুঝতে পারলাম। ফাহাদকে নিচে শুইয়ে চয়ন তার বিশেষ অঙ্গের উপর চড়ে বসেছে। ব্যাপারটা খুব আকর্ষণীয় মনে হলো আমার কাছে। আমি হা করে তাকিয়ে চয়নের কান্ডকীর্তি দেখছিলাম। শরীরটায় আগুন তো ধরেই ছিল, কিন্তু সে আগুন শরীফের পক্ষে মেটানো সম্ভব হয়নি। তাই খুব আফসোস হতে লাগলো। ইশ! আমি যদি চয়নকে পেতাম! চয়ন হয়তও বুঝতে পারলো আমার মনের কথা। বসা অবস্থায়ই আমার বিশেষ অঙ্গে হাত দিয়ে টেনে আমাকে ওর কাছে নিয়ে গেলো। আমি তখন আর আমার মাঝে নেই। বলা বাহুল্য তিনজনের মধ্যে চয়নের শারীরিক গঠনই ছিল সবচেয়ে নজর কাড়া। পাতলা, লম্বা, আর ছিমছাম গড়নের ফরসা একটা লোমহীন শরীর। আমি কাছে যেতেই চয়ন আমার বিশেষ অঙ্গটা মুখে পুরে নিলো। আমি আবেগের আবেশে চোখ দুটি বন্ধ করে ফেললাম। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেড়িয়ে এলো “আহ!” চয়ন বুঝতে পারলো সে আমাকে ঠিকভাবেই কাবু করতে পারছে। তাই মুখের কারুকাজ দেখাতে মোটেই কুন্ঠাবোধ করলো না সে।
ওদিকে ফাহাদ নিচে শুয়ে শুয়ে মজা লুটছিল। হঠাত আমাকে এভাবে শব্দ করতে দেখে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, আমাকে সরিয়ে দিয়ে চয়নকে জোর করে কাছে টেনে এনে কাম রসে ভিজিয়ে দিল নিজেকে আর চয়নকে। চয়ন কিছুক্ষণ লেপ্টে থাকলো ফাহাদের শরীরের সাথে। শরীফ আর ফাহাদ গেলো ওয়াশরুমে নিজেদের পরিষ্কার করতে। চয়ন বিছানা থেকে উঠে এসে আমার গায়ে হাত রাখলো, বুঝতে পারলাম ফাহাদকে দিয়ে তার কার্যসিদ্ধি হয়নি। আমার সাহায্য দরকার। আমি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। চয়নকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে অকে এলোপাথাড়ি চুমু খেতে লাগলাম। চয়ন পাগলের মতো আহ্ উহ্ শব্দ করে আমাকে উৎসাহ দিতে লাগলো পুর্নোদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। এগিয়ে গেলাম চয়নের দিকে চয়নের দুই পা আমার কাঁধে তুলে নিয়ে ওর বুকের উপর শুয়ে পরলাম সন্তর্পনে, নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়ে ওকে আদর করতে লাগলাম প্রচন্ড উত্তেজনায়। কখন যে দুজন একে অপরের মাঝে মিশে গিয়েছিলাম বুঝতেই পারলাম না। মিনিট পাঁচেক পর হঠাত চয়ন আমাকে জড়িয়ে ধরলো খুব শক্ত করে। পেটের উপর ভেজা ভেজা লাগলো, আমিও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। চয়নের সাথে সাথে আমিও ছেড়ে দিলাম নিজের কামরস, চয়নের দেহ অভ্যন্তরে। চয়নের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। আমিও হাসলাম। শুধু চয়নকে পরিতৃপ্ত করতে পেরেছি বলে নয়, নিজেও পরিতৃপ্ত হয়েছি দেখে।
এরপর আমাদের চারজনের মাঝে আরো অনেকবার অনেক কিছু হলো। কিন্তু কেন যেন আমি চয়নকে অন্যদের সাথে শেয়ার করতে পারতাম না। একদিন বুঝাতেও চাইলাম, পারলাম না। দেখলাম একা আন্তরিকভাবে কিছু করার চেয়ে সবার সাথে খোলামেলাভাবে সব কিছু করার দিকেই ওর আগ্রহ। তাই আর বাধ সাধলাম না।
কয়েকমাস এভাবেই চলল। আমি কেমন যেন অতিষ্ট হয়ে উঠলাম দেশে থেকে। সিদ্ধান্ত নিলাম ইন্ডিয়া যাওয়ার। শুরু হলো আমার জীবনের নতুন এক অধ্যায়।
পরদিন বিকেলের দিকে ফোন দিলাম।
- হ্যালো...
- হ্যালো, কে বলছেন?
- এটা কি তুষারের নাম্বার? আউয়াল আমাকে আপনার নাম্বারটা দিয়েছে।
- রং নাম্বার।
মুখের উপর ফোনটা কেটে দিল। অবাক, খুশি দুটাই হলাম। অবাক হলাম এটা ভেবে যে ছেলেটা নিজের নাম্বার আউয়ালকে দিয়েও কেন আমাকে না চেনার ভান করছে? আর খুশি হলাম এটা ভেবে যে ছেলেটা হয়তো আউয়ালকে নাম্বারটা দেয়ার পর থেকে রীতিমত বিভিন্ন মানুষের ফোন পেয়ে পেয়ে অতিষ্ট, তাই সবাইকে এভয়েড করছে।
রাত ১১ টায় তুষারের নাম্বার থেকে মিসড কল এলো। কল ব্যাক করলাম।
- কি? এবার চিনতে পেরেছেন?
- হুম।
- আউয়ালের সাথে কথা হয়েছে?
- জ্বি।
- ভালো আছেন?
- জ্বি।
- এভাবে হু হা আর জ্বি জ্বি করলে কিভাবে হবে?
- তাহলে কি বলবো?
- আপনার কথা বলেন, শুনি
- আমার কোন কথা নাই। দেখা করবেন?
এভাবে সরাসরি যে তুষার নামের ছদ্মনামি মানুষটা দেখা করার কথা বলবে, সেটা ভাবিনি। দেখা করতে চাইলাম। তুষার তার মেসের ঠিকানা দিল। যেয়ে যে মানুষটাকে দেখলাম তাকে দেখে আমার যৌনক্ষুধা নিমিষেই ক্ষুধামন্দায় পরিণত হলো। ছোটখাট, মোটাসোটা একটা ছেলে। যেভাবে আমাকে রুমে ঢুকিয়ে এক ঝটকায় নিজের লুঙ্গির গিঁটটা খুলে ফেলল, আমি রীতিমত ভয়ই পেয়ে গেলাম। এরপর নিজের উলঙ্গ দেহটা নিয়ে আমার পাশে এসে বসল তুষার (যার আসল নামটা আমি আজো জানিনা।) বসেই আমার বিশেষ জায়গায় হাত দিয়ে দিল। আমি রীতিমত অপ্রস্তুত ছিলাম, ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুই বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। হঠাত বুঝতে পারলাম তুষার আমার প্যান্টের বেল্ট আর চেন খুলে ফেলেছে। তুষারের হাত ততক্ষনে আমার আন্ডারওয়্যার খুলতে ব্যস্ত। আমি খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেললাম। কিন্তু তুষার ততক্ষনে তার কার্যসিদ্ধি করে ফেলেছে অনেকখানি। আমি পুরোপুরি উত্তেজিত। অনেক ইচ্ছা সত্ত্বেও নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। ক্ষুধার্ত ছিলাম, সেটাও একটা কারন হতে পারে। যা হবার হলো। তুষারের হয়তো আমাকে ভালো লেগেছে, কিভাবে বুঝলাম? আমার থেকে কোন টাকা নিলো না সে। টাকা চাইলেও অবশ্য আমি না করতাম না। চলে এলাম তুষারের মেস থেকে, কিন্তু প্রচন্ড একটা বিরক্তি কাজ করছিলো আমার মাঝে। এই প্রথম কারো সাথে প্রেমহীন কামে লিপ্ত হলাম। খুব রাগ লাগছিল নিজের উপর, কেন যে আসলাম? কিন্তু শারীরিক একটা প্রশান্তিও পাচ্ছিলাম ভেতরে ভেতরে। এ যেন এক মিশ্র অনুভূতি, তোকে বলে বোঝাতে পারবো না।
এর কিছুদিন পর আবার রমনায় গেলাম, উদ্দেশ্য আউয়ালের সাথে দেখা করা। দেখা পেয়েও গেলাম তার। আমাকে দেখেই যুদ্ধ জয়ের হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো আমার কাছে।
- কি? কেমুন মজা পাইলেন?
- মজা তো মনে হয় আমার চেয়ে তুমিই পেয়েছো বেশি।
- হা হা হা!
- হাসছো যে?
- আফনেরে বোকা বানাইতাম ফারছি, হেল্লাইগা হাসতাছি।
- হুম ভালো।
- আহেন বইসা কতা কই।
- হুম চলো। কথা বলতেই তো এলাম।
- আফনের লগে কতা কইলে খুব ভালা লাগে। আফনে অনেক বালা মানুষ।
আউয়ালের সাথে বসে পড়লাম একটা বেঞ্চে।
- আউয়াল, তোমার খারাপ লাগে না এসব করতে?
- আগে লাগতো, অহন আর লাগে না।
- কেন?
- প্যাটের দায় যে কি জিনিস আফনেরা বড়লোকরা হেইডা বুজবেন না বাইজান।
- তোমার বাবা নেই? কিছু করে না?
- বাপ মরছে অনেক আগেই। মায়ে ঝিয়ের কাম করে। বড় বইন্ডার বিয়া দিছিলাম এক হিরুইঞ্চির লগে, হেই হালার পুত আমার বইনেরে তো দেহেই না, উলটা আমগো বাড়িত আইয়া ট্যাকা লইয়া যায় মার থোন। আর আকাইম্মা বড় ভাই একখান আছে, হেও মস্তানি কইরা অহন জেলের ভাত খাইতাছে। ভালাই অইছে, একজনের পেট তো কমছে!
- তাহলে তোমাকেই পরিবারের দেখাশোনা করতে হয়!
- হ! শইলডা অনেক কাম দিছে অভাবের সময়।
- মানে?
- ছোড বেলা থেইকাই কেমুন জানি মাইয়া মাইয়া আছিলাম। বয়স তহন কতো হইবো? বারো কি তেরো! আফার সুনু, পাউডার আর লিপিস্টিক লাগাইতাম চুরি কইরা। কাজল দিতে খুব ভালা লাগতো। মায় আর আফায় খুব বকতো, কিন্তু আমি তাও চুরি কইরা লাগাইতাম এইগুলান। লুকায়া লুকায়া একদিন শাড়িও পরছিলাম। হাইরে মাইর খাইছি হেই দিন! অহনো মনে আছে। বাড়িত থোন পলায়া গেছিলাম। আমগো বাড়ির পাশেই আছিল আত্রাই নদী। নদীর পারে বইয়া অনেক কানছি। সেই সময় নদীর পাশ দিয়া যাইতেছিল পাশের বাড়ির আক্কাছ ভাই। আমারে কানতে দেইখা পাশে বইয়া খুব আদর করলো। জিগাইলো আমি কান্দি ক্যা। কইলাম মায়ে মারছে আফার লিপিস্টিক দিছি দেইখা। আক্কাছ ভাই কইলো লিপিস্টিক দিলে নাকি আমারে খুব সুন্দার দেখা যায়। কইলো আমারে একখান লিপিস্টিক কিন্যা দিবো। এরপর আমারে কইলো হেগো বাড়িত যাইতে। আমিও গেলাম। হেগো বাড়িত কেউ আছিল না। বাড়িত যাইয়াই আক্কাছ ভাই আমারে খুব আদর করতে লাগলো হের রুমে নিয়া। হের লুঙ্গিডা খুইল্যা ফালাইলো গার থোন। আমার লুঙ্গিও খুইলা দিল। আমি কিছু বুঝতাছিলাম না। আক্কাছ ভাই আমার সারা গায়ে অনেক আদর দিল। আমার খুব ভালা লাগতেছিল। এরপর সরিষার তেলের বোতল নিল টেবিলের উপরের থেইকা। হের ধোনের মধ্যে লাগাইলো আচ্ছা মতোন। হেরপর আমার দুই ঠ্যাং হের দুই কাঁধে তুইলা আমার পাছার ফুটার মধ্যে হের ধোন...
- আউয়াল হয়েছে, থাক আর বলতে হবে না।
- হেইদিন খুব রক্ত বাইর হইছিল। কানতে কানতে বাড়িত আইছিলাম। মা আর আফায় মনে করছে আমি হেগো মাইরের কারনে কান্তাছি, তাই কিছু জিগায় নাই কেন কান্দি, আমিও আর কইতে পারি নাই শরমে। সারা শরিল বিষ করলো। রাইতে জ্বর আয়া পড়লো আমার। মা কবিরাজ ডাকলো। কবিরাজ আয়া জ্বরের অসুদ দিয়া গেলো। এক সপ্তা পর সুস্থ হইলাম।
- তোমার মাকে বলা উচিত ছিল আউয়াল।
- কই নাই আরেক কারনে।
- কি কারন?
- আমার কাছে আক্কাছ ভাইরে ম্নে ধরছিল। হে আমার লগে যা যা করছে আমার খুব ভালা লাগছে। মায়েরে কইয়া আক্কাছ ভাইয়ের আদর থেইকা বঞ্চিত হইতে চাই নাই।
- হুম। বুঝলাম।
- আক্কাছ ভাই আমার মাই দুইডা খুব সুন্দর কইরা চুষত আর টিপত। আমার খুব মজা লাগতো জানেন? পরথম দিন ব্যাথা পাইছি, কিন্তু হের পর থেইকা অনেক সুখ পাইছি
কয়দিন পর দেহি আমার বুক হইতাছে মাইয়াগো লাহান। পরথমে ভাবছিলাম আক্কাছ ভাইয়ের টিপ খাইয়া অইতাছে, কিন্তু পরে দেহি দুধের বোটাও আইতাছে মাইয়াগো বুকের লাহান। আমার গলাও দেহি কেমুন যেন ভাঙ্গা ভাঙ্গা হইয়া গেলো।
- তারপর?
- মায়ে বুঝলো হের ঘরে দুই পোলা আর এক মাইয়া না; এক পোলা, এক মাইয়া আর এক না পোলা না মাইয়া জন্মাইছে।
- মানে?
- মানে মায়ে বুঝলো যে আমি হিজড়া।
- তুমি হিজড়া?
- হ! দেহেন না গলায় গামছা ঝুলায়া রাহি! কিন্তু অন্য হিজড়াগো মতন সাজগোজ করতে অহন আর ভাল্লাগে না। আর হিজড়াগো চাইতে পোলাগো দাম এই পার্কে বেশি। তাই পোলা সাইজা থাকলেই পয়সা বেশি পাওন যায়।
- হুম, বুঝলাম। আউয়াল এই টাকা কয়টা রাখো। আজ উঠতে হবে।
আউয়ালের হাতে দুইশ টাকা দিয়ে পার্ক থেকে বের হয়ে এলাম। মাথাটা ভনভন করছে। কি শুনলাম এসব এতক্ষণ!
আউয়ালের প্রতি একটা মায়া আগে থেকেই ছিল, কিন্তু মায়াটা সেদিনের পর থেকে আরো বেড়ে গেলো। সপ্তাহে একদিন হলেও যেতাম রমনায়, আর কিছু টাকা দিয়ে আসতাম ওর হাতে। এর মাঝে ইয়াহু মেসেঞ্জারে চ্যাট করতাম অনেকের সাথে। দেখা করতে চাইতো অনেকে। আমিও যে চাইতাম না, তা নয়। কিন্তু এবার আর ভুল করলাম না। অন্যদের বাসায় গেলাম না আগেরবারের মতো। বাসায় কেউ না থাকলে নিজের বাসায় দেখা করতে চাইতাম। কেউ রাজি হলো না। একদিন চ্যাট করছি একসাথে পাঁচ জনের সাথে। সবাইকেই বললাম যে আমার বাসা খালি। জানতাম না করবে, কিন্তু প্রথমে একজন রাজি হলো। আমি তো অবাক! এরপর দেখি আরো একজন, তারপর আরো একজন রাজি হলো বাসায় আসতে। আমি বুঝতে পারলাম না কি বলবো। তিনজনকেই বললাম বাসার কাছাকাছি এসে ফোন দিতে। ধরে নিয়েছিলাম যে কেউই হয়তো আসবে না, আর আসলেও হয়তো একজনই না হয় আসবে! কিন্তু তিনজনই আসলো। আমি পড়লাম বিপদে। কুল রাখি না শাম রাখি অবস্থা। যাইহোক তিনজনকেই একে একে বাসায় নিয়ে আসলাম। শরীফ, ফাহাদ আর চয়ন। আমাকে যে নাম বলেছিল তাই বললাম। তিনজনকে বাসায় নিয়ে এসে একসাথে বসলাম। বললাম, “আমাদের চারজনের উদ্দেশ্যই যেহেতু এক, আমরা কি একসাথে কাজটা করতে পারি?” আমার মাথা তখন পুরাই নতুন এক নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। একসাথে চারজন কিভাবে কি করে দেখতে হবে। এই সুযোগ তো আর সব সময় পাব
ও না! ফাহাদ আর চয়ন একটু ভেবে রাজি হলো। কিন্তু শরীফ বলল, সে কিছুতেই রাজি নয়। সে চলে যাবে। আমি শরীফকে বাসার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে গেলাম। দরজার সামনে এসে হঠাত কি মনে করে শরীফ রাজি হয়ে গেলো। আমি তখন প্রচন্ড উত্তেজিত মনে মনে। চারজন মানুষের কামলীলা হবে আজ আমার বাসায়।
শরীফকে নিয়ে রুমে ঢুকে দেখি চয়ন আর ফাহাদের চার হাত এক করা, সেই সাথে দুজনের দুই ঠোঁট। ওরা কাল বিলম্ব করতেও রাজি নয় দেখছি! আমি শরীফের চোখের দিকে তাকালাম, শরীফ আমার দিকে। বাসায় কেউ ছিল না, তাই দরজা লাগানোর দরকার হলো না। জড়িয়ে ধরলাম শরীফকে। শরীফও সাড়া দিল। ওদিকে চয়ন আর ফাহাদ ততোক্ষনে একে অপরের কাপড় খোলায় ব্যস্ত। আমি আর শরীফও দেরি করলাম না। খুলে ফেললাম একে অপরের প্যান্ট আর টি শার্ট। আমার রুমের খাটটা নেহায়েত ছোট ছিল না। চারজন মানুষ অনায়াসেই শোয়া যায়। শরীফকে নিয়ে বিছানায় চলে গেলাম। চারটি উলঙ্গ দেহ ধীরে ধীরে মেতে উঠলো আদিম উন্মত্ততায়। শরীফকে শান্ত করলাম তাড়াতাড়িই। সে তখন নিথর হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। ওদিকে ফাহাদ আর চয়ন যে খুব পারদর্শী সেটা বুঝতে পারলাম। ফাহাদকে নিচে শুইয়ে চয়ন তার বিশেষ অঙ্গের উপর চড়ে বসেছে। ব্যাপারটা খুব আকর্ষণীয় মনে হলো আমার কাছে। আমি হা করে তাকিয়ে চয়নের কান্ডকীর্তি দেখছিলাম। শরীরটায় আগুন তো ধরেই ছিল, কিন্তু সে আগুন শরীফের পক্ষে মেটানো সম্ভব হয়নি। তাই খুব আফসোস হতে লাগলো। ইশ! আমি যদি চয়নকে পেতাম! চয়ন হয়তও বুঝতে পারলো আমার মনের কথা। বসা অবস্থায়ই আমার বিশেষ অঙ্গে হাত দিয়ে টেনে আমাকে ওর কাছে নিয়ে গেলো। আমি তখন আর আমার মাঝে নেই। বলা বাহুল্য তিনজনের মধ্যে চয়নের শারীরিক গঠনই ছিল সবচেয়ে নজর কাড়া। পাতলা, লম্বা, আর ছিমছাম গড়নের ফরসা একটা লোমহীন শরীর। আমি কাছে যেতেই চয়ন আমার বিশেষ অঙ্গটা মুখে পুরে নিলো। আমি আবেগের আবেশে চোখ দুটি বন্ধ করে ফেললাম। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেড়িয়ে এলো “আহ!” চয়ন বুঝতে পারলো সে আমাকে ঠিকভাবেই কাবু করতে পারছে। তাই মুখের কারুকাজ দেখাতে মোটেই কুন্ঠাবোধ করলো না সে।
ওদিকে ফাহাদ নিচে শুয়ে শুয়ে মজা লুটছিল। হঠাত আমাকে এভাবে শব্দ করতে দেখে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, আমাকে সরিয়ে দিয়ে চয়নকে জোর করে কাছে টেনে এনে কাম রসে ভিজিয়ে দিল নিজেকে আর চয়নকে। চয়ন কিছুক্ষণ লেপ্টে থাকলো ফাহাদের শরীরের সাথে। শরীফ আর ফাহাদ গেলো ওয়াশরুমে নিজেদের পরিষ্কার করতে। চয়ন বিছানা থেকে উঠে এসে আমার গায়ে হাত রাখলো, বুঝতে পারলাম ফাহাদকে দিয়ে তার কার্যসিদ্ধি হয়নি। আমার সাহায্য দরকার। আমি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। চয়নকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে অকে এলোপাথাড়ি চুমু খেতে লাগলাম। চয়ন পাগলের মতো আহ্ উহ্ শব্দ করে আমাকে উৎসাহ দিতে লাগলো পুর্নোদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। এগিয়ে গেলাম চয়নের দিকে চয়নের দুই পা আমার কাঁধে তুলে নিয়ে ওর বুকের উপর শুয়ে পরলাম সন্তর্পনে, নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়ে ওকে আদর করতে লাগলাম প্রচন্ড উত্তেজনায়। কখন যে দুজন একে অপরের মাঝে মিশে গিয়েছিলাম বুঝতেই পারলাম না। মিনিট পাঁচেক পর হঠাত চয়ন আমাকে জড়িয়ে ধরলো খুব শক্ত করে। পেটের উপর ভেজা ভেজা লাগলো, আমিও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। চয়নের সাথে সাথে আমিও ছেড়ে দিলাম নিজের কামরস, চয়নের দেহ অভ্যন্তরে। চয়নের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। আমিও হাসলাম। শুধু চয়নকে পরিতৃপ্ত করতে পেরেছি বলে নয়, নিজেও পরিতৃপ্ত হয়েছি দেখে।
এরপর আমাদের চারজনের মাঝে আরো অনেকবার অনেক কিছু হলো। কিন্তু কেন যেন আমি চয়নকে অন্যদের সাথে শেয়ার করতে পারতাম না। একদিন বুঝাতেও চাইলাম, পারলাম না। দেখলাম একা আন্তরিকভাবে কিছু করার চেয়ে সবার সাথে খোলামেলাভাবে সব কিছু করার দিকেই ওর আগ্রহ। তাই আর বাধ সাধলাম না।
কয়েকমাস এভাবেই চলল। আমি কেমন যেন অতিষ্ট হয়ে উঠলাম দেশে থেকে। সিদ্ধান্ত নিলাম ইন্ডিয়া যাওয়ার। শুরু হলো আমার জীবনের নতুন এক অধ্যায়।
নীল মানবঃ পর্ব - ০২
বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা অরণ্য যুবরাজ এর লেখা ধারাবাহিক গল্প
_____________________________________________
অনেকক্ষণ হয়ে গেল ।
ইমন, নীল কেউ কারো সাথে কোন কথা বলছে না ।
দুজনের মাঝে নিরবতার জন্য বিরক্তি কিংবা পথের ক্লান্তি দায়ী নয় ।
বরং হালকা শীত শীত ভাব আর অর্থহীন এক ধরনের ভালো লাগা দুজনের মনে কাজ করছে ।
নীল কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছে । টের পায়নি সে ।
যখন ঘুম ভাঙল তখন ঘণ্টা খানেক পেরিয়ে গেছে ।
বাইরে এখন ঝকঝকে রোদ ।
- কি ব্যাপার ! ঘুম ভাঙল ?
- হুম । কখন যে ঘুমালাম ! বুঝতে পারিনি ।
- সামনে কোথাও নামবেন ?
- বুঝলেন কি করে ! আমার যে খিদে পেয়েছে ?
- আরে নাহ ! আমি আসলে সেটা মিন করে বলিনি ।
ইমন হালকা লজ্জা পেল ।
দুজনে সামনেই একটা হোটেলে পেয়ে গেল ।
গাড়ি থেকে নামতেই নীল দৌড়ে গেল ।
হোটেলের সামনে ফুটে থাকা কতোগুলো গাঁদা ফুলের দিকে ।
ইমন একটা সিগারেট ধরিয়ে নীল এর দিকে তাকিয়ে আছে ।
নীল এর হাতে একটা বড়সড় গাঁদা ফুল ।
ও হাত দিয়ে ফুলটাকে এমন ভাবে আদর করছে মনে হচ্ছে ফুলটা একটা ছোট খরগোশ ।
- আপনি ফুল খুব ভালবাসেন ?
- হুম । আই লাভ ফ্লাওয়ারস ।
- সেতো দেখতেই পেলাম ।
- দেখার জন্য ধন্যবাদ । আজকাল দেখার মত চোখও সবার থাকে না ।
- কথায় আপনার সাথে পারা যাবে না ভাই ।
- থাক ইমন ভাই । আর কথা বলে কাজ নেই । খিদেতে আমার পেটে ইঁদুর দৌড়ুচ্ছে । কিছু খাওয়া দরকার ।
যে হোটেলটায় ওরা ঢুকল ওটা বেশ ছোট ।
বেশ নোংরা ।
চারপাশে মাছি ভন ভন করছে ।
যে ওয়েটার গুলো আছে তাদের কাঁধে ঝুলানো গামছা কতদিন ধুয় না কে জানে !
ইমন নীল এর দিকে তাকাল ।
- আপনি কি এখানে খেতে পারবেন ?
- কেন পারব না !
- না । হোটেল টা যে নোংরা ! তাই বললাম ।
- শুনুন, আমি কিন্তু ঢাকা ভার্সিটির হল লাইফ পার করে এসেছি । ইটালিয়ান হোটেল এ খাওয়ার অভ্যাসও আছে ।
- ইটালিয়ান হোটেল মানে ? ইমন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ।
- হা হা হা । আমাদের হল থেকে একটু দূরে এক মামা ভাত বিক্রি করত । সেখানে ইটের উপর বসে বসে লোকজন ভাত খেত । আমরা বন্ধুরা মজা করে মাঝে মাঝে সেখানেও খেতাম !
- বাহ ! আসলে ঢাকা ভার্সিটির হল লাইফ অনেক মজার । তাই না ?
- শুধু ঢাকা ভার্সিটি না , সব হল লাইফ দারুন এঞ্জয়েবল ।
একটা টেবিলে বসল ওরা দুজন ।
ইমন নীল দিকে তাকিয়ে বলল,
- কি খাবেন ? ব্যাঙ নাকি নাগিন ?
ইমনের কথায় নীল বেশ মজা পেল । ও দ্বিগুণ উৎসাহে বলল,
- ব্যাঙ আগে চেখে দেখেছি । এবার নাগিনের ভুনা হলে মন্দ হয় না !
ব্যাঙ অথবা নাগিন কিছুই পাওয়া গেল না ।
ওরা ভাত খেল মুরগি দিয়ে । কড়া ঝাল মশলা দেয়া ঝোল ।
এমন ঝাল যে দুজনের চোখ দিয়েই টপ টপ করে পানি বেরুচ্ছে ।
থেকে থেকে দুজনেই মুখ দিয়ে, জিভ দিয়ে ফুঁ দিচ্ছে ।
খাওয়া দাওয়া শেষে নীল বলল,
- আর হোটেল পেলেন না ভাই ! ঝালে আমার তালু পর্যন্ত জ্বলে যাচ্ছে !
- আপনারও জ্বলে নাকি । হা হা হা । চলুন যাওয়া যাক ।
নীল এবার আর কথা বাড়াল না ।
চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল ।
আধ ঘণ্টা পর গাড়ি হঠাৎ কোঁ কোঁ বিকট আওয়াজ দিল ।
থেমে গেল ।
- কি ব্যাপার ! ইমন ভাই । কোন সমস্যা ?
- কি জানি । বুঝত পারছি না । দেখি । কি অবস্থা গাড়ির । স্টার্ট নিচ্ছে না !
গাড়িটা যে জায়গায় নষ্ট হয়েছে তার একপাশেই ছোট একটা খালের মত চলে গেছে ।
এরপাশে উঁচু টিলা ।
নীল মনে মনে বলল, বাহ । দারুন জায়গা । ও ছোট বাচ্চাদের মত খালের দিকে ছুটে গেল ।
পানিতে ছোট ছোট মাছ । জল পোকা । ও ওদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ।
আর এদিকে ইমন গাড়ির বনেট খুলে কি নিয়ে যেন টানা টানি করছে ।
নীল এবার ইমনের দিকে ফিরে দূর হতে চেঁচিয়ে বলল,
- কি সমস্যা । কিছু বুঝতে পেরেছেন ?
- বুঝতে পারছি না ।
- গাড়ির কিছু বুঝেন ? গাড়ি কেন খারাপ হয় ?
- ভাবছি, আপনার কাছ থেকে ট্রেনিং নিব ।
নীল চুপ মেরে গেল ।
ইমন কি একটু রেগে গেল !
- গাড়িটা ঠিক করতে পারছি না ।
- ও গড । এখন কি হবে ?
- কি আর হবে ? দেখি কি ব্যবস্থা করা যায় !
ভাগ্য ভালো কাছেই একটা গ্যারেজ পাওয়া গেল । গাড়ি মেরামত করার ।
কিন্তু এখানেও সমস্যা । যে গাড়ি ঠিকঠাক করে সে আজ নাই । পাশের গ্রামে গেছে । বেড়াতে ।
আসতে আসতে কাল সকাল ।
এসব শুনে নীলের মাথায় হাত !
- এখন কি হবে ?
- আপনি বারবার এই একটা বাক্য বলবেন না প্লিজ । এমনিতেই আমার মাথা গরম !
- সরি ।
- হুম । শুনুন, রাতটা আশে পাশের কোন বাড়িতে কাটাতে হবে ।
- কোথায় ?
- আমি এই গ্যারেজের মালিকের সাথে কথা বলেছি । উনি বলেছেন উনার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করবেন ।
------------------------------------------
গ্যারেজের মালিকের বাড়িতেই ওদের থাকতে হল শেষ পর্যন্ত ।
বাড়িতে দুটো ঘর ।
ওদের থাকার ঘরটা উঠোনের এক কোনায় । আলাদা ।
একচালা ঘর ।
বাড়িতে গ্যারেজের মালিক আর তার বউ থাকেন ।
এখন বউ নেই । বউ বাপের বাড়ি গেছে ।
ওদের ঘরের পেছনে অনেকগুলো কলাগাছ ।
ঘরে আসবাব বলতে তেমন কিছু নেই ।একটা চকি । নতুন চাদর বিছানো । নেপথলিনের কড়া গন্ধ টের পাওয়া যাচ্ছে ।
জানালার পাশ ঘেঁষে একটা টেবিল ।
তাতে সাদা ফুলতোলা নকশা করা কভার দেয়া ।
বিছানার পাশ ঘেঁষে দেয়ালে একটা হাতের কাজ এর নকশা করা রুমাল বাঁধানো ।
নীল অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ।
নকশা করা রুমালটাতে দুইটা পাখি ।
আর মাঝখানে লেখা ‘ভুলনা আমায়’।
বিছানার দিকে তাকিয়েই নীল এর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ।
দুজন শোয়ার জন্য বড্ড ছোট ।
ইমন ঘরে ঢুকেই ধপ করে শুয়ে পড়ল ।
নীল কাঁধের ব্যাগ টেবিলে রেখে বাইরে বেরুল ।
মানুষটার কোন কাণ্ড জ্ঞান নাই ।
ঘরে ঢুকেই কোন কথা নাই, বার্তা নাই । বিছানায় ধপাস ।
চারদিকে আবছা আঁধার । ঝিঁঝিঁর ডাক, বয়ে যাওয়া নদীর শব্দ, নানারকম পোকার শব্দ !
নীল এর কেমন একটা মোহ মোহ ভাব লাগছে ।
- কি ব্যাপার ! আপনি ঘুমাবেন না !
পেছন থেকে ইমন জোর গলায় বলল ।
- ও আপনি ?
- ভয় পেলেন নাকি !
- আমাকে দেখে কি ভিতু মনে হয় ?
- আমি কি সেটা বলেছি ?
- আমার আজ ঠিক ঘুম আসছে না ।
- কেন ? বেশি টেনশন করছেন ?
- না । টেনশন না । ভালো লাগছে । এরকম পরিবেশে আমি কখনও থাকিনি ।
- মানুষ নিজেও জানে না তাকে কখন কোথায় কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় । তাই না !
- আমি আসলে এজন্য বলছি না ইমন । আসলে ছোটবেলা থেকেই অনেক জায়গায় ঘুরে বেরাতাম আমি । বাবার সাথে । বন্ধুদের সাথে । অনেক জায়গায় রাতে থেকেছি । কিন্তু আজকের রাতটা বড্ড বেশি আলাদা লাগছে । কেমন একটা মায়া মায়া ।
- বাহ বা । আপনি দেখছি এখন কবিতা বলা শুরু করবেন ?
- না সে ভয় পাবেন না ! কথায় কথায় কবিতা বলার অভ্যাস আমার নাই ! কবিতা আবেগের ব্যাপার ।
- কি জানি নীল । আমি আসলে এতটা বুঝে উঠতে পারি না । এসব আবেগ টাবেগ আমার কম । এসব আমার ধাঁতে নেই ।
- না থাকলেই ভালো । জীবনে কষ্ট কম পাবেন ।
- আমি কি একটা সিগারেট খেতে পারি ।
- আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন ?
- না । সিগারেট এর ধোঁয়ায় আপনার রাতের মায়ার যদি কোন ক্ষতি হয় ! তাই জিজ্ঞেস করলাম ।
- হা হা হা হা । মাঝে মাঝে আপনি অনেক রসিকতা করেন ইমন । তবে সিগারেট এর ধোঁয়ায় রাতের মায়ার ক্ষতির চাইতে আপনার গোলাপি হৃদয়ের ক্ষতি অনেক বেশিই হবে । তাই নয় কি ?
- ভাই । আমি আপনার সাথে তর্কে জিততে পারব না ।
ইমন হাত জোর করে বলল ।
এমন সময় আবার ঝুপ করে বৃষ্টি শুরু হল ।
ওরা দুজন দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল ।
_____________________________________________
ঘড়িতে এখন ১০ টা বাজে ।
চারদিকে শুধুই ঝম ঝম বৃষ্টির শব্দ ।
ঠাণ্ডাও বেড়ে চলেছে ।
ইমন অনেক আগেই বিছানায় ঘুমিয়ে গেছে ।
নীল বসে আছে । চেয়ারে ।
হ্যারিকেন এর লালচে আলোর আবছা পরিবেশ ঘরজুড়ে ।
বিছানায় যেতে কেমন একটা সংকোচ হচ্ছে তার ।
নীল খুব ভালো করেই জানে সে সমপ্রেমী । তার উপর এমন একটা বৃষ্টির রাত ।
ইমন এর মত ভালোলাগার পুরুষের সাথে এক বিছানায়, এক কাঁথার নিচে শোয়া ।
নীল এক পা, দু পা করে এগুচ্ছে । বিছানার দিকে ।
রাত বাড়ছে । বাড়ছে বৃষ্টি । আর বাড়ছে নীল এর বুকের ধুক ধুক শব্দ ।
____________________________________________________________
(চলবে)
_____________________________________________
অনেকক্ষণ হয়ে গেল ।
ইমন, নীল কেউ কারো সাথে কোন কথা বলছে না ।
দুজনের মাঝে নিরবতার জন্য বিরক্তি কিংবা পথের ক্লান্তি দায়ী নয় ।
বরং হালকা শীত শীত ভাব আর অর্থহীন এক ধরনের ভালো লাগা দুজনের মনে কাজ করছে ।
নীল কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছে । টের পায়নি সে ।
যখন ঘুম ভাঙল তখন ঘণ্টা খানেক পেরিয়ে গেছে ।
বাইরে এখন ঝকঝকে রোদ ।
- কি ব্যাপার ! ঘুম ভাঙল ?
- হুম । কখন যে ঘুমালাম ! বুঝতে পারিনি ।
- সামনে কোথাও নামবেন ?
- বুঝলেন কি করে ! আমার যে খিদে পেয়েছে ?
- আরে নাহ ! আমি আসলে সেটা মিন করে বলিনি ।
ইমন হালকা লজ্জা পেল ।
দুজনে সামনেই একটা হোটেলে পেয়ে গেল ।
গাড়ি থেকে নামতেই নীল দৌড়ে গেল ।
হোটেলের সামনে ফুটে থাকা কতোগুলো গাঁদা ফুলের দিকে ।
ইমন একটা সিগারেট ধরিয়ে নীল এর দিকে তাকিয়ে আছে ।
নীল এর হাতে একটা বড়সড় গাঁদা ফুল ।
ও হাত দিয়ে ফুলটাকে এমন ভাবে আদর করছে মনে হচ্ছে ফুলটা একটা ছোট খরগোশ ।
- আপনি ফুল খুব ভালবাসেন ?
- হুম । আই লাভ ফ্লাওয়ারস ।
- সেতো দেখতেই পেলাম ।
- দেখার জন্য ধন্যবাদ । আজকাল দেখার মত চোখও সবার থাকে না ।
- কথায় আপনার সাথে পারা যাবে না ভাই ।
- থাক ইমন ভাই । আর কথা বলে কাজ নেই । খিদেতে আমার পেটে ইঁদুর দৌড়ুচ্ছে । কিছু খাওয়া দরকার ।
যে হোটেলটায় ওরা ঢুকল ওটা বেশ ছোট ।
বেশ নোংরা ।
চারপাশে মাছি ভন ভন করছে ।
যে ওয়েটার গুলো আছে তাদের কাঁধে ঝুলানো গামছা কতদিন ধুয় না কে জানে !
ইমন নীল এর দিকে তাকাল ।
- আপনি কি এখানে খেতে পারবেন ?
- কেন পারব না !
- না । হোটেল টা যে নোংরা ! তাই বললাম ।
- শুনুন, আমি কিন্তু ঢাকা ভার্সিটির হল লাইফ পার করে এসেছি । ইটালিয়ান হোটেল এ খাওয়ার অভ্যাসও আছে ।
- ইটালিয়ান হোটেল মানে ? ইমন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ।
- হা হা হা । আমাদের হল থেকে একটু দূরে এক মামা ভাত বিক্রি করত । সেখানে ইটের উপর বসে বসে লোকজন ভাত খেত । আমরা বন্ধুরা মজা করে মাঝে মাঝে সেখানেও খেতাম !
- বাহ ! আসলে ঢাকা ভার্সিটির হল লাইফ অনেক মজার । তাই না ?
- শুধু ঢাকা ভার্সিটি না , সব হল লাইফ দারুন এঞ্জয়েবল ।
একটা টেবিলে বসল ওরা দুজন ।
ইমন নীল দিকে তাকিয়ে বলল,
- কি খাবেন ? ব্যাঙ নাকি নাগিন ?
ইমনের কথায় নীল বেশ মজা পেল । ও দ্বিগুণ উৎসাহে বলল,
- ব্যাঙ আগে চেখে দেখেছি । এবার নাগিনের ভুনা হলে মন্দ হয় না !
ব্যাঙ অথবা নাগিন কিছুই পাওয়া গেল না ।
ওরা ভাত খেল মুরগি দিয়ে । কড়া ঝাল মশলা দেয়া ঝোল ।
এমন ঝাল যে দুজনের চোখ দিয়েই টপ টপ করে পানি বেরুচ্ছে ।
থেকে থেকে দুজনেই মুখ দিয়ে, জিভ দিয়ে ফুঁ দিচ্ছে ।
খাওয়া দাওয়া শেষে নীল বলল,
- আর হোটেল পেলেন না ভাই ! ঝালে আমার তালু পর্যন্ত জ্বলে যাচ্ছে !
- আপনারও জ্বলে নাকি । হা হা হা । চলুন যাওয়া যাক ।
নীল এবার আর কথা বাড়াল না ।
চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল ।
আধ ঘণ্টা পর গাড়ি হঠাৎ কোঁ কোঁ বিকট আওয়াজ দিল ।
থেমে গেল ।
- কি ব্যাপার ! ইমন ভাই । কোন সমস্যা ?
- কি জানি । বুঝত পারছি না । দেখি । কি অবস্থা গাড়ির । স্টার্ট নিচ্ছে না !
গাড়িটা যে জায়গায় নষ্ট হয়েছে তার একপাশেই ছোট একটা খালের মত চলে গেছে ।
এরপাশে উঁচু টিলা ।
নীল মনে মনে বলল, বাহ । দারুন জায়গা । ও ছোট বাচ্চাদের মত খালের দিকে ছুটে গেল ।
পানিতে ছোট ছোট মাছ । জল পোকা । ও ওদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ।
আর এদিকে ইমন গাড়ির বনেট খুলে কি নিয়ে যেন টানা টানি করছে ।
নীল এবার ইমনের দিকে ফিরে দূর হতে চেঁচিয়ে বলল,
- কি সমস্যা । কিছু বুঝতে পেরেছেন ?
- বুঝতে পারছি না ।
- গাড়ির কিছু বুঝেন ? গাড়ি কেন খারাপ হয় ?
- ভাবছি, আপনার কাছ থেকে ট্রেনিং নিব ।
নীল চুপ মেরে গেল ।
ইমন কি একটু রেগে গেল !
- গাড়িটা ঠিক করতে পারছি না ।
- ও গড । এখন কি হবে ?
- কি আর হবে ? দেখি কি ব্যবস্থা করা যায় !
ভাগ্য ভালো কাছেই একটা গ্যারেজ পাওয়া গেল । গাড়ি মেরামত করার ।
কিন্তু এখানেও সমস্যা । যে গাড়ি ঠিকঠাক করে সে আজ নাই । পাশের গ্রামে গেছে । বেড়াতে ।
আসতে আসতে কাল সকাল ।
এসব শুনে নীলের মাথায় হাত !
- এখন কি হবে ?
- আপনি বারবার এই একটা বাক্য বলবেন না প্লিজ । এমনিতেই আমার মাথা গরম !
- সরি ।
- হুম । শুনুন, রাতটা আশে পাশের কোন বাড়িতে কাটাতে হবে ।
- কোথায় ?
- আমি এই গ্যারেজের মালিকের সাথে কথা বলেছি । উনি বলেছেন উনার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করবেন ।
------------------------------------------
গ্যারেজের মালিকের বাড়িতেই ওদের থাকতে হল শেষ পর্যন্ত ।
বাড়িতে দুটো ঘর ।
ওদের থাকার ঘরটা উঠোনের এক কোনায় । আলাদা ।
একচালা ঘর ।
বাড়িতে গ্যারেজের মালিক আর তার বউ থাকেন ।
এখন বউ নেই । বউ বাপের বাড়ি গেছে ।
ওদের ঘরের পেছনে অনেকগুলো কলাগাছ ।
ঘরে আসবাব বলতে তেমন কিছু নেই ।একটা চকি । নতুন চাদর বিছানো । নেপথলিনের কড়া গন্ধ টের পাওয়া যাচ্ছে ।
জানালার পাশ ঘেঁষে একটা টেবিল ।
তাতে সাদা ফুলতোলা নকশা করা কভার দেয়া ।
বিছানার পাশ ঘেঁষে দেয়ালে একটা হাতের কাজ এর নকশা করা রুমাল বাঁধানো ।
নীল অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ।
নকশা করা রুমালটাতে দুইটা পাখি ।
আর মাঝখানে লেখা ‘ভুলনা আমায়’।
বিছানার দিকে তাকিয়েই নীল এর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ।
দুজন শোয়ার জন্য বড্ড ছোট ।
ইমন ঘরে ঢুকেই ধপ করে শুয়ে পড়ল ।
নীল কাঁধের ব্যাগ টেবিলে রেখে বাইরে বেরুল ।
মানুষটার কোন কাণ্ড জ্ঞান নাই ।
ঘরে ঢুকেই কোন কথা নাই, বার্তা নাই । বিছানায় ধপাস ।
চারদিকে আবছা আঁধার । ঝিঁঝিঁর ডাক, বয়ে যাওয়া নদীর শব্দ, নানারকম পোকার শব্দ !
নীল এর কেমন একটা মোহ মোহ ভাব লাগছে ।
- কি ব্যাপার ! আপনি ঘুমাবেন না !
পেছন থেকে ইমন জোর গলায় বলল ।
- ও আপনি ?
- ভয় পেলেন নাকি !
- আমাকে দেখে কি ভিতু মনে হয় ?
- আমি কি সেটা বলেছি ?
- আমার আজ ঠিক ঘুম আসছে না ।
- কেন ? বেশি টেনশন করছেন ?
- না । টেনশন না । ভালো লাগছে । এরকম পরিবেশে আমি কখনও থাকিনি ।
- মানুষ নিজেও জানে না তাকে কখন কোথায় কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় । তাই না !
- আমি আসলে এজন্য বলছি না ইমন । আসলে ছোটবেলা থেকেই অনেক জায়গায় ঘুরে বেরাতাম আমি । বাবার সাথে । বন্ধুদের সাথে । অনেক জায়গায় রাতে থেকেছি । কিন্তু আজকের রাতটা বড্ড বেশি আলাদা লাগছে । কেমন একটা মায়া মায়া ।
- বাহ বা । আপনি দেখছি এখন কবিতা বলা শুরু করবেন ?
- না সে ভয় পাবেন না ! কথায় কথায় কবিতা বলার অভ্যাস আমার নাই ! কবিতা আবেগের ব্যাপার ।
- কি জানি নীল । আমি আসলে এতটা বুঝে উঠতে পারি না । এসব আবেগ টাবেগ আমার কম । এসব আমার ধাঁতে নেই ।
- না থাকলেই ভালো । জীবনে কষ্ট কম পাবেন ।
- আমি কি একটা সিগারেট খেতে পারি ।
- আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন ?
- না । সিগারেট এর ধোঁয়ায় আপনার রাতের মায়ার যদি কোন ক্ষতি হয় ! তাই জিজ্ঞেস করলাম ।
- হা হা হা হা । মাঝে মাঝে আপনি অনেক রসিকতা করেন ইমন । তবে সিগারেট এর ধোঁয়ায় রাতের মায়ার ক্ষতির চাইতে আপনার গোলাপি হৃদয়ের ক্ষতি অনেক বেশিই হবে । তাই নয় কি ?
- ভাই । আমি আপনার সাথে তর্কে জিততে পারব না ।
ইমন হাত জোর করে বলল ।
এমন সময় আবার ঝুপ করে বৃষ্টি শুরু হল ।
ওরা দুজন দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল ।
_____________________________________________
ঘড়িতে এখন ১০ টা বাজে ।
চারদিকে শুধুই ঝম ঝম বৃষ্টির শব্দ ।
ঠাণ্ডাও বেড়ে চলেছে ।
ইমন অনেক আগেই বিছানায় ঘুমিয়ে গেছে ।
নীল বসে আছে । চেয়ারে ।
হ্যারিকেন এর লালচে আলোর আবছা পরিবেশ ঘরজুড়ে ।
বিছানায় যেতে কেমন একটা সংকোচ হচ্ছে তার ।
নীল খুব ভালো করেই জানে সে সমপ্রেমী । তার উপর এমন একটা বৃষ্টির রাত ।
ইমন এর মত ভালোলাগার পুরুষের সাথে এক বিছানায়, এক কাঁথার নিচে শোয়া ।
নীল এক পা, দু পা করে এগুচ্ছে । বিছানার দিকে ।
রাত বাড়ছে । বাড়ছে বৃষ্টি । আর বাড়ছে নীল এর বুকের ধুক ধুক শব্দ ।
____________________________________________________________
(চলবে)
সমকামী বিয়ে বৈধ যেসব দেশে
ঘর বাঁধার স্বপ্ন কি শুধু একটা ছেলে আর একটা মেয়েই দেখতে পারে ?
সমমনা দুজন পুরুষ বা নারী কি ভালবেসে একে অপরকে বিয়ে করতে পারে না ?
সমকামী বিয়ে ! এও কি সম্ভব !
অনেকের মাঝেই এই প্রশ্নগুলো মাথা চাড়া দেয় ।
উত্তর অনেকেই কিছুটা জানি । আবার কিছুটা অস্পষ্ট । বেশ একটা সন্দেহ কাজ করে সমকামী বিয়ে নিয়ে ।
কেউ কেউ আবার মনে মনে ভেবে বেড়ান সমকামী হয়েছ ভালো কথা ! তা বিয়ের আবার কি দরকার ! লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম আর সেক্স করলেই তো হয় ! তবে এতো কিছুর পরও পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কিছু দেশে এর মাঝেই স্বীকৃতি পেয়েছে সমকামী বিয়ে । সর্বশেষ তথ্য অনুসারে বর্তমান বিশ্বের মোট সতেরোটি দেশে সমকামী বিয়ে স্বীকৃতি পেয়েছে ।
দেশগুলো হল নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেন, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে, সুইডেন, পর্তুগাল, আইসল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ব্রাজিল, উরুগুয়ে, নিউজিল্যান্ড ,ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ড ।
এছাড়া মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র এর কিছু কিছু অংশে সমকামী বিয়ের স্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রদান এখনও আইনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ।
নেদারল্যান্ডস
নেদারল্যান্ডসই সর্বপ্রথম দেশ যারা ২০০১ সালে সমকামী বিয়েকে আইনগত ভাবে স্বীকৃতি দেয় । দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ১,৬৮,১৯,৫৯৫ এবং আয়তন ৪১,৫৪৩ বর্গ কিলোমিটার।দেশটিতে সমকামী বিয়ে বৈধ করার জন্য আন্দোলন শুরু হয় আশির দশকের মাঝামাঝিতে যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হেঙ্ক ক্রল । আয়তনের এই দেশের পার্লামেন্টে ২০০১ সালে ১০৭-৩৩ ভোটে সমকামী বিয়ের আইন পাশ হয় । তবে ঐ পাশ করা আইনের একটি শর্ত ছিল । আর তা হল নেদারল্যান্ডে কোন সমকামী জুটিকে বিয়ে করতে হলে ঐ জুটির অন্তত একজন জাতিগতভাবে ডাচ বা নেদারল্যান্ড এর নাগরিক হতে হবে ।
বেলজিয়াম
উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের একটি দেশ বেলজিয়াম হল দ্বিতীয় দেশ যারা সমকামী বিয়েকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেয় । দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ১,০৪,১৪,৩৩৬ এবং আয়তন ৩০,৫২৮ বর্গকিলোমিটার । ২০০৩ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারী কিং আলবার্ট (দ্বিতীয়) সমকামী বিয়ের অনুমোদনকারী বিলে স্বাক্ষর করেন । তবে এই বিল অনুযায়ী সমকামী গে বা লেসবিয়ান জুটিরা বিয়ের পর কোন বাচ্চা দত্তক নিতে পারবে না । দেশটির কোন সমকামী জুটি যদি বাচ্চা দত্তক নিতে চায় তাহলে অন্য কোন স্বামী-স্ত্রী দম্পতির সাথে যুগ্মভাবে বাচ্চা দত্তক নিতে হবে ।
স্পেন
সমকামী বিয়ে স্বীকৃতি প্রদানের তৃতীয় দেশ হল স্পেন । দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ৪০,৬১,২৭৪ এবং আয়তন ৫,০৬,০৩০ বর্গকিমি। ২০০৪ সালে স্প্যানিশ সমাজতান্ত্রিক পার্টির অপ্রত্যাশিত বিজয় পর নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, Jose Luis Rodriguez Zapatero , দেশে সমকামী বিয়ের উপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল সেটি সরিয়ে দেন । যদিও সে দেশের ক্যাথলিক চার্চ এই সিধান্তের ঘোর বিরোধীতা করে । স্পেনের সংসদে সমকামী বিয়ের পক্ষে ১৮৭ ভোটের মাঝে ১৪৭ ভোট পেয়ে এই আইনটি পাশ হয় । আইনে বলা হয় সমকামী বিয়ে করতে হলে অন্তত একজনকে স্প্যানিশ নাগরিক হতে হবে অথবা স্পেনে বৈধ বসবাসের অনুমতি থাকতে হবে ।
কানাডা
উত্তর আমেরিকার কানাডা হল চতুর্থ দেশ যারা সমকামী বিয়েকে আইনত স্বীকৃতি দিয়েছে । দেশটির আয়তন ৯৯,৮৪,৬৭০ বর্গকিমি এবং জনসংখ্যা ৩,৫১,৩৩,৭০০ । ২০০৫ সালের ২৮ জুন, কানাডার হাউজ অব কমনস ‘সিভিল মেরেজ আইন’ পাশ করে যা ১৯ জুলাই সিনেট এ পাশ হয় । এরপর এটি চূড়ান্তভাবে ২০ জুলাই gender-neutral definition of marriage হিসেবে কানাডার এক তৃতীয়াংশেরও বেশি অংশ জুড়ে স্বীকৃতি পায় । এই আইন অনুযায়ী যেসব নাগরিক ইউএসএ থেকে কানাডায় ভ্রমন করতে আসে তারাও চাইলে সমকামী বিয়ে সম্পন্ন করতে পারবে ।
সাউথ আফ্রিকা
আফ্রিকার দেশগুলোর মাঝে প্রথম সমকামী বিয়ে অনুমোদন দেয় সাউথ আফ্রিকা । আর বিশ্ব ব্যাপী সমকামী বিয়ে অনুমোদন কারী দেশ হিসেবে এর স্থান হল পঞ্চম অবস্থানে । আফ্রিকার দক্ষিণে অবস্থিত দেশটির আয়তন ১২,২১,০৩৭ বর্গকিমি এবং জনসংখ্যা ৪,৯৩,২০,০০০। দেশটির Constitutional Court ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে এই মর্মে রুল জারি করে যে সমকামী বিয়েকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সে দেশের আইনের পরিপন্থী । ২০০৬ সালের ১৪ই নভেম্বর সে দেশের পার্লামেন্টে ২৩০-৪১ ভোটে সমকামী বিয়েকে আইন গত ভাবে অনুমোদন দেয়া হয় ।
সমমনা দুজন পুরুষ বা নারী কি ভালবেসে একে অপরকে বিয়ে করতে পারে না ?
সমকামী বিয়ে ! এও কি সম্ভব !
অনেকের মাঝেই এই প্রশ্নগুলো মাথা চাড়া দেয় ।
উত্তর অনেকেই কিছুটা জানি । আবার কিছুটা অস্পষ্ট । বেশ একটা সন্দেহ কাজ করে সমকামী বিয়ে নিয়ে ।
কেউ কেউ আবার মনে মনে ভেবে বেড়ান সমকামী হয়েছ ভালো কথা ! তা বিয়ের আবার কি দরকার ! লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম আর সেক্স করলেই তো হয় ! তবে এতো কিছুর পরও পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কিছু দেশে এর মাঝেই স্বীকৃতি পেয়েছে সমকামী বিয়ে । সর্বশেষ তথ্য অনুসারে বর্তমান বিশ্বের মোট সতেরোটি দেশে সমকামী বিয়ে স্বীকৃতি পেয়েছে ।
দেশগুলো হল নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেন, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে, সুইডেন, পর্তুগাল, আইসল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ব্রাজিল, উরুগুয়ে, নিউজিল্যান্ড ,ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ড ।
এছাড়া মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র এর কিছু কিছু অংশে সমকামী বিয়ের স্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রদান এখনও আইনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ।
নেদারল্যান্ডস
নেদারল্যান্ডসই সর্বপ্রথম দেশ যারা ২০০১ সালে সমকামী বিয়েকে আইনগত ভাবে স্বীকৃতি দেয় । দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ১,৬৮,১৯,৫৯৫ এবং আয়তন ৪১,৫৪৩ বর্গ কিলোমিটার।দেশটিতে সমকামী বিয়ে বৈধ করার জন্য আন্দোলন শুরু হয় আশির দশকের মাঝামাঝিতে যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হেঙ্ক ক্রল । আয়তনের এই দেশের পার্লামেন্টে ২০০১ সালে ১০৭-৩৩ ভোটে সমকামী বিয়ের আইন পাশ হয় । তবে ঐ পাশ করা আইনের একটি শর্ত ছিল । আর তা হল নেদারল্যান্ডে কোন সমকামী জুটিকে বিয়ে করতে হলে ঐ জুটির অন্তত একজন জাতিগতভাবে ডাচ বা নেদারল্যান্ড এর নাগরিক হতে হবে ।
বেলজিয়াম
উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের একটি দেশ বেলজিয়াম হল দ্বিতীয় দেশ যারা সমকামী বিয়েকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেয় । দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ১,০৪,১৪,৩৩৬ এবং আয়তন ৩০,৫২৮ বর্গকিলোমিটার । ২০০৩ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারী কিং আলবার্ট (দ্বিতীয়) সমকামী বিয়ের অনুমোদনকারী বিলে স্বাক্ষর করেন । তবে এই বিল অনুযায়ী সমকামী গে বা লেসবিয়ান জুটিরা বিয়ের পর কোন বাচ্চা দত্তক নিতে পারবে না । দেশটির কোন সমকামী জুটি যদি বাচ্চা দত্তক নিতে চায় তাহলে অন্য কোন স্বামী-স্ত্রী দম্পতির সাথে যুগ্মভাবে বাচ্চা দত্তক নিতে হবে ।
স্পেন
সমকামী বিয়ে স্বীকৃতি প্রদানের তৃতীয় দেশ হল স্পেন । দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ৪০,৬১,২৭৪ এবং আয়তন ৫,০৬,০৩০ বর্গকিমি। ২০০৪ সালে স্প্যানিশ সমাজতান্ত্রিক পার্টির অপ্রত্যাশিত বিজয় পর নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, Jose Luis Rodriguez Zapatero , দেশে সমকামী বিয়ের উপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল সেটি সরিয়ে দেন । যদিও সে দেশের ক্যাথলিক চার্চ এই সিধান্তের ঘোর বিরোধীতা করে । স্পেনের সংসদে সমকামী বিয়ের পক্ষে ১৮৭ ভোটের মাঝে ১৪৭ ভোট পেয়ে এই আইনটি পাশ হয় । আইনে বলা হয় সমকামী বিয়ে করতে হলে অন্তত একজনকে স্প্যানিশ নাগরিক হতে হবে অথবা স্পেনে বৈধ বসবাসের অনুমতি থাকতে হবে ।
কানাডা
উত্তর আমেরিকার কানাডা হল চতুর্থ দেশ যারা সমকামী বিয়েকে আইনত স্বীকৃতি দিয়েছে । দেশটির আয়তন ৯৯,৮৪,৬৭০ বর্গকিমি এবং জনসংখ্যা ৩,৫১,৩৩,৭০০ । ২০০৫ সালের ২৮ জুন, কানাডার হাউজ অব কমনস ‘সিভিল মেরেজ আইন’ পাশ করে যা ১৯ জুলাই সিনেট এ পাশ হয় । এরপর এটি চূড়ান্তভাবে ২০ জুলাই gender-neutral definition of marriage হিসেবে কানাডার এক তৃতীয়াংশেরও বেশি অংশ জুড়ে স্বীকৃতি পায় । এই আইন অনুযায়ী যেসব নাগরিক ইউএসএ থেকে কানাডায় ভ্রমন করতে আসে তারাও চাইলে সমকামী বিয়ে সম্পন্ন করতে পারবে ।
সাউথ আফ্রিকা
আফ্রিকার দেশগুলোর মাঝে প্রথম সমকামী বিয়ে অনুমোদন দেয় সাউথ আফ্রিকা । আর বিশ্ব ব্যাপী সমকামী বিয়ে অনুমোদন কারী দেশ হিসেবে এর স্থান হল পঞ্চম অবস্থানে । আফ্রিকার দক্ষিণে অবস্থিত দেশটির আয়তন ১২,২১,০৩৭ বর্গকিমি এবং জনসংখ্যা ৪,৯৩,২০,০০০। দেশটির Constitutional Court ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে এই মর্মে রুল জারি করে যে সমকামী বিয়েকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সে দেশের আইনের পরিপন্থী । ২০০৬ সালের ১৪ই নভেম্বর সে দেশের পার্লামেন্টে ২৩০-৪১ ভোটে সমকামী বিয়েকে আইন গত ভাবে অনুমোদন দেয়া হয় ।
Friday, 28 February 2014
ভালোবাসার রঙ
সাল ১৯৮৮, আগস্ট মাসের ৩১ তারিখ রোজ বুধবার। স্থান, নোয়াখালীর সেনবাগ।
চারিদিকে থম থমে জলাবদ্ধতায় নীরবতার রজনী, আশে পাশে তাকালে মনে হয় সাগরের মাঝে নিজের অবস্থান। রাস্তাঘাট, বাজার, স্কুল, কলেজ কিংবা খেলার মাঠ, সব পানির নীচে। শরীরে জীবন ধরে রাখার আকুল আকুতি গ্রামের সব প্রাণীর। বিদ্যুৎহীন এই অন্ধকার রাতে প্রসব ব্যথায় কাতর এক পোয়াতি মা। ৪৮ ঘণ্টা জীবন মরণের মাঝখানে দাঁড়ীয়ে জন্ম দিলেন ফুট ফুটে এক পুত্র সন্তান। পুত্র সন্তান অবধি ঠিক আছে, কিন্তু ফুট ফুটে কথাটা বেমানান সেই নবজাতকের জন্য। কারণটা নীচে প্রদত্ত, পাশের বাড়ীর ছখিনার মা বুড়ী হাতে হারিকেন নিয়ে পানি ডিঙ্গিয়ে দেখতে এসেছিলেন সদ্য ভূমিষ্ঠকে। হারিকেনের আলোয় এক নজর দেখেই, বুড়ি ভয়ে দুহাত পিছিয়ে গিয়ে বলে,
“ও মকছদের মা অ্যাই ইগা কিয়া দেখলাম, ইগা কি মানুষের ছাও নাকি কালা গাঁইর ছা বুঝইতাম হারিয়েন না”
বুঝতেই পারছেন কতটা বিদঘুটে কালো ছিল ঐ শিশু। জন্মক্ষণেই মুখে করে নিয়ে এলো ভয়াবহ ৮৮ সনের বন্যা, আর তার উপর কালো কুৎসিত গাত্রবর্ণ। সদ্যজাত শিশুকে দেখে বিদ্যাহীন কৃষক পরিবারের সবাই যখন মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন তার জন্মদায়ী মা ভীতর ভীতর রাগে পুড়তে থাকে। অন্যর চোখে শিশুটি যতই নিকৃষ্ট হোক, পাতে দেয়ার অযোগ্য হোক, মায়ের কাছে তার নাড়ী ছেড়া ধনের দাম রাজপুত্রের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তাই তো দু কলম জানা মা তার কুৎসিত ছেলের জন্য ইংরেজি নাম দেয় প্রিন্স। যদি ও তিনি প্রিন্সের অর্থ জেনে নাম ঠিক করেননি, ইংরেজি নাম মানে বিশাল কিছু ছিল তার কাছে। অর্থ বুঝত যারা, মানে তার স্কুল কলেজের সহপাঠীরা, এই নামের জাত গুষ্টি ভালো ভাবেই উদ্ধার করেছিল। হর হামেশাই তাদের মুখের একটা বাক্যতে বলি হতে হয়েছে প্রিন্সকে।
“পাতিল তলার মত রঙ তার উপরে নাম তার প্রিন্স”
স্কুল, কলেজে সহপাঠীরা কত মেয়ের সাথে লাইন মারত, কিন্তু তার কপালে কোন মেয়ে জুটল না। কোন মেয়ে ভুলে ও তার দিকে চোখ তুলে দ্বিতীয়বার তাকাতো না। অবশ্য তাতে প্রিন্সের কোন মাথা ব্যথা ছিল না। তার মেয়ে প্রীতির চেয়ে ছেলে প্রীতিটাই বেশী ভালো লাগতো। কিন্তু কথা সেই তো একই, এ রকম ছেলের সাথে যেচে এসে কোন মহা পুরুষ বুক মিলাবে? তাই নিজেকে নিজের ভীতরে সীমাবদ্ধ রেখে পার করে দিল কৈশোরের দিন গুলো।
স্থানীয় কলেজ থেকে ভালো মার্ক নিয়ে পাশ করে প্রিন্স। তার ইচ্ছে ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু কৃষক বাবার সাদ থাকলে ও সাধ্য ছিল না। দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়র সহায়তায় এক বুক স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমাল ঢাকা শহরে। ও আপনাদের একটা কথা তো বলাই হয়নি, মানুষ যত কুৎসিত হোক না কেন বিধাতা তাকে কোন না কোন গুণ দিয়েই পৃথিবীতে পাঠায়। যেমন গল্পের পিন্স তুখোড় মেধাবী আর বোনাস হিসাবে ছিল অস্বাভাবিক সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী। সেই মেধার জোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চান্স পায় পিন্স। নোয়াখালীর এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় হলে একটা সীট ও পেয়ে যায় খুব দ্রুত।
গোঁড়ামি আর রক্ষণশীল গ্রাম্য মানুষ গুলো থেকে দূরে এসে প্রিন্স হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। সে শুনেছে ঢাকা শহরের মানুষ গুলো মটেও ওরকম নয়, তারা অন্যর ব্যাপারে নিজেদের নাক গলায় না। আসলে কি তাই?
দেখতে কালো হলে অবহেলা তার জন্য অনিবার্য। এই থিউরিতে অনেকে বিশ্বাসী, অনেকে হয়তো না। বিধাতার কাছ থেকে প্রাপ্ত সৌন্দর্য দিয়ে অনেকে এক্সটা এডভান্টেজ পেয়ে আসছে সেই সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকে। চাকরীর জন্য ইন্টার্ভিউ দিতে যাচ্ছেন? ওখানে ও সৌন্দর্য প্রীতি, তাই বলে বলছি না সবাই, তবে অনেক অফিসের বস চায় মেধাবী আর কর্মঠর সাথে চাকুরী প্রার্থী সুন্দর, স্মার্ট, প্রেজেন্টেবল হলে প্লাস পয়েন্ট পাবে। তাহলে যে দেখতে কালো বা অসুন্দর, জন্মানোর সময় কি বিধাতা তাকে একটা মাইনাস পয়েন্ট দিয়ে পাঠিয়েছে?
বিয়ে বাড়ীতে সবাই মিলে মজা করছেন, ভিডিও ধারণকারী ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরা সবসময় সুন্দর নারী কিংবা পুরুষের মুখের উপরে বেশী তাক করতে দেখবেন। সেই সুন্দর ছেলে কিংবা সুন্দরী মেয়েটার পাশে বিয়েতে আরও অনেক কালো ছেলে মেয়ে থাকে, হয়তো দায়ে পড়ে এক দুইবার ক্যামেরা বন্ধী হয়েছে সেই সব ফেইস। তারা যখন দেখেছে পাশের জনকে নিয়ে সবার মাথামাথি করছে, তখন তাদের মনের অবস্থা কি হয় একবার ভেবে দেখুন। আর প্রেম ভালোবাসার কথা তো বাদই দিলাম। যার জন্য প্রিন্স এখন অবধি কোন মনের মানুষ খুঁজে পেল না।
এই সভ্য সমাজের তথাকথিত সৌন্দর্য প্রীতি প্রিন্স খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছে। সে জানে তার এই বিশেষ রঙ নিয়ে কোন প্রেমিক জুটবে না তার কপালে। তাই সে ইউনিভার্সিটির সমকামী বন্ধুদের সাথে কোথাও বেড়াতে গেলে সবার পিছনে বসত। যেমন প্রিন্স কোন পার্কে বসে আড্ডা দিচ্ছে বন্ধুদের সাথে। পাশ দিয়ে একটা হ্যান্ড-সাম ছেলে হেঁটে যাচ্ছে, একজন বলল, দেখ দেখ ছেলেটা কি সুন্দর। আরেকজন বলল, ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিল। অন্যজন তার কথা মাটিতে পড়ার আগে বলে, দূর সে আমার দিকে তাকিয়েছিল। এই নিয়ে তর্ক বেধে যায়। তৃতীয় একজন বলল, ছেলেটা আমাদের দিকে নয় প্রিন্সের দিকে তাকিয়েছিল, শত হোক সে তো রাজপুত্র। তার কথা শুনে সবাই হা হা করে হেঁসে উঠে। পিছনে বসে থাকা প্রিন্স মন খারাপ করে বলে, দেখ আমি জানি সে আমার দিকে তাকায়নি। তোদের মত সুন্দর ছেলে রেখে আমার দিকে তাকানোর প্রশ্নই আসে না। আড্ডা থেকে মন খারাপ করে উঠে যায় প্রিন্স। রাতে ঘুমোতে গিয়ে চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে বিধাতার কাছে প্রশ্ন করে, আমার কি দোষ তুমিই তো বানিয়েছ কালো। কেন মানুষের মুখের কটাক্ষের প্রধান হাতিয়ার আমি? প্রিন্স কোন দিন ও তার প্রশ্নের জবাব পায়নি বিধাতার কাছ থেকে। তাই সে বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ছেঁড়ে দিয়ে হল আর ক্লাস নিয়ে দিন কাটাতে থাকে। কিন্তু মানুষ বলে কথা, শরীর না হয় কালো মনটা তো আর কালো নয়, যে অন্ধ মন, প্রেম ভালোবাসার দার দারে না। হুম তার সেই সাদা মন নিয়ে জেনে না জেনে প্রেমে ও পড়েছে অনেকবার। দুটি ঘটনা ছোট করে গল্পে তূলে ধরা যাক।
ঘটনা-১
মোবাইল ফেসবুক ব্যাবহার করে পিন্সের একজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়। তার নাম রতন। ঢাকা কলেজে বোটানি তে থার্ড ইয়ারে পড়ছে। প্রথম দিন থেকেই প্রিন্স তাকে বার বার বলেছে সে দেখতে অনেক কালো। তাই তার কপালে সমপ্রেমের কোন অস্তিত্ব নেই। কিন্তু এই ছেলে নাছোড় বান্দা সে বলে আমি ফর্সা, তাই আমি পছন্দ করি কালো। তুমি কালো হও আর যাই হও তোমাকে আমার ভালো লেগেছে তাই ভালোবাসি তোমাকে। তার মিষ্ট কথায় পিন্সের চিড়া ভিজে গেল। অবশেষে টি.এস.সি তে দুজনে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলো, দেখা হল। রতন দেখতে সত্যি সুন্দর। প্রিন্স মনে মনে ভাবল, যাক এত দিনে আমার একটা থিতে হল। হাজারো খারাপ মানুষের ভিড়ে এখনো ভালো মানুষের অবস্থান তাহলে আছে। ভালো ভালোই তার থেকে বিদায় নিয়ে হলে ফিরল পিন্স। রাতে রতনকে ফোন দিয়ে বার বার টাই করে, সে ফোন ধরে না। শেষে একটা টেক্সট এলো রতনের কাছ থেকে।
“বলি কালো হবার ও তো একটা জাত আছে নাকি? এত কালো হবে ভাবিনী। আর বাসায় এসে চিন্তা করে দেখলাম তোমার সাথে আমাকে যায় না। তাই বিদায়”
ঘটনা-২
প্রিন্সের রুমমেট তানভীর, তার বাল্য বন্ধু জহির ইতালিতে থাকত। রুমে থাকা অবস্থায় প্রিন্স দুই বন্ধুর মোবাইল কথোপকথন সবসময় শুনত। এক দিন তানভীর মোবাইল ভুলে বাসায় ফেলে বাহীরে চলে যায়। এ দিকে জহির বার বার কল করে যাচ্ছে। প্রিন্স বাধ্য হয়ে ফোন পিক করে তাকে জানালো, তানভীর বাহীরে। তখন তার সাথে পরিচয় হয় জহিরের। মিনিট দুই কথা চলে তাদের। এরই মাঝে জহিরের প্রিন্সের কণ্ঠ ভীষণ ভালো লেগে যায়। তাই মাঝে মধ্যে তানভীরের সাথে কথা বলার সময় প্রিন্সের সাথে ও কথা হত। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব। জহিরের অনুরোধে প্রিন্স তার মোবাইল নাম্বার দেয় তাকে। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয় তাদের সম্পর্ক। তানভীর হল ছেড়ে তাদের কাঁটাবনের বাসায় উঠে যায়, তারপর ও প্রিন্স আর জহিরের সম্পর্ক আগের মতই থাকে। রতন প্রিন্সের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার পর প্রিন্স প্রতিজ্ঞা করেছিল। আর কারো প্রেমে পড়বে না। প্রেম ভালোবাসা সবার জন্য নয়। সে হল মহুয়া ফুল, যেটা কোন দেবতার পূজায় লাগে না। কিন্তু জহিরের সাথে কথা বলে সে তার প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেনি। পিন্স আবার প্রেমে পড়ে। নচিকেতার গানটার মত, “একটা হৃদয় একবার নয় বারবার প্রেমে পড়ে”
বছর খানিক পরে জহির দেশে ফীরে আসে। প্রিন্স ইতিমধ্যে অনার্স শেষ করে ফেলে। মাস্টার্স এ ভর্তি হয়ে সে একটা পার্ট টাইম চাকরী করছে মহাখালীর এক কল সেন্টারে। হল ছেঁড়ে সে এখন ফার্মগেটের রাজাবাজারের এক মেসে উঠেছে। জহির ঢাকা পৌঁছে পিন্সের সাথে দেখা করার জন্য অস্থির হয়ে উঠে। প্রিন্স তাকে সেজান পয়েন্টের সামনে আসতে বলে।
প্রিন্স মাহবুব প্লাজা আর সেজান পয়েন্টের মাঝের গলিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে জহিরের জন্য। প্রিন্স জহিরকে আগে দেখেছে তানভীর আর সে যখন দেশে ছিল তখনকার একটা ছবিতে। কিন্তু জহির প্রিন্সকে দেখেনি। তাই প্রিন্সকে জিজ্ঞাস করে নিলো, কি পরে আছো তুমি? প্রিন্স জানালো সে একটা কালো টি-শার্ট আর ব্লু জিন্স পরে আছে। আধা ঘণ্টা দাঁড়ীয়ে থেকে জহিরের মোবাইলে কল দিল প্রিন্স। জহির ফোন ধরে না। প্রিন্স ভাবছে হয়তো সে ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেছে। আরও ঘণ্টা খানিক অপেক্ষা করে আবার কল করল জহিরকে। এইবার তার মোবাইল বন্ধ।
প্রিন্স বুঝতে পারছে সে আবার ও প্রতারিত হয়েছে। তার গায়ের রঙ এ সে বোধহয় ইতস্তত বোধ করে না দেখা করেই ফালিয়ে গেছে। প্রিন্স আবার ভাবতে থাকে কত বোকাই না সে, খুব সহজে মানুষকে বিশ্বাস করে আর ঠকে। অথচ এই জহির তাকে অনেক বার বলছে, বিদেশীদের সাদা চামড়া তার অসহ্য লাগে। তার কালো ভালো লাগে। পিন্স বুঝতে পারে, অনেক সুন্দর মানুষের মন পাতিল-তলার চেয়ে ও কালো। পিন্সের গায়ের রঙ অনেক কালো সে তাকে বার বার বলেছে। তারপর ও সে সম্পর্কে জোড়াল। আর আজ তাকে দেখে ফালিয়ে গেল। প্রিন্স ভাবতে থাকে সম্পর্ক থাকবে না থাকবে সেইটা পরের ব্যাপার, একজন মানুষ এতক্ষণ অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে তার জন্য, বিন্দু মাত্র মনুষ্যত্ব যদি তার কাছে থাকত, তাহলে না দেখা করে পালাত না। আসলে তথাকথিত অনেক সুন্দর মানুষেরই ভিতরটা ভীষণ অসুন্দর। কিন্তু আফসোস তাদের সহজে চেনার উপায় মানুষের অজানা।
ঐ দিন থেকে সে রীতিমত কসম কেটে প্রতিজ্ঞা করল, সে জীবনে ও আর কারো সাথে সম্পর্কে জড়াবে না। আসলে কি তাই? মানুষ কি পারে তার সব প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে। হুমায়ূন স্যার বলেছিলেন, “মানুষ প্রতিজ্ঞা করে প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গার জন্য”
প্রিন্স মাস্টার্স শেষ করে সুন্দর ভয়েসের সুবাদে বাংলালিংক এর কাস্টমার কেয়ারে চাকরী পেয়ে যায়। সে এখন আগের মত সহজে কাউকে বিশ্বাস করা থেকে বিরত। তাই চাকরী আর পরিবারের মধ্যে তার জগতটা সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা বেশী দিন ধরে রাখতে পারেনি। ২০১১ এর শেষের দিকের কথা।
এক কাস্টমার বাংলালিংক কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে। ফোনটা পিক করে পিন্সের সহকর্মী ইভা। ভদ্রলোক ফোন ধরেই ইভাকে অভদ্র ভাষায় যা ইচ্ছে তাই বলল। ইভা কিছুতেই তাকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। তার নাকি মোবাইল ব্যালেন্স বেশী কাটা হয়। এর আগে ও অনেক বার কমপ্লিন করেছে। কিন্তু তার সমস্যার কোন সুরাহা হয়নি। তাই আজকে সে অতিরিক্ত গরম। যদি তার হাতে একটা এটম বোম থাকত তাহলে সেইটা কোন হিরোশিমায় না মেরে বাংলালিংক এর ভবনে মারত। ইভা আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে কলটা প্রিন্সের কাছে টান্সফার করে। কারণ সবাই জানে প্রিন্সের সুমিষ্ট কণ্ঠের যাদু দিয়ে যে কোন মানুষকে বশে আনতে মিনিট খানিক লাগে। প্রিন্স কল ধরে বলল,
-বাংলালিংক কাস্টমার কেয়ার থেকে প্রিন্স বলছি, আপনাকে কি ভাবে সাহায্য করতে পারি?
কাস্টমার এইবার তার মুখে একটা গালি ঠিক করে সবে মুখ খুলবে, হঠাৎ করে তার রাগের জ্বলত শিখা নিবে গেল। ৫ মিনিটের মধ্যে প্রিন্স কাস্টমার কে বুঝিয়ে কলা দেখিয়ে লাইন কেটে দেয়। কিন্তু ঐ দিন লাইন কাটলে ও সেই কাস্টমার তার পিছু ছাড়েনি। সময় অসময় কাস্টমার কেয়ারে কল করে প্রিন্সের সাথে খোস গল্প করতে চায়। প্রিন্স প্রথম থেকেই তাকে অবহেলা করে আসছে। কিন্তু প্রতিদিন ফোন করে তার কাজের ১২টা বাজাচ্ছে দেখে একদিন নিজের মোবাইল থেকে তাকে কল করে বলল,
-ঐ মিয়া আপনার সমস্যা কি?
-আমার কোন সমস্যা নাই।
-তাহলে সময় অসময় অকাজে ফোন করেন কেন?
-আপনার কণ্ঠ আমার ভীষণ ভালো লাগে।
-তো আমি কি করতে পারি আপনার জন্য?
-কিছু না, এই যে এখন যেমন কথা বলছেন, এই ভাবে রোজ কথা বললেই চলবে?
-মাথা খারাপ নাকি?
-হুম ঠকই ধরেছেন, অনেকটাই সে রকম।
প্রথম দিন প্রিন্স তাকে যতটা খ্যাত মনে করেছে সে ততটা খ্যাত নয়। ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে কথা বলে, সাথে কবি সাহিত্যর ছোঁয়া ও আছে।
প্রিন্সের মোবাইল নাম্বার পেয়ে লোকটা আকাশের চাঁদ হাতে পেল। রাত নেই, দিন নেই প্রিন্সের মুণ্ডু ভেঙ্গে একাকার। কথায় কথায় জানতে পারল তার নাম ফারহান। দুবছর যাবত ব্যবসা করছে ঢাকাতে। পিন্স পাগল সামলানোর জন্য তাকে বন্ধুত্বের অপার দেয়। সে অকপটে তা কবুল করে নেয়। ঐ বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে রাতে একবার কলে কথা বলতে হয় প্রিন্সকে। ছয়মাস দুজন দুজনকে ফোন জানে। কিন্তু দেখা করার চিন্তা ও করেনি প্রিন্স। এক পর্যায়ে পিন্স বুঝতে পারে ফারহান তার মাঝে জায়গা করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। তার আগের দুটো অভিজ্ঞতার কথা মনে করে সে ফারহান কে বুঝিয়ে বলল, তার সাথে কথা বন্ধ করতে। কিন্তু ফারহান নাছোড় বান্দা, কথা না বলে থাকতে পারে না। অবশ্য প্রিন্সের ও একই দশা। প্রিন্স বুঝতে পারে ফারহান তার কাছে কি চায়, কিংবা তাদের সম্পর্কটা কোন দিকে মোড় নিতে পারে। তাই একদিন প্রিন্স ফারহানকে যেচে এসে তার অতীতের কষ্টের কথামালা শোনায়, ফারহান গম্ভীর হয়ে তাকে জানায়, দুনিয়ার সব মানুষ সমান নয়। তবে হ্যাঁ সে নিজে ও দেখতে ফর্সা, মাঝারী ধরনের ২৮ বছরের যুবক। তবে তার মাঝে বর্ণ নিয়ে কোন চুলকানি নেই। তার কাছে মানুষ শুধু মানুষ। তার কথা শুনে প্রিন্স নিজেকে আরও সতর্ক করে দেয়, আগের মত আবার ভুল করতে যাচ্ছে সে। তাই ফারহানকে অনেক কটু কথা বলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে পিন্স। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। ফারহান আগের মতই তার সাথে কথা বলে যায়। একদিন প্রিন্স খুব শান্ত ভাবেই তার সাথে আলোচনা করে বুঝাতে চেষ্টা করল,
-দেখ ফারহান, ইচ্ছে করলেই আমরা যা চাই তা করতে পারি না।
-মানুষ চেষ্টা করলে অনেক কিছুই করতে পারে?
-আমি তোমার সাথে তর্ক করতে চাই না। আমি শুধু তোমাকে বুঝাতে চাই, তুমি আমাকে বিরক্ত না করে তোমার মত কাউকে খুঁজে নাও। আমি কোন দিন ও তোমার সাথে দেখা করব না। সাদা চামড়ার প্রতি আমার অনেক রাগ বুঝলে, কারণ সাদা চামড়ার মানুষ রূপী কিছু পশুকে চিনতাম, তারা আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়েছে, রঙ সুন্দর হলেই মন সুন্দর হয় না।
-প্রিন্স আমি তোমার কথা অস্বীকার করছি না, সব সাদা চামড়ার মানুষ কিন্তু খারাপ নয়। শুধু সেই ভালো মানুষ গুলোকে খুঁজে নিতে হয়।
-দুঃখিত মশাই। আমার কোন সখ নাই কাউকে খোঁজার।
-প্রিন্স তোমাকে কিছু কথা বলি রাগ করবে না, ছেলে বেলা থেকে তোমার গায়ের রঙ নিয়ে তুমি অসন্তুষ্ট ছিলে। তাই ফর্সা মানুষদের তুমি অযাচিত ভাবেই ঘৃণা করতে। আর তোমার সেই ঘৃণাকে তেলে বেগুন দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, রতন আর জহির। প্রিন্স তুমি উচ্চশিক্ষিত একটা ছেলে বাস্তব সম্পর্কে বুঝতে চেষ্টা কর, তোমার জীবনে একটা দিন ও কি ছিল, যে দিন তুমি নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলে? একদিনের জন্য ও কি নিজের কালো রঙ মেনে নিয়ে নিজেকে ভালবেসেছিলে? একটা দিনের জন্যও কি নিজেকে সম্মানের আসনে বসিয়েছিলে? যে নিজেকে ভালোবাসে না, যে নিজেকে সম্মান করতে জানে না, সে কি ভাবে অন্যর ভালোবাসা প্রত্যাশা করে?
প্রিন্স কথা গুলো ভাবতে লাগল, আসলে ও তাই। সে কোন দিন ও নিজেকে নিয়ে সুখী ছিল না। তাই বোধহয় সুখ নামের পাখীটা তার জীবনে ধরা দেয়নি। নিজেকে অন্যর কাছে ছোট করা থেকে উদ্ধার করতে মাথার মধ্যে কিছু যুক্তি ঠিক করে আবার উত্তর দিল ফারহান কে?
-ফারহান, আমি ও তোমার কথা অস্বীকার করছি না। হ্যাঁ হয়তো তুমি রাইট, আচ্ছা তুমি কি আমাকে একজন স্মার্ট, হ্যান্ড-সাম মানুষ দেখাতে পারবে, যে নিজেকে নিয়ে বিন্দু মাত্র অহংকার মনে পুষে রাখে না? যে কোন দিন একটি বারের জন্য ও ভাবেনি, সে আট দশ জন থেকে উন্নত প্রজাতির কেউ একজন। হয়তো হাতে গোনা দু একজন ভিন্ন হতে পারে, তারা হয়তো মানুষের ঊর্ধ্বে। তা না হলে পৃথিবীর সব মানুষই কম বেশী সুন্দরের পূজারী।
-প্রিন্স, তোমার কথা পুরোপুরি মিথ্যে নয় হয়তো, কিন্তু তাই বলে সবাইকে একই ছাঁচে ফেলে নিজস্ব রঙে রাঙানো কি ঠিক? আগে তুমি নিজেকে শূদ্রাও পরে অন্যকে জাজমেন্ট কর। তুমি আগে নিজেকে মেনে নাও তুমি যা তাতেই হ্যাপি। দেখবে তুমি আবার মানুষকে বিশ্বাস করতে পারবে। দেখবে তোমার জীবনে একজন আসবে যে তোমার ভিতরের সব কষ্ট নিজের করে তোমাকে হাল্কা করে দিবে। কালো যদি না থাকত তাহলে মানুষ সুন্দরের মর্ম বুঝত না। কালো মটেও কুৎসিত নয়, দেখ কবি কি বলেছেন,
কালো চোখের তারা দিয়েই সকল ধরা দেখি,
কালো দাতের কালি দিয়েই কেতাব কোরাণ লেখি|
জনম কালো, মরণ কালো, কালো ভূবনময় ;
চাষীদের ওই কালো ছেলে সব করেছে জয়|
প্রিন্স কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবতে থাকে ফারহানের কথা গুলো, তারপর বলে,
-হয়েছে হয়েছে, মৃত জসীমউদ্দিন সাহেব কে নকশী কাঁথার মাঠ থেকে এই ঢাকা শহরে টেনে না আনলে ও চলবে। আর সত্যি কথা বলতে কি, একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সভ্য আধুনিক মানুষগুলো কম বেশী বর্ণবাদে বিশ্বাসী, যদি সবাই নেলসন ম্যান্ডেলার বর্ণবাদে বিপক্ষের কথা গুলো বুঝতে পারত, তাহলে কালো সাদার জন্য বিশ্বের কিছু মানুষ এখনো প্রাণ হারাত না।
ঐ দিনের পর থেকে প্রিন্স অনেকখানি বদলে যেতে লাগল, সে নিজেকে একসেপ্ট করতে শিখল, সে কালো, সে যা আছে তাই ভালো। সে সমকামী সেটাও ও মেনে নিলো। এখন আর আগের মত তার মন খারাপ হয় না। এ দিকে ফারহানের সাথে সম্পর্কটা ও জমে গেল। কিন্তু দেখা করাতে প্রিন্সের যত আপত্তি। ফারহান হাজার বার বলেছে দেখা করার জন্য, কিন্তু প্রিন্স ঐ একই কবিতা পড়ে দিয়েছে। দেখা সে করবে না।
দুই বছর হয়ে গেল তাদের বন্ধুত্ব হোক আর ভালোবাসা হোক এখনো টিকে আছে। এক রাতে মোবাইলে কথা বলছে ফারহান। প্রিন্স তার বাসায় শুয়ে আর ফারহান তাদের ডুপ্লেক্স বাড়ীর দোতলার সিঁড়িতে হাঁটতে হাঁটতে। হঠাৎ করে পা মোচড় খেয়ে পিছলে পড়ে যায় ফারহান। এ দিকে প্রিন্স হ্যালো হ্যালো করছে, কোন কথা নাই। প্রিন্স বুঝতে পারে ফারহানের কোন প্রবলেম হয়েছে, কিন্তু সেইটা কি বুঝতে পারছে না। বার বার কল কেটে, কল করছে। কেউ ধরছে না। সে কিছুতেই ঘুমাতে পারছে না। ফারহানের সাথে দেখা করার ইচ্ছে ছিল না বিধায় তার বাসার ঠিকানাটা কোন দিন ও জানতে চায়নি প্রিন্স। বারান্দায় আর ঘরে পায়চারি করতে লাগল, রাত সাড়ে চারটার দিকে প্রিন্সের মোবাইলে কল দিতেই কে যেন মোবাইল ধরল,
-হ্যালো ফারহান।
-ফারহান ভাইজান তো হাসপাতালে।
-কি হয়েছে তার, আপনি কে?
-আমি হেগো বাড়িত কাম করি।
-ফারহানের কি হয়েছে সে কোন হসপিটালে আছে?
-ভাইজান রাইতের বেলা কার লগে কতা কইতে গিয়ে ঠেং পিছলাইয়া পইরা গেছে। হেয় অখন সেন্ট্রাল হসপিটালে আছে।
প্রিন্স বুঝতে পারছে না কি করবে? এই ভোর রাতে হসপিটালে যাবে নাকি সকাল বেলায়?
মনের সাথে যুদ্ধ করে সে সিদ্ধান্ত নিলো এখন নয় রাতে হয়তো তার পরিবারের সবাই আছে ওখানে এ অবস্থায় গেলে তার জন্য অস্বস্তিকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। সকাল ১০টা নাগাদ হাতে এক গুচ্ছ ফুল নিয়ে সেন্ট্রাল হসপিটালে আসে প্রিন্স।
ফারহান চোখ বন্ধ করে হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে। তার মা তার পাশেই বসে আছে। উনার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে উনি অনেক কেঁদেছেন। প্রিন্স ফারহানকে যত টা সুন্দর মনে করেছিল ফারহান তার থেকে কয়েক গুন বেশী সুন্দর। মনে হচ্ছে সাদা বিছানায় ফর্সা এক দেবদূত শুয়ে আছে। প্রিন্স কেবিনের এক কোনে হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়ীয়ে আছে। ফারহানের মা তাকে আস্তে করে ডেকে তুলল,
-ফারহান তোর সাথে এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছেন।
ফারহান চোখ খুলে প্রিন্সের দিকে তাকায়। প্রিন্স কিছু বলতে গিয়ে ও থেমে যায়, আবেগে সে বাকযুদ্ধ হয়ে যায়। ফারহান মুখে এক চিলতে হাঁসি এনে চোখের ইশারায় তাকে বসতে বলে। আর সে যে প্রিন্স, এক নিমিষে ফারহান বুঝতে পারল। প্রিন্স ভাবছে, এই দেবদূতের সাথে সে সম্পূর্ণ রূপে বেমানান। আর তাকে দেখে আগের দুজনের মত ফারহান ও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিবে। তাতে প্রিন্সের কিচ্ছু যায় আসে না। সে এখন নিজেকে ভালোবাসে, সে জানে মানুষের সৌন্দর্য গায়ের রঙে নয়, তার ব্যক্তিত্বে আর মনুষ্যত্বে। ফারহান মাকে বলে,
-মা উনার সাথে আমার প্রাইভেট কিছু কথা আছে। যদি কিছু মনে না কর তুমি কি কিছুক্ষণের জন্য বাহীরে যাবে?
ফারহানের মা কিছু মনে না করে বলে,
-শিউর, তোরা কথা বল আমি বাহীরে থেকে হেঁটে আসি।
ফারহানের মা কেবিন থেকে বের হওয়ার আগে প্রিন্সকে বলে,
-একি বাবা তুমি দাঁড়ীয়ে কেন? চেয়ারটা টেনে বস।
ফারহানের মা চলে যাওয়ার পর, দুজনের কোন কথা নেই। শুধু প্রিন্স সাথে করে আনা ফুল গুলো ফারহানের দিকে বাড়ীয়ে দিল, বিনিময়ে ফারহান তাকে থ্যাংকস বলে।
ফারহান প্রথম নীরবতা ভেঙ্গে মুখ খুলে,
-কেমন ছিলে?
-জানি না।
-কেন জানো না?
-কি জন্য যে জানি না তাও ও জানি না।
-প্রিন্স তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি এখন নিজেকে ভালবাসতে শিখেছ। তোমার মাঝে একটা আত্মবিশ্বাসের আবাস দেখতে পাচ্ছি। আমি কি রাইট?
-জানোই যখন, তখন জিজ্ঞাস করছ কেন?
-তোমাকে ইজি করতে। কারণ আমাকে দেখে তুমি একটা শঙ্কায় আছো, আমি তোমাকে একসেপ্ট করি কি না করি। এম অ্যাই রাইট?
-জানোই যখন তখন প্রশ্ন করে বিব্রত করছ কেন?
-ইচ্ছে করে। গত দুইবছর সময় লেগেছে তোমাকে দেখতে। প্রিন্স তুমি কি জানো তুমি দেখতে সত্যি অনেক সুন্দর।
প্রিন্সের চোখে কোণে পানি জমে গেল ফারহানের কথা শুনে। তার জীবনে এই প্রথম কেউ তাকে সুন্দর বলেছে সেইটা কটাক্ষ করে নয়। প্রিন্স বলে,
-আর কিছু?
-হুম আরও অনেক কিছু, ওত দূরে কেন? কাছে এসে বস।
প্রিন্স দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে ফারহানের কাছ ঘেঁষে বসে। ফারহান তার একটা হাত দিয়ে প্রিন্সের একটা হাত বুকে চেপে ধরে বলে,
-প্রিন্স তোমাকে দেখার পর ও আমি তোমাকে ঠিক আগের মতই ভালোবাসি। তোমার রঙ নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। আমি তোমাকে ভালবেসেছি না দেখেই। আর তোমাকে তোমার জন্যই ভালবাসতে চাই। তুমি যা আছ, তার জন্যই ভালবাসতে চাই। একদিনের জন্য নয়, যুগ যুগ ধরে ভালোবেসে ও আমি ক্লান্ত হব না প্রিন্স। অ্যাই রিয়েলি রিয়েলি লাভ ইয়উ।
ফারহানের কথা শুনে আবেগে প্রিন্স নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ঝাঁপিয়ে পড়ে ফারহানের বুকের উপরে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁপে উঠে পিন্সের বুক। কাল সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে ফারহান বাম হাতে প্রচণ্ড ব্যথা পায়। হাতটা চাদরে ডাকা, তাই প্রিন্স দেখতে পায়নি। প্রিন্স জড়িয়ে ধরাতে ফারহান ব্যথা পাচ্ছে তারপরে ঐ ব্যথা নিয়ে জড়িয়ে ধরে রেখেছে প্রিন্সকে। কারণ ফারহান আগেই বলেছে তার সমস্ত ব্যথা সে নিজের করে নিবে।
অবশেষে প্রিন্স খুঁজে পেল তার সত্যিকারের ভালোবাসার রঙ। ফারহান তার সারা জীবন রাঙিয়ে রাখবে তাকে রঙধনুর সাতরঙে। সত্যিকার প্রেমিক কখনো রঙ নিয়ে ভালোবাসার বাণিজ্য করে না। ভালোবাসা তো স্রেফ ভালোবাসাই হয়, ওতে কালো আর সাদার তফাৎ খুঁজতে যাওয়া কোন সত্যিকার প্রেমিকের কর্ম নয়।
চারিদিকে থম থমে জলাবদ্ধতায় নীরবতার রজনী, আশে পাশে তাকালে মনে হয় সাগরের মাঝে নিজের অবস্থান। রাস্তাঘাট, বাজার, স্কুল, কলেজ কিংবা খেলার মাঠ, সব পানির নীচে। শরীরে জীবন ধরে রাখার আকুল আকুতি গ্রামের সব প্রাণীর। বিদ্যুৎহীন এই অন্ধকার রাতে প্রসব ব্যথায় কাতর এক পোয়াতি মা। ৪৮ ঘণ্টা জীবন মরণের মাঝখানে দাঁড়ীয়ে জন্ম দিলেন ফুট ফুটে এক পুত্র সন্তান। পুত্র সন্তান অবধি ঠিক আছে, কিন্তু ফুট ফুটে কথাটা বেমানান সেই নবজাতকের জন্য। কারণটা নীচে প্রদত্ত, পাশের বাড়ীর ছখিনার মা বুড়ী হাতে হারিকেন নিয়ে পানি ডিঙ্গিয়ে দেখতে এসেছিলেন সদ্য ভূমিষ্ঠকে। হারিকেনের আলোয় এক নজর দেখেই, বুড়ি ভয়ে দুহাত পিছিয়ে গিয়ে বলে,
“ও মকছদের মা অ্যাই ইগা কিয়া দেখলাম, ইগা কি মানুষের ছাও নাকি কালা গাঁইর ছা বুঝইতাম হারিয়েন না”
বুঝতেই পারছেন কতটা বিদঘুটে কালো ছিল ঐ শিশু। জন্মক্ষণেই মুখে করে নিয়ে এলো ভয়াবহ ৮৮ সনের বন্যা, আর তার উপর কালো কুৎসিত গাত্রবর্ণ। সদ্যজাত শিশুকে দেখে বিদ্যাহীন কৃষক পরিবারের সবাই যখন মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন তার জন্মদায়ী মা ভীতর ভীতর রাগে পুড়তে থাকে। অন্যর চোখে শিশুটি যতই নিকৃষ্ট হোক, পাতে দেয়ার অযোগ্য হোক, মায়ের কাছে তার নাড়ী ছেড়া ধনের দাম রাজপুত্রের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তাই তো দু কলম জানা মা তার কুৎসিত ছেলের জন্য ইংরেজি নাম দেয় প্রিন্স। যদি ও তিনি প্রিন্সের অর্থ জেনে নাম ঠিক করেননি, ইংরেজি নাম মানে বিশাল কিছু ছিল তার কাছে। অর্থ বুঝত যারা, মানে তার স্কুল কলেজের সহপাঠীরা, এই নামের জাত গুষ্টি ভালো ভাবেই উদ্ধার করেছিল। হর হামেশাই তাদের মুখের একটা বাক্যতে বলি হতে হয়েছে প্রিন্সকে।
“পাতিল তলার মত রঙ তার উপরে নাম তার প্রিন্স”
স্কুল, কলেজে সহপাঠীরা কত মেয়ের সাথে লাইন মারত, কিন্তু তার কপালে কোন মেয়ে জুটল না। কোন মেয়ে ভুলে ও তার দিকে চোখ তুলে দ্বিতীয়বার তাকাতো না। অবশ্য তাতে প্রিন্সের কোন মাথা ব্যথা ছিল না। তার মেয়ে প্রীতির চেয়ে ছেলে প্রীতিটাই বেশী ভালো লাগতো। কিন্তু কথা সেই তো একই, এ রকম ছেলের সাথে যেচে এসে কোন মহা পুরুষ বুক মিলাবে? তাই নিজেকে নিজের ভীতরে সীমাবদ্ধ রেখে পার করে দিল কৈশোরের দিন গুলো।
স্থানীয় কলেজ থেকে ভালো মার্ক নিয়ে পাশ করে প্রিন্স। তার ইচ্ছে ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু কৃষক বাবার সাদ থাকলে ও সাধ্য ছিল না। দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়র সহায়তায় এক বুক স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমাল ঢাকা শহরে। ও আপনাদের একটা কথা তো বলাই হয়নি, মানুষ যত কুৎসিত হোক না কেন বিধাতা তাকে কোন না কোন গুণ দিয়েই পৃথিবীতে পাঠায়। যেমন গল্পের পিন্স তুখোড় মেধাবী আর বোনাস হিসাবে ছিল অস্বাভাবিক সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী। সেই মেধার জোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
গোঁড়ামি আর রক্ষণশীল গ্রাম্য মানুষ গুলো থেকে দূরে এসে প্রিন্স হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। সে শুনেছে ঢাকা শহরের মানুষ গুলো মটেও ওরকম নয়, তারা অন্যর ব্যাপারে নিজেদের নাক গলায় না। আসলে কি তাই?
দেখতে কালো হলে অবহেলা তার জন্য অনিবার্য। এই থিউরিতে অনেকে বিশ্বাসী, অনেকে হয়তো না। বিধাতার কাছ থেকে প্রাপ্ত সৌন্দর্য দিয়ে অনেকে এক্সটা এডভান্টেজ পেয়ে আসছে সেই সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকে। চাকরীর জন্য ইন্টার্ভিউ দিতে যাচ্ছেন? ওখানে ও সৌন্দর্য প্রীতি, তাই বলে বলছি না সবাই, তবে অনেক অফিসের বস চায় মেধাবী আর কর্মঠর সাথে চাকুরী প্রার্থী সুন্দর, স্মার্ট, প্রেজেন্টেবল হলে প্লাস পয়েন্ট পাবে। তাহলে যে দেখতে কালো বা অসুন্দর, জন্মানোর সময় কি বিধাতা তাকে একটা মাইনাস পয়েন্ট দিয়ে পাঠিয়েছে?
বিয়ে বাড়ীতে সবাই মিলে মজা করছেন, ভিডিও ধারণকারী ক্যামেরাম্যানের
এই সভ্য সমাজের তথাকথিত সৌন্দর্য প্রীতি প্রিন্স খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছে। সে জানে তার এই বিশেষ রঙ নিয়ে কোন প্রেমিক জুটবে না তার কপালে। তাই সে ইউনিভার্সিটির সমকামী বন্ধুদের সাথে কোথাও বেড়াতে গেলে সবার পিছনে বসত। যেমন প্রিন্স কোন পার্কে বসে আড্ডা দিচ্ছে বন্ধুদের সাথে। পাশ দিয়ে একটা হ্যান্ড-সাম ছেলে হেঁটে যাচ্ছে, একজন বলল, দেখ দেখ ছেলেটা কি সুন্দর। আরেকজন বলল, ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিল। অন্যজন তার কথা মাটিতে পড়ার আগে বলে, দূর সে আমার দিকে তাকিয়েছিল। এই নিয়ে তর্ক বেধে যায়। তৃতীয় একজন বলল, ছেলেটা আমাদের দিকে নয় প্রিন্সের দিকে তাকিয়েছিল, শত হোক সে তো রাজপুত্র। তার কথা শুনে সবাই হা হা করে হেঁসে উঠে। পিছনে বসে থাকা প্রিন্স মন খারাপ করে বলে, দেখ আমি জানি সে আমার দিকে তাকায়নি। তোদের মত সুন্দর ছেলে রেখে আমার দিকে তাকানোর প্রশ্নই আসে না। আড্ডা থেকে মন খারাপ করে উঠে যায় প্রিন্স। রাতে ঘুমোতে গিয়ে চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে বিধাতার কাছে প্রশ্ন করে, আমার কি দোষ তুমিই তো বানিয়েছ কালো। কেন মানুষের মুখের কটাক্ষের প্রধান হাতিয়ার আমি? প্রিন্স কোন দিন ও তার প্রশ্নের জবাব পায়নি বিধাতার কাছ থেকে। তাই সে বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ছেঁড়ে দিয়ে হল আর ক্লাস নিয়ে দিন কাটাতে থাকে। কিন্তু মানুষ বলে কথা, শরীর না হয় কালো মনটা তো আর কালো নয়, যে অন্ধ মন, প্রেম ভালোবাসার দার দারে না। হুম তার সেই সাদা মন নিয়ে জেনে না জেনে প্রেমে ও পড়েছে অনেকবার। দুটি ঘটনা ছোট করে গল্পে তূলে ধরা যাক।
ঘটনা-১
মোবাইল ফেসবুক ব্যাবহার করে পিন্সের একজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়। তার নাম রতন। ঢাকা কলেজে বোটানি তে থার্ড ইয়ারে পড়ছে। প্রথম দিন থেকেই প্রিন্স তাকে বার বার বলেছে সে দেখতে অনেক কালো। তাই তার কপালে সমপ্রেমের কোন অস্তিত্ব নেই। কিন্তু এই ছেলে নাছোড় বান্দা সে বলে আমি ফর্সা, তাই আমি পছন্দ করি কালো। তুমি কালো হও আর যাই হও তোমাকে আমার ভালো লেগেছে তাই ভালোবাসি তোমাকে। তার মিষ্ট কথায় পিন্সের চিড়া ভিজে গেল। অবশেষে টি.এস.সি তে দুজনে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলো, দেখা হল। রতন দেখতে সত্যি সুন্দর। প্রিন্স মনে মনে ভাবল, যাক এত দিনে আমার একটা থিতে হল। হাজারো খারাপ মানুষের ভিড়ে এখনো ভালো মানুষের অবস্থান তাহলে আছে। ভালো ভালোই তার থেকে বিদায় নিয়ে হলে ফিরল পিন্স। রাতে রতনকে ফোন দিয়ে বার বার টাই করে, সে ফোন ধরে না। শেষে একটা টেক্সট এলো রতনের কাছ থেকে।
“বলি কালো হবার ও তো একটা জাত আছে নাকি? এত কালো হবে ভাবিনী। আর বাসায় এসে চিন্তা করে দেখলাম তোমার সাথে আমাকে যায় না। তাই বিদায়”
ঘটনা-২
প্রিন্সের রুমমেট তানভীর, তার বাল্য বন্ধু জহির ইতালিতে থাকত। রুমে থাকা অবস্থায় প্রিন্স দুই বন্ধুর মোবাইল কথোপকথন সবসময় শুনত। এক দিন তানভীর মোবাইল ভুলে বাসায় ফেলে বাহীরে চলে যায়। এ দিকে জহির বার বার কল করে যাচ্ছে। প্রিন্স বাধ্য হয়ে ফোন পিক করে তাকে জানালো, তানভীর বাহীরে। তখন তার সাথে পরিচয় হয় জহিরের। মিনিট দুই কথা চলে তাদের। এরই মাঝে জহিরের প্রিন্সের কণ্ঠ ভীষণ ভালো লেগে যায়। তাই মাঝে মধ্যে তানভীরের সাথে কথা বলার সময় প্রিন্সের সাথে ও কথা হত। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব। জহিরের অনুরোধে প্রিন্স তার মোবাইল নাম্বার দেয় তাকে। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয় তাদের সম্পর্ক। তানভীর হল ছেড়ে তাদের কাঁটাবনের বাসায় উঠে যায়, তারপর ও প্রিন্স আর জহিরের সম্পর্ক আগের মতই থাকে। রতন প্রিন্সের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার পর প্রিন্স প্রতিজ্ঞা করেছিল। আর কারো প্রেমে পড়বে না। প্রেম ভালোবাসা সবার জন্য নয়। সে হল মহুয়া ফুল, যেটা কোন দেবতার পূজায় লাগে না। কিন্তু জহিরের সাথে কথা বলে সে তার প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেনি। পিন্স আবার প্রেমে পড়ে। নচিকেতার গানটার মত, “একটা হৃদয় একবার নয় বারবার প্রেমে পড়ে”
বছর খানিক পরে জহির দেশে ফীরে আসে। প্রিন্স ইতিমধ্যে অনার্স শেষ করে ফেলে। মাস্টার্স এ ভর্তি হয়ে সে একটা পার্ট টাইম চাকরী করছে মহাখালীর এক কল সেন্টারে। হল ছেঁড়ে সে এখন ফার্মগেটের রাজাবাজারের এক মেসে উঠেছে। জহির ঢাকা পৌঁছে পিন্সের সাথে দেখা করার জন্য অস্থির হয়ে উঠে। প্রিন্স তাকে সেজান পয়েন্টের সামনে আসতে বলে।
প্রিন্স মাহবুব প্লাজা আর সেজান পয়েন্টের মাঝের গলিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে জহিরের জন্য। প্রিন্স জহিরকে আগে দেখেছে তানভীর আর সে যখন দেশে ছিল তখনকার একটা ছবিতে। কিন্তু জহির প্রিন্সকে দেখেনি। তাই প্রিন্সকে জিজ্ঞাস করে নিলো, কি পরে আছো তুমি? প্রিন্স জানালো সে একটা কালো টি-শার্ট আর ব্লু জিন্স পরে আছে। আধা ঘণ্টা দাঁড়ীয়ে থেকে জহিরের মোবাইলে কল দিল প্রিন্স। জহির ফোন ধরে না। প্রিন্স ভাবছে হয়তো সে ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেছে। আরও ঘণ্টা খানিক অপেক্ষা করে আবার কল করল জহিরকে। এইবার তার মোবাইল বন্ধ।
প্রিন্স বুঝতে পারছে সে আবার ও প্রতারিত হয়েছে। তার গায়ের রঙ এ সে বোধহয় ইতস্তত বোধ করে না দেখা করেই ফালিয়ে গেছে। প্রিন্স আবার ভাবতে থাকে কত বোকাই না সে, খুব সহজে মানুষকে বিশ্বাস করে আর ঠকে। অথচ এই জহির তাকে অনেক বার বলছে, বিদেশীদের সাদা চামড়া তার অসহ্য লাগে। তার কালো ভালো লাগে। পিন্স বুঝতে পারে, অনেক সুন্দর মানুষের মন পাতিল-তলার চেয়ে ও কালো। পিন্সের গায়ের রঙ অনেক কালো সে তাকে বার বার বলেছে। তারপর ও সে সম্পর্কে জোড়াল। আর আজ তাকে দেখে ফালিয়ে গেল। প্রিন্স ভাবতে থাকে সম্পর্ক থাকবে না থাকবে সেইটা পরের ব্যাপার, একজন মানুষ এতক্ষণ অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে তার জন্য, বিন্দু মাত্র মনুষ্যত্ব যদি তার কাছে থাকত, তাহলে না দেখা করে পালাত না। আসলে তথাকথিত অনেক সুন্দর মানুষেরই ভিতরটা ভীষণ অসুন্দর। কিন্তু আফসোস তাদের সহজে চেনার উপায় মানুষের অজানা।
ঐ দিন থেকে সে রীতিমত কসম কেটে প্রতিজ্ঞা করল, সে জীবনে ও আর কারো সাথে সম্পর্কে জড়াবে না। আসলে কি তাই? মানুষ কি পারে তার সব প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে। হুমায়ূন স্যার বলেছিলেন, “মানুষ প্রতিজ্ঞা করে প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গার জন্য”
প্রিন্স মাস্টার্স শেষ করে সুন্দর ভয়েসের সুবাদে বাংলালিংক এর কাস্টমার কেয়ারে চাকরী পেয়ে যায়। সে এখন আগের মত সহজে কাউকে বিশ্বাস করা থেকে বিরত। তাই চাকরী আর পরিবারের মধ্যে তার জগতটা সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা বেশী দিন ধরে রাখতে পারেনি। ২০১১ এর শেষের দিকের কথা।
এক কাস্টমার বাংলালিংক কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে। ফোনটা পিক করে পিন্সের সহকর্মী ইভা। ভদ্রলোক ফোন ধরেই ইভাকে অভদ্র ভাষায় যা ইচ্ছে তাই বলল। ইভা কিছুতেই তাকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। তার নাকি মোবাইল ব্যালেন্স বেশী কাটা হয়। এর আগে ও অনেক বার কমপ্লিন করেছে। কিন্তু তার সমস্যার কোন সুরাহা হয়নি। তাই আজকে সে অতিরিক্ত গরম। যদি তার হাতে একটা এটম বোম থাকত তাহলে সেইটা কোন হিরোশিমায় না মেরে বাংলালিংক এর ভবনে মারত। ইভা আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে কলটা প্রিন্সের কাছে টান্সফার করে। কারণ সবাই জানে প্রিন্সের সুমিষ্ট কণ্ঠের যাদু দিয়ে যে কোন মানুষকে বশে আনতে মিনিট খানিক লাগে। প্রিন্স কল ধরে বলল,
-বাংলালিংক কাস্টমার কেয়ার থেকে প্রিন্স বলছি, আপনাকে কি ভাবে সাহায্য করতে পারি?
কাস্টমার এইবার তার মুখে একটা গালি ঠিক করে সবে মুখ খুলবে, হঠাৎ করে তার রাগের জ্বলত শিখা নিবে গেল। ৫ মিনিটের মধ্যে প্রিন্স কাস্টমার কে বুঝিয়ে কলা দেখিয়ে লাইন কেটে দেয়। কিন্তু ঐ দিন লাইন কাটলে ও সেই কাস্টমার তার পিছু ছাড়েনি। সময় অসময় কাস্টমার কেয়ারে কল করে প্রিন্সের সাথে খোস গল্প করতে চায়। প্রিন্স প্রথম থেকেই তাকে অবহেলা করে আসছে। কিন্তু প্রতিদিন ফোন করে তার কাজের ১২টা বাজাচ্ছে দেখে একদিন নিজের মোবাইল থেকে তাকে কল করে বলল,
-ঐ মিয়া আপনার সমস্যা কি?
-আমার কোন সমস্যা নাই।
-তাহলে সময় অসময় অকাজে ফোন করেন কেন?
-আপনার কণ্ঠ আমার ভীষণ ভালো লাগে।
-তো আমি কি করতে পারি আপনার জন্য?
-কিছু না, এই যে এখন যেমন কথা বলছেন, এই ভাবে রোজ কথা বললেই চলবে?
-মাথা খারাপ নাকি?
-হুম ঠকই ধরেছেন, অনেকটাই সে রকম।
প্রথম দিন প্রিন্স তাকে যতটা খ্যাত মনে করেছে সে ততটা খ্যাত নয়। ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে কথা বলে, সাথে কবি সাহিত্যর ছোঁয়া ও আছে।
প্রিন্সের মোবাইল নাম্বার পেয়ে লোকটা আকাশের চাঁদ হাতে পেল। রাত নেই, দিন নেই প্রিন্সের মুণ্ডু ভেঙ্গে একাকার। কথায় কথায় জানতে পারল তার নাম ফারহান। দুবছর যাবত ব্যবসা করছে ঢাকাতে। পিন্স পাগল সামলানোর জন্য তাকে বন্ধুত্বের অপার দেয়। সে অকপটে তা কবুল করে নেয়। ঐ বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে রাতে একবার কলে কথা বলতে হয় প্রিন্সকে। ছয়মাস দুজন দুজনকে ফোন জানে। কিন্তু দেখা করার চিন্তা ও করেনি প্রিন্স। এক পর্যায়ে পিন্স বুঝতে পারে ফারহান তার মাঝে জায়গা করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। তার আগের দুটো অভিজ্ঞতার কথা মনে করে সে ফারহান কে বুঝিয়ে বলল, তার সাথে কথা বন্ধ করতে। কিন্তু ফারহান নাছোড় বান্দা, কথা না বলে থাকতে পারে না। অবশ্য প্রিন্সের ও একই দশা। প্রিন্স বুঝতে পারে ফারহান তার কাছে কি চায়, কিংবা তাদের সম্পর্কটা কোন দিকে মোড় নিতে পারে। তাই একদিন প্রিন্স ফারহানকে যেচে এসে তার অতীতের কষ্টের কথামালা শোনায়, ফারহান গম্ভীর হয়ে তাকে জানায়, দুনিয়ার সব মানুষ সমান নয়। তবে হ্যাঁ সে নিজে ও দেখতে ফর্সা, মাঝারী ধরনের ২৮ বছরের যুবক। তবে তার মাঝে বর্ণ নিয়ে কোন চুলকানি নেই। তার কাছে মানুষ শুধু মানুষ। তার কথা শুনে প্রিন্স নিজেকে আরও সতর্ক করে দেয়, আগের মত আবার ভুল করতে যাচ্ছে সে। তাই ফারহানকে অনেক কটু কথা বলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে পিন্স। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। ফারহান আগের মতই তার সাথে কথা বলে যায়। একদিন প্রিন্স খুব শান্ত ভাবেই তার সাথে আলোচনা করে বুঝাতে চেষ্টা করল,
-দেখ ফারহান, ইচ্ছে করলেই আমরা যা চাই তা করতে পারি না।
-মানুষ চেষ্টা করলে অনেক কিছুই করতে পারে?
-আমি তোমার সাথে তর্ক করতে চাই না। আমি শুধু তোমাকে বুঝাতে চাই, তুমি আমাকে বিরক্ত না করে তোমার মত কাউকে খুঁজে নাও। আমি কোন দিন ও তোমার সাথে দেখা করব না। সাদা চামড়ার প্রতি আমার অনেক রাগ বুঝলে, কারণ সাদা চামড়ার মানুষ রূপী কিছু পশুকে চিনতাম, তারা আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়েছে, রঙ সুন্দর হলেই মন সুন্দর হয় না।
-প্রিন্স আমি তোমার কথা অস্বীকার করছি না, সব সাদা চামড়ার মানুষ কিন্তু খারাপ নয়। শুধু সেই ভালো মানুষ গুলোকে খুঁজে নিতে হয়।
-দুঃখিত মশাই। আমার কোন সখ নাই কাউকে খোঁজার।
-প্রিন্স তোমাকে কিছু কথা বলি রাগ করবে না, ছেলে বেলা থেকে তোমার গায়ের রঙ নিয়ে তুমি অসন্তুষ্ট ছিলে। তাই ফর্সা মানুষদের তুমি অযাচিত ভাবেই ঘৃণা করতে। আর তোমার সেই ঘৃণাকে তেলে বেগুন দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, রতন আর জহির। প্রিন্স তুমি উচ্চশিক্ষিত একটা ছেলে বাস্তব সম্পর্কে বুঝতে চেষ্টা কর, তোমার জীবনে একটা দিন ও কি ছিল, যে দিন তুমি নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলে? একদিনের জন্য ও কি নিজের কালো রঙ মেনে নিয়ে নিজেকে ভালবেসেছিলে? একটা দিনের জন্যও কি নিজেকে সম্মানের আসনে বসিয়েছিলে? যে নিজেকে ভালোবাসে না, যে নিজেকে সম্মান করতে জানে না, সে কি ভাবে অন্যর ভালোবাসা প্রত্যাশা করে?
প্রিন্স কথা গুলো ভাবতে লাগল, আসলে ও তাই। সে কোন দিন ও নিজেকে নিয়ে সুখী ছিল না। তাই বোধহয় সুখ নামের পাখীটা তার জীবনে ধরা দেয়নি। নিজেকে অন্যর কাছে ছোট করা থেকে উদ্ধার করতে মাথার মধ্যে কিছু যুক্তি ঠিক করে আবার উত্তর দিল ফারহান কে?
-ফারহান, আমি ও তোমার কথা অস্বীকার করছি না। হ্যাঁ হয়তো তুমি রাইট, আচ্ছা তুমি কি আমাকে একজন স্মার্ট, হ্যান্ড-সাম মানুষ দেখাতে পারবে, যে নিজেকে নিয়ে বিন্দু মাত্র অহংকার মনে পুষে রাখে না? যে কোন দিন একটি বারের জন্য ও ভাবেনি, সে আট দশ জন থেকে উন্নত প্রজাতির কেউ একজন। হয়তো হাতে গোনা দু একজন ভিন্ন হতে পারে, তারা হয়তো মানুষের ঊর্ধ্বে। তা না হলে পৃথিবীর সব মানুষই কম বেশী সুন্দরের পূজারী।
-প্রিন্স, তোমার কথা পুরোপুরি মিথ্যে নয় হয়তো, কিন্তু তাই বলে সবাইকে একই ছাঁচে ফেলে নিজস্ব রঙে রাঙানো কি ঠিক? আগে তুমি নিজেকে শূদ্রাও পরে অন্যকে জাজমেন্ট কর। তুমি আগে নিজেকে মেনে নাও তুমি যা তাতেই হ্যাপি। দেখবে তুমি আবার মানুষকে বিশ্বাস করতে পারবে। দেখবে তোমার জীবনে একজন আসবে যে তোমার ভিতরের সব কষ্ট নিজের করে তোমাকে হাল্কা করে দিবে। কালো যদি না থাকত তাহলে মানুষ সুন্দরের মর্ম বুঝত না। কালো মটেও কুৎসিত নয়, দেখ কবি কি বলেছেন,
কালো চোখের তারা দিয়েই সকল ধরা দেখি,
কালো দাতের কালি দিয়েই কেতাব কোরাণ লেখি|
জনম কালো, মরণ কালো, কালো ভূবনময় ;
চাষীদের ওই কালো ছেলে সব করেছে জয়|
প্রিন্স কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবতে থাকে ফারহানের কথা গুলো, তারপর বলে,
-হয়েছে হয়েছে, মৃত জসীমউদ্দিন সাহেব কে নকশী কাঁথার মাঠ থেকে এই ঢাকা শহরে টেনে না আনলে ও চলবে। আর সত্যি কথা বলতে কি, একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সভ্য আধুনিক মানুষগুলো কম বেশী বর্ণবাদে বিশ্বাসী, যদি সবাই নেলসন ম্যান্ডেলার বর্ণবাদে বিপক্ষের কথা গুলো বুঝতে পারত, তাহলে কালো সাদার জন্য বিশ্বের কিছু মানুষ এখনো প্রাণ হারাত না।
ঐ দিনের পর থেকে প্রিন্স অনেকখানি বদলে যেতে লাগল, সে নিজেকে একসেপ্ট করতে শিখল, সে কালো, সে যা আছে তাই ভালো। সে সমকামী সেটাও ও মেনে নিলো। এখন আর আগের মত তার মন খারাপ হয় না। এ দিকে ফারহানের সাথে সম্পর্কটা ও জমে গেল। কিন্তু দেখা করাতে প্রিন্সের যত আপত্তি। ফারহান হাজার বার বলেছে দেখা করার জন্য, কিন্তু প্রিন্স ঐ একই কবিতা পড়ে দিয়েছে। দেখা সে করবে না।
দুই বছর হয়ে গেল তাদের বন্ধুত্ব হোক আর ভালোবাসা হোক এখনো টিকে আছে। এক রাতে মোবাইলে কথা বলছে ফারহান। প্রিন্স তার বাসায় শুয়ে আর ফারহান তাদের ডুপ্লেক্স বাড়ীর দোতলার সিঁড়িতে হাঁটতে হাঁটতে। হঠাৎ করে পা মোচড় খেয়ে পিছলে পড়ে যায় ফারহান। এ দিকে প্রিন্স হ্যালো হ্যালো করছে, কোন কথা নাই। প্রিন্স বুঝতে পারে ফারহানের কোন প্রবলেম হয়েছে, কিন্তু সেইটা কি বুঝতে পারছে না। বার বার কল কেটে, কল করছে। কেউ ধরছে না। সে কিছুতেই ঘুমাতে পারছে না। ফারহানের সাথে দেখা করার ইচ্ছে ছিল না বিধায় তার বাসার ঠিকানাটা কোন দিন ও জানতে চায়নি প্রিন্স। বারান্দায় আর ঘরে পায়চারি করতে লাগল, রাত সাড়ে চারটার দিকে প্রিন্সের মোবাইলে কল দিতেই কে যেন মোবাইল ধরল,
-হ্যালো ফারহান।
-ফারহান ভাইজান তো হাসপাতালে।
-কি হয়েছে তার, আপনি কে?
-আমি হেগো বাড়িত কাম করি।
-ফারহানের কি হয়েছে সে কোন হসপিটালে আছে?
-ভাইজান রাইতের বেলা কার লগে কতা কইতে গিয়ে ঠেং পিছলাইয়া পইরা গেছে। হেয় অখন সেন্ট্রাল হসপিটালে আছে।
প্রিন্স বুঝতে পারছে না কি করবে? এই ভোর রাতে হসপিটালে যাবে নাকি সকাল বেলায়?
মনের সাথে যুদ্ধ করে সে সিদ্ধান্ত নিলো এখন নয় রাতে হয়তো তার পরিবারের সবাই আছে ওখানে এ অবস্থায় গেলে তার জন্য অস্বস্তিকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। সকাল ১০টা নাগাদ হাতে এক গুচ্ছ ফুল নিয়ে সেন্ট্রাল হসপিটালে আসে প্রিন্স।
ফারহান চোখ বন্ধ করে হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে। তার মা তার পাশেই বসে আছে। উনার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে উনি অনেক কেঁদেছেন। প্রিন্স ফারহানকে যত টা সুন্দর মনে করেছিল ফারহান তার থেকে কয়েক গুন বেশী সুন্দর। মনে হচ্ছে সাদা বিছানায় ফর্সা এক দেবদূত শুয়ে আছে। প্রিন্স কেবিনের এক কোনে হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়ীয়ে আছে। ফারহানের মা তাকে আস্তে করে ডেকে তুলল,
-ফারহান তোর সাথে এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছেন।
ফারহান চোখ খুলে প্রিন্সের দিকে তাকায়। প্রিন্স কিছু বলতে গিয়ে ও থেমে যায়, আবেগে সে বাকযুদ্ধ হয়ে যায়। ফারহান মুখে এক চিলতে হাঁসি এনে চোখের ইশারায় তাকে বসতে বলে। আর সে যে প্রিন্স, এক নিমিষে ফারহান বুঝতে পারল। প্রিন্স ভাবছে, এই দেবদূতের সাথে সে সম্পূর্ণ রূপে বেমানান। আর তাকে দেখে আগের দুজনের মত ফারহান ও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিবে। তাতে প্রিন্সের কিচ্ছু যায় আসে না। সে এখন নিজেকে ভালোবাসে, সে জানে মানুষের সৌন্দর্য গায়ের রঙে নয়, তার ব্যক্তিত্বে আর মনুষ্যত্বে। ফারহান মাকে বলে,
-মা উনার সাথে আমার প্রাইভেট কিছু কথা আছে। যদি কিছু মনে না কর তুমি কি কিছুক্ষণের জন্য বাহীরে যাবে?
ফারহানের মা কিছু মনে না করে বলে,
-শিউর, তোরা কথা বল আমি বাহীরে থেকে হেঁটে আসি।
ফারহানের মা কেবিন থেকে বের হওয়ার আগে প্রিন্সকে বলে,
-একি বাবা তুমি দাঁড়ীয়ে কেন? চেয়ারটা টেনে বস।
ফারহানের মা চলে যাওয়ার পর, দুজনের কোন কথা নেই। শুধু প্রিন্স সাথে করে আনা ফুল গুলো ফারহানের দিকে বাড়ীয়ে দিল, বিনিময়ে ফারহান তাকে থ্যাংকস বলে।
ফারহান প্রথম নীরবতা ভেঙ্গে মুখ খুলে,
-কেমন ছিলে?
-জানি না।
-কেন জানো না?
-কি জন্য যে জানি না তাও ও জানি না।
-প্রিন্স তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি এখন নিজেকে ভালবাসতে শিখেছ। তোমার মাঝে একটা আত্মবিশ্বাসের আবাস দেখতে পাচ্ছি। আমি কি রাইট?
-জানোই যখন, তখন জিজ্ঞাস করছ কেন?
-তোমাকে ইজি করতে। কারণ আমাকে দেখে তুমি একটা শঙ্কায় আছো, আমি তোমাকে একসেপ্ট করি কি না করি। এম অ্যাই রাইট?
-জানোই যখন তখন প্রশ্ন করে বিব্রত করছ কেন?
-ইচ্ছে করে। গত দুইবছর সময় লেগেছে তোমাকে দেখতে। প্রিন্স তুমি কি জানো তুমি দেখতে সত্যি অনেক সুন্দর।
প্রিন্সের চোখে কোণে পানি জমে গেল ফারহানের কথা শুনে। তার জীবনে এই প্রথম কেউ তাকে সুন্দর বলেছে সেইটা কটাক্ষ করে নয়। প্রিন্স বলে,
-আর কিছু?
-হুম আরও অনেক কিছু, ওত দূরে কেন? কাছে এসে বস।
প্রিন্স দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে ফারহানের কাছ ঘেঁষে বসে। ফারহান তার একটা হাত দিয়ে প্রিন্সের একটা হাত বুকে চেপে ধরে বলে,
-প্রিন্স তোমাকে দেখার পর ও আমি তোমাকে ঠিক আগের মতই ভালোবাসি। তোমার রঙ নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। আমি তোমাকে ভালবেসেছি না দেখেই। আর তোমাকে তোমার জন্যই ভালবাসতে চাই। তুমি যা আছ, তার জন্যই ভালবাসতে চাই। একদিনের জন্য নয়, যুগ যুগ ধরে ভালোবেসে ও আমি ক্লান্ত হব না প্রিন্স। অ্যাই রিয়েলি রিয়েলি লাভ ইয়উ।
ফারহানের কথা শুনে আবেগে প্রিন্স নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ঝাঁপিয়ে পড়ে ফারহানের বুকের উপরে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁপে উঠে পিন্সের বুক। কাল সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে ফারহান বাম হাতে প্রচণ্ড ব্যথা পায়। হাতটা চাদরে ডাকা, তাই প্রিন্স দেখতে পায়নি। প্রিন্স জড়িয়ে ধরাতে ফারহান ব্যথা পাচ্ছে তারপরে ঐ ব্যথা নিয়ে জড়িয়ে ধরে রেখেছে প্রিন্সকে। কারণ ফারহান আগেই বলেছে তার সমস্ত ব্যথা সে নিজের করে নিবে।
অবশেষে প্রিন্স খুঁজে পেল তার সত্যিকারের ভালোবাসার রঙ। ফারহান তার সারা জীবন রাঙিয়ে রাখবে তাকে রঙধনুর সাতরঙে। সত্যিকার প্রেমিক কখনো রঙ নিয়ে ভালোবাসার বাণিজ্য করে না। ভালোবাসা তো স্রেফ ভালোবাসাই হয়, ওতে কালো আর সাদার তফাৎ খুঁজতে যাওয়া কোন সত্যিকার প্রেমিকের কর্ম নয়।
Thursday, 27 February 2014
লস্ট ইন প্যারাডাইসহট বয় নই লোয়ান
অদ্ভূত নামের কিছু সাধারন
চরিত্রের মাধ্যমে পরিচালক “নাগক ডাং
ভূ” আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করেছেন আমাদের জীবনবোধ, বোঝাতে চেষ্টা করেছেন সমকামি জীবনের অপ্রিয় সত্য। ভিয়েতনামের এই
পরিচালক তার নিজ দেশের প্রেক্ষাপটে সমকামীদের জীবনের যেই চিত্র তুলে ধরেছেন তা
সারা বিশ্বে একই রকম। আমি ভিয়েতনামিজ ভাষা বুঝেন না, তাতে
কি সাবটাইটেল তো আছেই। মুভিটিতে প্রতিটা চরিত্রের অভিনয় এত শক্তিশালী যে একটি
বারের জন্যও আমার সাবটাইটেলের দিকে তাকাতে হবে না। ভিনদেশী ভাষায় নির্মিত এই মুভিটি
মনের সাথে সাথে আত্মাকে ছুঁয়ে যাবে।
গল্প সংক্ষেপঃ
নিজের সমকামীতার কথা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবার কর্তৃক বিতাড়িত এক যুবকের থাইল্যান্ড শহরের নিজের অস্তিত্ব খোঁজার গল্প হচ্ছে এই মুভির প্রধান কাহিনীকে। শহরের মানুষের তার সাথে ধোকাবাজি আর ভালোবাসার মানুষের ব্যাক্তিগত সিদ্ধান্ত সবকিছু কিভাবে এক সমকামী যুবকের ভাগ্য নির্ধারন করে তাই অভিনব কৌশলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন পরিচালক।
খই
আমি খই। এই মুভির প্রধান চরিত্র। আমাকে ঘিরেই সিনেমাটির সমস্ত কাহীনি আবর্তিত। নিজ গ্রামে সমকামী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় পরিবার এবং সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে ভাগ্য অন্বেষনে চলে আসি শহরে। থাকার একটি যায়গার জন্য হন্যে হয়ে যখন ক্লান্ত তখন ডং আমাকে তার সাথে ফ্ল্যাট শেয়ার করার প্রস্তাব দেয়। শহরে এসেই এমন বন্ধ্ত্ব আমি কখনই আশা করিনি। নিজের ভিতর এত ভালো লাগে যে এক প্রস্তাবেই রাজি হয়ে যাই। আমি জানতাম না এই বন্ধুত্বের পিছনে কতবড় প্রতরনা লুকিয়ে ছিলো। আমি যখন নিজের অংশের ফ্ল্যাট ভাড়ার টাকা চুকিয়ে তাদের প্ল্যান মত বাথরুমে গোসল করতে যাই তখন ডং আর তার প্রেমিককে আমার সব জিনিসপত্র দিয়ে প্রথমে ঘর থেকে বের করে দেয় আর তার পর খুব কৌশলে বাথরুমে ঢুকে আমার কাপড় চোপড় নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরনে কোন বস্ত্র না থাকায় আমি তাদের পিছনে যেতে পারিনা। শহরে এসে এই প্রতারনায় নিজের মন ভেঙ্গে চুরচুর হয়ে যায়। মানুষ এতবড় প্রতারক এবং অমানুষ হতে পারে আমার জানা ছিলোনা। পরনে কাপড় নাই, থাকার যায়গা নাই, পেটে খাবার নাই, এমতাবস্থায় কি করবো কিছুই মাথায় আসছিলোনা। লেগে গেলাম দিন মজুরীতে। সামান্য মজুরীতে নিজের পেট ভরাব মত কিছু টাকা জোগাড় করেই দিন পার করছি এখন। আপাতত এখানে আমার কথা বিরতি দিয়ে চলুন শুনি আমারি মত প্রতারিত “লেম” এর কথা...
লেম
আমিও খই এর মত প্রথম যেদিন এই শহরে আমি তখন খুব অসহায় ছিলাম। নিজে সমকামী ছিলাম তাই আরেকজন সমকামীকে চিনে নিজেকে মানিয়ে নিতে সময় লাগেনি। যেই সমকামীর সাথে আমি নিজেকে নিরাপদ ভেবেছিলাম সেই যে আমাকে তার লালসা আর ব্যবসার উপকরণ বানাচ্ছে তা বুঝতে পারি অনেক পরে। আর সব সমকামীর মত আমিও সরল বিশ্বাসে আমার সকবিছু দিয়ে ভালোবেসেছিলাম ডং কে। আর ডং আমার সাথে শুধু ভালোবাসার অভিনয় করেছে। তার ভালোবাসার জন্য হেন কোন কাজ নেই যা আমি করিনি। নিজে একজন ভালোবাসার মানুষ থেকে খুব সহজেই বেশ্যা হয়েছি। সাধারন মানুষকে পদে পদে ঠকিয়েছি। যার মধ্যে খই ও একজন। আমি ডং কে অনেক ভালোবাসি তাই কখনো ওর শত অত্যাচার এবং অন্যায় কাজকর্ম দেখার পরও ছেড়ে যেতে পারিনি। উপরন্তু সঙ্গ দিয়েছি দিনের পর দিন। কিন্তু খই এর সাথের প্রতারনা আমাকে বদলে দেয়। আমাকে অনেকদিন পর সাহস যোগায় প্রথম প্রেম ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে। আমি ডং এর সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেও তার কাস্টমার নেটওয়ার্কে মাধ্যমে সে আমাকে খুঁজে কোন না কোনভাবে বের করেই ফেলে। তাই পালাতে গিয়েও তার কাছ থেকে রেহাই হয়না আমার।
খই
কাজ করতে করতে ছাদ থেকে পড়ে নিজের এক হাত এবং এক পা জখম করে রাস্তায় বসে যাই আমি। নিজের জীবনের কাঝে যখনই হারতে বসব তখনই লেমকে দেখে নিজের ভিতরের অনেক দিনের জমানো ক্রোধ জমা হয়ে আগ্নেয়গিরি হয়ে বের হয়ে আসে। আহত শেয়ালের মত বাঘের উপর ঝাপিয়ে পড়ি। আমি জানি তার সাথে আমি পেরে উঠবোনা, তাও মনকে কোন ভাবে সামলাতে পারিনি। যাই হোক, লেম তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায় এবং নিজের ভূল শোধরানোর জন্য আমাকে তার সাথে বাসায় নিয়ে যায়। আমাকে সেবা সুশ্রুষা করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। প্রথম দিন থেকেই তার আদর যত আর বিশ্বস্ততায় ভালোবেসে ফেলি তাকে। মন থেকে, প্রাণ থেকেও।
লেম
আমিও তোমাকে ভালোবাসি খই, তবে বলতে পারছিনা কেমন ভালোবাসা এইটা। জীবনে এত প্রতারণা দেখেছি যে ভালোবাসা নামক শব্দটা থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে। প্রতি রাতে নতুন নতুন খদ্দেরের সাথে দেহ বিকিয়ে মানুষর কুৎসিত চেহারা গুলো এমন ভাবেই মনের ভিতর বসে গেছে যে ভালোবাসা কোনভাবেই সেখান থেকে শুভ্র এক আলো নিয়ে কখনই উঠে আসতে পারবেনা। তবে আমি তোমাকে ভালোবাসি।
খই
ভালোবাসার দোহাই দিয়ে আমি লেমকে তার এই দেহ ব্যবসা থেকে ফেরাতে পারিনি। লেম নিজেকে একজন পেশাদার বেশ্যা হিসেবে দাবী করে। তার মতে এটাই তার ভাগ্য। আর সে এটাকে ছাড়তে পারবেনা। সমকামী জীবনের অনেক রূপ সে দেখেছে, সমকামী জীবনে ভালোবাসা মানেই বিনা খরচে কারো কাছে দেহ ভোগ করার মত। তার ভয় সে এই ব্যবসা ছেড়ে কারো সাথে সৎ জীবন যাপন শুরু করলেও তা খুব বেশীদিন স্থায়ী হবেনা। কখনও না কখনও আমি তাকে তার এই অতিত নিয়ে অপমান করব, আমাদের সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবে এবং অতঃপর তাকে আবারও এই ব্যবসাতেই ফিরে আসতে হবে তাহলে কেনই এই অভিনয় করা। আমি কখনই আমার ভালোবাসা দিয়ে লেমের ভিতর ভালোবাসা নিয়ে যেই ভয় তা ভাঙ্গাতে পারিনি জন্ম দিতে পারিনি এক নতুন আশার। আমার প্রতি তার পূর্ণ ভালোবাসা থাকলেও সে এভাবেই থাকতে চায় আর আমার পক্ষে আমার জীবন সাথীকে আমার সাথে থাকা অবস্থায় অন্য কারো সাথে ভাগ করে গ্রহণ করা কোন ভাবেই সম্ভব না। তাই তাকে ছেড়ে একটা সাধারন চাকরী নিয়ে নিজের ছুটে যাওয়া পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে শহর থেকে শহরে পাড়ি জমাই।
লেম
খই চলে যাওয়াতে জীবন আমার অন্ধকারের চাইতেও অন্ধকার আর নিরাশার চেয়ে বেশী রকম হতাশায় ডুবে যেতে থাকে। এখন আর নিজের দেহ কারো লালসার বলি করতে ইচ্ছে করেনা। করে প্রতারনার সেই খেলা খেলতে যা সারাজীবন মানুষ নামের অমানুষগুলো আমার সাথে খেলে এসেছে। আমাদের এই ব্যবসায় রাস্তা থেকে কাস্টমাররা তাদের পছন্দমত যায়গায় তুলে নিয়ে আমাদের ভোগ করে। খুব সামান্য টাকাতেই আমাদের ভোগের পণ্য করতে পারে তারা। অনেক সময় আমাদের নিয়ে ভোগের বদলে করে অমানুষিক নির্যাতন। তাই আজ আমিও কোমর বেঁধে নেমেছি তাদের সেই প্রতারণা সুদে আসলে তাদের ফিরিয়ে দিতে। আর আমার এই জীবন ধারনই আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী।
এই শহরের রাস্তায় ছেলে যৌন কর্মীর সাথে সাথে আছে মেয়েরাও। আমাদের সিদ্ধান্ত আমাদের হলেও মেয়েদের বেলায় তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেয়েদের যে কোন মহাজনের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে হয়। তেমনি একজন যৌন কর্মী “ঘান” যে কিনা এক টোকাইয়ের ভালোবাসায় নিজের উপর সমস্ত নির্যাতন ভুলে যায়। নিজের মহাজনকে খুশী করতে ঝড় বাদল, শীত অথবা অসুস্থতা নিয়েও কাজ করতে হয়। নিজের মাসিকের সত্যতা প্রমাণ করতে সবার সামনে নিজের কাপড় খুলে প্রমাণ দেখাতে হয় তাকে। কিন্তু নিজের ভালোবাসার উপর যখন কেউ আঘাত হানে তখন সহ্য করতে পারেনা সে। নিজের মহাজন আর মহাজনের রক্ষককে খুন করে কারাগারে চলে যায় সে।
গল্প সংক্ষেপঃ
নিজের সমকামীতার কথা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবার কর্তৃক বিতাড়িত এক যুবকের থাইল্যান্ড শহরের নিজের অস্তিত্ব খোঁজার গল্প হচ্ছে এই মুভির প্রধান কাহিনীকে। শহরের মানুষের তার সাথে ধোকাবাজি আর ভালোবাসার মানুষের ব্যাক্তিগত সিদ্ধান্ত সবকিছু কিভাবে এক সমকামী যুবকের ভাগ্য নির্ধারন করে তাই অভিনব কৌশলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন পরিচালক।
খই
আমি খই। এই মুভির প্রধান চরিত্র। আমাকে ঘিরেই সিনেমাটির সমস্ত কাহীনি আবর্তিত। নিজ গ্রামে সমকামী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় পরিবার এবং সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে ভাগ্য অন্বেষনে চলে আসি শহরে। থাকার একটি যায়গার জন্য হন্যে হয়ে যখন ক্লান্ত তখন ডং আমাকে তার সাথে ফ্ল্যাট শেয়ার করার প্রস্তাব দেয়। শহরে এসেই এমন বন্ধ্ত্ব আমি কখনই আশা করিনি। নিজের ভিতর এত ভালো লাগে যে এক প্রস্তাবেই রাজি হয়ে যাই। আমি জানতাম না এই বন্ধুত্বের পিছনে কতবড় প্রতরনা লুকিয়ে ছিলো। আমি যখন নিজের অংশের ফ্ল্যাট ভাড়ার টাকা চুকিয়ে তাদের প্ল্যান মত বাথরুমে গোসল করতে যাই তখন ডং আর তার প্রেমিককে আমার সব জিনিসপত্র দিয়ে প্রথমে ঘর থেকে বের করে দেয় আর তার পর খুব কৌশলে বাথরুমে ঢুকে আমার কাপড় চোপড় নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরনে কোন বস্ত্র না থাকায় আমি তাদের পিছনে যেতে পারিনা। শহরে এসে এই প্রতারনায় নিজের মন ভেঙ্গে চুরচুর হয়ে যায়। মানুষ এতবড় প্রতারক এবং অমানুষ হতে পারে আমার জানা ছিলোনা। পরনে কাপড় নাই, থাকার যায়গা নাই, পেটে খাবার নাই, এমতাবস্থায় কি করবো কিছুই মাথায় আসছিলোনা। লেগে গেলাম দিন মজুরীতে। সামান্য মজুরীতে নিজের পেট ভরাব মত কিছু টাকা জোগাড় করেই দিন পার করছি এখন। আপাতত এখানে আমার কথা বিরতি দিয়ে চলুন শুনি আমারি মত প্রতারিত “লেম” এর কথা...
লেম
আমিও খই এর মত প্রথম যেদিন এই শহরে আমি তখন খুব অসহায় ছিলাম। নিজে সমকামী ছিলাম তাই আরেকজন সমকামীকে চিনে নিজেকে মানিয়ে নিতে সময় লাগেনি। যেই সমকামীর সাথে আমি নিজেকে নিরাপদ ভেবেছিলাম সেই যে আমাকে তার লালসা আর ব্যবসার উপকরণ বানাচ্ছে তা বুঝতে পারি অনেক পরে। আর সব সমকামীর মত আমিও সরল বিশ্বাসে আমার সকবিছু দিয়ে ভালোবেসেছিলাম ডং কে। আর ডং আমার সাথে শুধু ভালোবাসার অভিনয় করেছে। তার ভালোবাসার জন্য হেন কোন কাজ নেই যা আমি করিনি। নিজে একজন ভালোবাসার মানুষ থেকে খুব সহজেই বেশ্যা হয়েছি। সাধারন মানুষকে পদে পদে ঠকিয়েছি। যার মধ্যে খই ও একজন। আমি ডং কে অনেক ভালোবাসি তাই কখনো ওর শত অত্যাচার এবং অন্যায় কাজকর্ম দেখার পরও ছেড়ে যেতে পারিনি। উপরন্তু সঙ্গ দিয়েছি দিনের পর দিন। কিন্তু খই এর সাথের প্রতারনা আমাকে বদলে দেয়। আমাকে অনেকদিন পর সাহস যোগায় প্রথম প্রেম ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে। আমি ডং এর সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেও তার কাস্টমার নেটওয়ার্কে মাধ্যমে সে আমাকে খুঁজে কোন না কোনভাবে বের করেই ফেলে। তাই পালাতে গিয়েও তার কাছ থেকে রেহাই হয়না আমার।
খই
কাজ করতে করতে ছাদ থেকে পড়ে নিজের এক হাত এবং এক পা জখম করে রাস্তায় বসে যাই আমি। নিজের জীবনের কাঝে যখনই হারতে বসব তখনই লেমকে দেখে নিজের ভিতরের অনেক দিনের জমানো ক্রোধ জমা হয়ে আগ্নেয়গিরি হয়ে বের হয়ে আসে। আহত শেয়ালের মত বাঘের উপর ঝাপিয়ে পড়ি। আমি জানি তার সাথে আমি পেরে উঠবোনা, তাও মনকে কোন ভাবে সামলাতে পারিনি। যাই হোক, লেম তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায় এবং নিজের ভূল শোধরানোর জন্য আমাকে তার সাথে বাসায় নিয়ে যায়। আমাকে সেবা সুশ্রুষা করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। প্রথম দিন থেকেই তার আদর যত আর বিশ্বস্ততায় ভালোবেসে ফেলি তাকে। মন থেকে, প্রাণ থেকেও।
লেম
আমিও তোমাকে ভালোবাসি খই, তবে বলতে পারছিনা কেমন ভালোবাসা এইটা। জীবনে এত প্রতারণা দেখেছি যে ভালোবাসা নামক শব্দটা থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে। প্রতি রাতে নতুন নতুন খদ্দেরের সাথে দেহ বিকিয়ে মানুষর কুৎসিত চেহারা গুলো এমন ভাবেই মনের ভিতর বসে গেছে যে ভালোবাসা কোনভাবেই সেখান থেকে শুভ্র এক আলো নিয়ে কখনই উঠে আসতে পারবেনা। তবে আমি তোমাকে ভালোবাসি।
খই
ভালোবাসার দোহাই দিয়ে আমি লেমকে তার এই দেহ ব্যবসা থেকে ফেরাতে পারিনি। লেম নিজেকে একজন পেশাদার বেশ্যা হিসেবে দাবী করে। তার মতে এটাই তার ভাগ্য। আর সে এটাকে ছাড়তে পারবেনা। সমকামী জীবনের অনেক রূপ সে দেখেছে, সমকামী জীবনে ভালোবাসা মানেই বিনা খরচে কারো কাছে দেহ ভোগ করার মত। তার ভয় সে এই ব্যবসা ছেড়ে কারো সাথে সৎ জীবন যাপন শুরু করলেও তা খুব বেশীদিন স্থায়ী হবেনা। কখনও না কখনও আমি তাকে তার এই অতিত নিয়ে অপমান করব, আমাদের সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবে এবং অতঃপর তাকে আবারও এই ব্যবসাতেই ফিরে আসতে হবে তাহলে কেনই এই অভিনয় করা। আমি কখনই আমার ভালোবাসা দিয়ে লেমের ভিতর ভালোবাসা নিয়ে যেই ভয় তা ভাঙ্গাতে পারিনি জন্ম দিতে পারিনি এক নতুন আশার। আমার প্রতি তার পূর্ণ ভালোবাসা থাকলেও সে এভাবেই থাকতে চায় আর আমার পক্ষে আমার জীবন সাথীকে আমার সাথে থাকা অবস্থায় অন্য কারো সাথে ভাগ করে গ্রহণ করা কোন ভাবেই সম্ভব না। তাই তাকে ছেড়ে একটা সাধারন চাকরী নিয়ে নিজের ছুটে যাওয়া পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে শহর থেকে শহরে পাড়ি জমাই।
লেম
খই চলে যাওয়াতে জীবন আমার অন্ধকারের চাইতেও অন্ধকার আর নিরাশার চেয়ে বেশী রকম হতাশায় ডুবে যেতে থাকে। এখন আর নিজের দেহ কারো লালসার বলি করতে ইচ্ছে করেনা। করে প্রতারনার সেই খেলা খেলতে যা সারাজীবন মানুষ নামের অমানুষগুলো আমার সাথে খেলে এসেছে। আমাদের এই ব্যবসায় রাস্তা থেকে কাস্টমাররা তাদের পছন্দমত যায়গায় তুলে নিয়ে আমাদের ভোগ করে। খুব সামান্য টাকাতেই আমাদের ভোগের পণ্য করতে পারে তারা। অনেক সময় আমাদের নিয়ে ভোগের বদলে করে অমানুষিক নির্যাতন। তাই আজ আমিও কোমর বেঁধে নেমেছি তাদের সেই প্রতারণা সুদে আসলে তাদের ফিরিয়ে দিতে। আর আমার এই জীবন ধারনই আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী।
এই শহরের রাস্তায় ছেলে যৌন কর্মীর সাথে সাথে আছে মেয়েরাও। আমাদের সিদ্ধান্ত আমাদের হলেও মেয়েদের বেলায় তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেয়েদের যে কোন মহাজনের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে হয়। তেমনি একজন যৌন কর্মী “ঘান” যে কিনা এক টোকাইয়ের ভালোবাসায় নিজের উপর সমস্ত নির্যাতন ভুলে যায়। নিজের মহাজনকে খুশী করতে ঝড় বাদল, শীত অথবা অসুস্থতা নিয়েও কাজ করতে হয়। নিজের মাসিকের সত্যতা প্রমাণ করতে সবার সামনে নিজের কাপড় খুলে প্রমাণ দেখাতে হয় তাকে। কিন্তু নিজের ভালোবাসার উপর যখন কেউ আঘাত হানে তখন সহ্য করতে পারেনা সে। নিজের মহাজন আর মহাজনের রক্ষককে খুন করে কারাগারে চলে যায় সে।

আজ সেই যৌন পল্লী আর যৌন পল্লী নেই সেখানে এই সকল ঘটনার পর গড়ে তোলা হয় অভিনব বহুতল বিপনী বিতান। স্থানান্তরীত করা হয় যৌনকর্মীদের অন্যত্র। কিন্তু এই অভিবাসন কি পারবে যৌনকর্মীদের তাদের পেশা থেকে তাদের ফিরিয়ে আনতে। পারবে কি তাদের জীবনের নিরাপত্তা দিয়ে সরকার সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনতে তাদের? জানি পারবেনা, তবুও মানুষের মিথ্যে অভিনয় দেখতে খুব একটা খারাপ লাগেনা, মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে খুব। সত্যিকারের বিশ্বাস।
মুভিটি পরিচালনা করেছেন- নাগক ডাং ভূ
প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন- মান হাই লং (লেম), ভিন খোয়া হো (খই)
মুক্তির সাল- ২০১১
মুভিটির দৈর্ঘ্য- ১০৩ মিনিট
আই.এম.ডি.বি তে মুভিটির রেটিং-৬.৬/১০
মোট পাঠকঃ
ফেসবুকে লাইক দিন
প্রিয় লেখক,
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ
-
মিসেস রহমান দুপুরের রান্না চড়িয়েছেন। চুলায় তরকারীর কড়ই। বলক দিচ্ছে। এমন সময় দরজা খোলার শব্দ হলো। তার স্কুল পড়ুয়া ছেলে বাড়ী ফিরে এসেছে। কিছ...
-
è আমি আবারো বলব, এটা ঠিক নয় রেজোয়ান। এটা অন্যায়। এটা এক ধরণের ফাঁদ। আমি কিছুতেই এটাকে সমর্থন করিনা। è শুভ্র, আমি তোমাকে কিছু সমর্থ...
-
আমি অনিক। বাবা মা’র একমাত্র ছেলে। স্বাভাবিকভাবেই অতি আদরের, তা তো বুঝতেই পারছেন। বাবা-মা দুজনেই চাকরিজীবী। বড় বোনেরও বিয়ে হয়ে গেছে। অতি আদ...
-
আজ সকালে যখন হাঁটছিলাম, একবুড়ো নিজে থেকে এসে পরিচিত হলো। কথা বলতে বলতে যৌনাঙ্গ ছুঁয়ে দিলো, তারপর যখন দেখলো আমি কোন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি না...
-
মুহিবুল হাসান খোকন। বছর বাইশের এক তাগড়া যুবক। ইদানিং বাসায় ফিরেই কম্পিউটারে বসা তার একটা নেশার মত হয়ে গেছে। কি এক অজানা আকর্ষণ তাকে চুম্বকে...
-
সামনে বিস্তীর্ণ চারণভূমি। বর্ষার শেষে যা তিন গ্রামের আমিষের চাহিদা মেটায়। আবার ঋতুর বদলে কখনো ঈরির বলক, কখনো হলদেছেটা সরষে ক্ষেত, আবার কখনো...
-
আর্কিটেক্ট মালিক তার বাবার মৃত্যুর খবর শুনে ফ্রান্স থেকে তিউনিসিয়াতে তার মা সার'র সাথে দেখা করতে আসে। স্বামীর মৃত্যুর পর সারা তার নিজের ...
-
রেবেকা কাদাগা, উগান্ডার জাতীয় সংসদের স্পিকার বলেছেন তার দেশে খুব শীঘ্রই সমকামিতা বিরোধী আইন পাস হবে। সাম্প্রতিক কানাডা সফরে তিনি গে বিরোধীদে...
-
ছেলেটির বয়স ২০ বছর। নাম কি ছেলেটার? নাম না হয় অজানাই থাক। গাঁয়ের রঙ বলে দিচ্ছে সে নিগ্রো। দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। দক্ষিণ আফ্রিকা হচ্ছে নেলসন ম...
-
আমি শোভন। থাকি মিরপুরের মধ্য পাইকপাড়া নিজেদের একতলা বাড়ীতে আমার পরিবারের সাথে। পরিবারে আমি, আমার মা, বাবা, বড় ভাইয়া, সুইট ভাবি আর আমার নটি...
লেখকঃ
অনু পম
(46)
আনন্দ ধারা
(6)
উইন্ডি স্ট্রম
(5)
গে ম্যুভি
(5)
সমকামিতা
(4)
এক্সট্রিম নয়েজ
(2)
এশিয়া
(2)
জিতু আহমেদ
(2)
নীল মেঘ
(2)
শোভন কুমার
(2)
হাসান শুভ্র
(2)
অজানা সমুদ্র
(1)
অপটিমিস্টিক রাফি
(1)
অরণ্য যুবরাজ
(1)
উজবেকিস্তান
(1)
একলা পথিক
(1)
জোডি দবরস্কি
(1)
টেক্সাস
(1)
ডেভিড কাটো
(1)
তাসখন্দ
(1)
পৃথিবীর প্রান্তে
(1)
বকুল আহমেদ
(1)
বন্ধু বুনোফুল
(1)
ভারত
(1)
ম্যাথু শেফার্ড
(1)
রাকিব হাসান
(1)
রিশি কাপুর
(1)
রুপম শাহ
(1)
লাল শিমুল
(1)
শামীম খান
(1)
সংগৃহীত
(1)
সনাতন পাঠক
(1)
সমকাম
(1)
সমকামী চলচিত্র
(1)
সমকামী বিচারক
(1)
হার্ভে মিল্ক
(1)
হোসেন মাহমুদ
(1)
আজও অপেক্ষায় আছি




